
আলু সংরক্ষণে ২০ টাকা খরচ, হিমাগার গেটে বিক্রি হচ্ছে ১১ টাকায়
শাহিদল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪২

জয়পুরহাটে হিমাগারে মজুত আলু এখন কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছবি: সময় সংবাদ
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান আলু উৎপাদনকারী জেলা জয়পুরহাটে হিমাগারে মজুত আলু নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। হিমাগার গেটে বর্তমানে আলুর চরম দরপতন চলছে। উৎপাদন ও সংরক্ষণ মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুতে খরচ ২০ টাকা হলেও হিমাগার গেটে তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১১ টাকায়। ফলে ১ হাজার ৩০০ টাকা খরচের আলুর বস্তা এখন বিক্রি করতে হচ্ছে সর্বোচ্চ ৬৮০ টাকায়। এতে বস্তাপ্রতি প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
চলতি বছরের মার্চ মাসে জয়পুরহাটের বিভিন্ন হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেছিলেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। উদ্দেশ্য ছিল বিগত বছরের লোকসান এবার পুষিয়ে নেয়া। ওই সময় ৬৫ কেজির এক বস্তা আলু রাখতে তাদের খরচ পড়েছিল ১ হাজার ৩০০ টাকা। কিন্তু টানা দুই বছর কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় এখন পরিবার নিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে জেলার বহু প্রান্তিক চাষির। বিশেষ করে যারা জমি বর্গা নিয়ে আলু চাষ করেছিলেন এবং এনজিও বা ধারদেনা করে আলু মজুত করেছিলেন, তাদের পুঁজি হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেলা কৃষি বিপণন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জয়পুরহাটের ২২টি হিমাগারে মোট ২ লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। তবে অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত হিমাগার থেকে খালাস হয়েছে মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন আলু, যা মোট মজুতের মাত্র ৫৫ শতাংশ। মৌসুম শেষ হতে চললেও প্রায় ৪৫ শতাংশ আলু এখনও হিমাগারেই পড়ে রয়েছে।
স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বছর জয়পুরহাটে প্রতি বিঘা জমিতে আলু চাষে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিক বাবদ খরচ হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। অথচ ভরা মৌসুমে ক্ষেত থেকে আলু তোলার সময় প্রতি বিঘার আলু বিক্রি হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ শুরুতেই বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা লোকসান হয়। সেই ক্ষতি কাটাতে হিমাগারে আলু রাখা হলেও এখন সেখানেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দাম।
কালাই উপজেলার কৃষক বকুল হোসেন বলেন, ‘গত বছরের লোকসান কাটাতে এবার ভেবেছিলাম হিমাগারে রাখলে হয়তো পরে ভালো দাম পাব। কিন্তু এখন পর্যন্ত সবাই চরম লোকসানের মধ্যে আছি। সরকার যদি আমাদের দিকে একটু নজর দিত, তবে কৃষকদের খুব উপকার হতো।’
ব্যবসায়ী জাকারিয়া হোসেন জানান, বাজারদর পড়ে যাওয়ায় মজুত করা আলু বিক্রি করা যাচ্ছে না। ফলে বিনিয়োগ করা বড় অঙ্কের অর্থ আটকে গেছে। লোকসানের ভয়ে অনেক কৃষক হিমাগার থেকে আলু বের করছেন না।
অন্যদিকে আলু খালাস না হওয়ায় শঙ্কায় পড়েছেন হিমাগার মালিকরাও। কালাইয়ের এম ইসরাত হিমাগারের ব্যবস্থাপক আবু রায়হান ও পুনট কোল্ড স্টোরেজের হিসাবরক্ষক এনামুল হক জানান, জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও শ্রমিকের মজুরি বাড়লেও তারা আলুর সংরক্ষণ ভাড়া বাড়াননি। কিন্তু আলুর দরপতনের কারণে কৃষকরা আলু তুলছেন না। এতে একদিকে যেমন পাইকাররা অলস সময় পার করছেন, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হিমাগার ফাঁকা না হলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন তারাও। হিমাগার কর্তৃপক্ষ মনে করছে, সরকারিভাবে আলু রফতানি এবং শিল্পে আলুর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে কারখানা গড়ে তোলা জরুরি।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জয়পুরহাটে প্রায় ৪৩ হাজার হেক্টর জমিতে ১০ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জয়পুরহাট কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, জেলায় হিমাগারে রাখা আলুর এখনও ৪৫ শতাংশ খালাস হয়নি। তবে আলু চাষি ও ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কালাই উপজেলায় একটি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য জায়গা নির্ধারণের কাজ চলছে। এটি বাস্তবায়ন হলে আলুর প্রক্রিয়াজাত পণ্যের সঠিক বাজার পাবেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।