
পূজা, আরতি ও পুষ্পাঞ্জলির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে সমাপনপর্ব
হাফেজ মাওলানা মো. আজিজুল হক
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৬

মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ বসবাস করেন
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বসবাস করতে গিয়ে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, মত ও বিশ্বাসের মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ বসবাস করেন। তারা কেউ প্রতিবেশী, কেউ সহকর্মী, কেউ আত্মীয়-স্বজন, আবার কেউ ব্যবসায়িক অংশীদার। তাই অমুসলিমদের সঙ্গে একজন মুসলমানের আচরণ কেমন হবে, তাদের কী কী অধিকার রয়েছে এবং তাদের ধর্মীয় উৎসব-অনুষ্ঠানে মুসলমানদের অংশগ্রহণের সীমা কোথায়—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।
ইসলাম মুসলমানকে তাওহিদের ওপর অবিচল থাকতে নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে অন্যের অধিকার রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখা এবং মানুষের প্রতি সদাচরণের শিক্ষাও দেয়। অতএব, অন্য ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়া এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়।
বরং ইসলামের নির্দেশনা বুঝতে হলে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক দায়িত্বের পার্থক্য উপলব্ধি করতে হবে। ইসলাম মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তার প্রতি অন্যায় আচরণ করতে অনুমোদন দেয় না। বরং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও সদাচরণের নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ করতে ও তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন' (সুরা মুমতাহিনা, আয়াত ৮)।
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, শান্তিপূর্ণ অমুসলিমদের সঙ্গে সদাচরণ ও ন্যায়বিচার ইসলামে নিষিদ্ধ নয়; বরং তা আল্লাহর পছন্দনীয় কাজ। প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, অসুস্থ হলে খোঁজখবর নেওয়া, বিপদে সহযোগিতা করা, লেনদেনে সততা বজায় রাখা এবং কারও অধিকার নষ্ট না করা এসব মানবিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। কোনো অমুসলিম প্রতিবেশী বা সহকর্মীর সঙ্গে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে দুর্ব্যবহার করা এ আয়াতের শিক্ষার পরিপন্থী।
শান্তিপূর্ণ অমুসলিম দরিদ্র, অসুস্থ, অসহায় কিংবা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে স্বেচ্ছাদান বা সাধারণ আর্থিক সহযোগিতা করা বৈধ। সুরা মুমতাহিনার ৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায়ও শান্তিপূর্ণ অমুসলিমদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচারের গুরুত্ব উঠে এসেছে। তবে এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখতে হবে, নফল সদকা ও যাকাতের বিধান এক নয়। যাকাতের অর্থ কাদের দেওয়া যাবে, সে বিষয়ে সুরা তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে নির্দিষ্ট খাত উল্লেখ করা হয়েছে। তাই অমুসলিমকে সাধারণ দান করা এবং যাকাত দেওয়া একই বিধানের অধীন নয়। যাকাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শরয়ি শর্ত বিবেচনা করতে হবে।
অমুসলিম আত্মীয়-স্বজনের অধিকার
কোনো মুসলমানের বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা অন্য আত্মীয় অমুসলিম হলেও আত্মীয়তার সম্পর্ক যথাসম্ভব বজায় রাখতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্মীয় মতপার্থক্য আত্মীয়তার দায়িত্ব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
তারা যদি তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করতে চাপ দেয়, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তুমি তাদের কথা মানবে না; তবে দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করবে (সুরা লুকমান, আয়াত ১৫)।
এ আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট। আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ মানা যাবে না, কিন্তু অমুসলিম মা-বাবার সঙ্গেও সদাচরণ করতে হবে।
এ বিষয়ে আসমা বিনতে আবি বকর (রা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রয়েছে। তাঁর অমুসলিম মা তাঁর কাছে এলে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চান, মায়ের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবেন কি না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, হ্যাঁ, তোমার মায়ের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখো (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৬২০)। অতএব, অমুসলিম আত্মীয়কে প্রয়োজনের সময় সাহায্য করা, তাঁর অসুস্থতায় সেবা করা, খোঁজখবর নেওয়া, উপযুক্ত উপহার দেওয়া এবং পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
'ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ একটি ভিত্তিহীন কথা
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কথাটি ভিত্তিহীন ও আপত্তিকর। কারণ, ধর্মীয় উৎসব কেবল আনন্দের বিষয় নয়; বরং তা সংশ্লিষ্ট ধর্মের বিশ্বাস, উপাসনা ও ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। আল্লাহ বলেন- 'তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য, আর আমার ধর্ম আমার জন্য' (সুরা কাফিরুন, আয়াত ৬)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনাবাসীর প্রচলিত দুটি উৎসবের পরিবর্তে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার ব্যবস্থা করেন (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১১৩৪)। এ থেকে মুসলিমদের স্বতন্ত্র ধর্মীয় উৎসবের গুরুত্ব বোঝা যায়। তাই সম্প্রীতি মানে ধর্মীয় উৎসবের অভিন্নতা নয়।
মুসলমানের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তি হলো তাওহিদ, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা। ইসলামের দৃষ্টিতে অমুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনালয়ে অংশগ্রহণ এবং তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করা থেকে মুসলমানদের বিরত থাকতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন
তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না' (সুরা নিসা, আয়াত ৩৬)।
তাই নিছক আনন্দ-উপভোগের জন্য পূজামণ্ডপে যাওয়া, পূজার আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়া বা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের উদ্বোধন করা থেকে বিরত থাকা উচিত। পবিত্র কোরআনে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করতে নিষেধ করা হয়েছে (সুরা মায়েদাহ, আয়াত ২)। তবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করা ভিন্ন বিষয়। ইসলামে অমুসলিমদের ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই সবার সঙ্গে ন্যায়সংগত ও মানবিক আচরণ করতে হবে।
অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে শুভেচ্ছা জানানো অধিকাংশ আলেমের মতে হারাম। কারণ, এতে শিরকের কাজে উৎসাহ দেওয়া হয়, আর উক্ত মতের উপরই ফতোয়া। তবে কিছু সমসাময়িক আলেম ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বীকৃতি না দিয়ে সামাজিক সৌজন্য ও সম্প্রীতি রক্ষার উদ্দেশ্যে সাধারণ শুভেচ্ছা জানানোর অনুমতি দিয়েছেন।
প্রসাদ খাওয়ার বিধান- পূজা উপলক্ষে দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা প্রসাদ মুসলমানের জন্য গ্রহণ ও খাওয়া সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে' তা হারাম করা হয়েছে (সুরা মায়িদা, আয়াত ৩)। তবে অমুসলিম প্রতিবেশীর দেওয়া প্রতিটি খাবার হারাম নয়। ধর্মীয়ভাবে উৎসর্গ করা হয়নি এবং উপাদানও হালাল—এমন সাধারণ খাবার উপহার হিসেবে গ্রহণের অনুমোদন রয়েছে। এমনকি ক্রয় করে খাওয়াও জায়েজ। মূলকথা, ধর্মীয় বিশ্বাসে আপস না করেও অমুসলিমদের সঙ্গে সদাচরণ, সৌজন্য ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা সম্ভব। ইসলামি নীতির আলোকে বলা যায়, আকিদায় স্বাতন্ত্র্য, আচরণে সৌজন্য এবং ন্যায়বিচারে আপসহীনতা—এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর, নিরাপদ ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ।
অমুসলিমদের যেসব অধিকার রক্ষা করা দায়িত্ব
অমুসলিমদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন। জীবন ও নিরাপত্তার অধিকার: ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও ওপর হামলা, নির্যাতন কিংবা প্রাণনাশের চেষ্টা করা যাবে না। সম্পদ ও সম্মানের অধিকার: অমুসলিমদের সম্পদ আত্মসাৎ, প্রতারণা, মিথ্যা অপবাদ কিংবা অপমান করা যাবে না।
প্রতিবেশীর অধিকার: অমুসলিম প্রতিবেশী অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়া, বিপদে সহযোগিতা করা এবং দৈনন্দিন জীবনে সদাচরণ করা উচিত।
আত্মীয়তার অধিকার: অমুসলিম আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, তাঁদের সেবা করা এবং প্রয়োজনের সময় সাহায্য করা ইসলামের শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত।
ন্যায়বিচারের অধিকার: ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও প্রতি অন্যায় বা পক্ষপাত করা যাবে না। লেনদেন, বিচার ও সামাজিক আচরণে ন্যায়নীতি অনুসরণ করতে হবে।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা: অন্যের উপাসনালয় ভাঙচুর, প্রতিমা বা ধর্মীয় সম্পদ নষ্ট করা এবং শান্তিপূর্ণ উপাসনায় বাধা সৃষ্টি করা অন্যায়। কোনো বেআইনি কাজের প্রতিকার প্রয়োজন হলে তা আইনসম্মত পথে করতে হবে।
চুক্তি ও আমানত রক্ষার অধিকার: অমুসলিমের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি করলে তা যথাযথভাবে পালন করতে হবে। কারও কাছে আমানত থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে এবং পাওনা পরিশোধে সততা বজায় রাখতে হবে। এসব অধিকার রক্ষার অর্থ অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস গ্রহণ করা নয়, বরং নিজের বিশ্বাস অটুট রেখে ন্যায়সংগত আচরণ করা।
ইসলামের শিক্ষা হলো, মুসলমান নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ইবাদতের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখবেন। একই সঙ্গে অন্যের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও অধিকার রক্ষা করবেন। অন্য ধর্মের উপাসনায় অংশগ্রহণ না করা মানে অন্য ধর্মাবলম্বীর প্রতি শত্রুতা পোষণ করা নয়। আবার কারও সঙ্গে সদাচরণ করা মানেই তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসকে নিজের বিশ্বাস হিসেবে গ্রহণ করা নয়। অতএব, ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা হলো, বিশ্বাসে আপসহীনতা, মানুষের অধিকারে ন্যায়পরায়ণতা এবং সামাজিক আচরণে সৌজন্য। ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে মানবিক দায়িত্ব পালন করাই পারে একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে।
লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক, খতিব, বড়ইচড়া জামে মসজিদ, সিংড়া, নাটোর।