
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: জয়-পরাজয়ের হিসাবসহ জরুরি ৭ প্রশ্নের উত্তর
ফয়সাল হাসান
প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬, ২০:৪০

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার দিন ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে অবস্থিত ‘পাম বিচ কাউন্টি সুপারভাইজার অব ইলেকশনস’ কার্যালয়ে হেঁটে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। গত ২৪ অক্টোবর তোলা। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ৩ নভেম্বর। অন্যান্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পাশাপাশি, এই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছর কার হাতে থাকবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ।
প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) এবং সিনেট উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা উল্টে দিতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি করে আসন বাড়াতে হবে। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ২১৮-২১৪ এবং সিনেটে ৫৩-৪৭ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। জনমত জরিপে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি দেখা গেলেও সিনেটের লড়াই এখনো হাড্ডাহাড্ডি।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচন ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। তবে ডেমোক্র্যাটরা এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা এবং ব্যাপক নির্বাহী কর্তৃত্ব বহাল থাকবে। ফলে বড় ধরনের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতা সীমিত থাকবে।
বিশ্লেষক, রাজনৈতিক কৌশলবিদ ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, ২০২৭ সালে ঋণসীমা বাড়ানো এবং সরকারি অর্থায়ন নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিচে সম্ভাব্য প্রধান পরিস্থিতি এবং সেগুলো ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি, কংগ্রেস ও অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা তুলে ধরা হলো।
ডেমোক্র্যাটরা সিনেট নয়, প্রতিনিধি পরিষদে জিতলে
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা: ৫ থেকে ২০ আসন
প্রভাব: শুনানি ও সমন জারির মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে। তবে নীতিনির্ধারণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। বিশ্লেষকদের ধারণা, গ্রীষ্মের মধ্যেই ঋণসীমা নিয়ে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে, যা আর্থিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলতে পারে। গত দুই বছরে কংগ্রেসকে অনেকাংশে পাশ কাটিয়ে যেভাবে ট্রাম্প তার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন, আগামী দিনেও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সেই ধারা অব্যাহত রাখতে পারেন।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা: ২১ থেকে ৪০ আসন
প্রভাব: মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা, ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করা এবং ডেটা সেন্টারবিরোধী অবস্থান তুলে ধরে ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন বিল পাস করতে পারে। তবে সিনেটে রিপাবলিকানদের বাধা এবং ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতার কারণে বড় ধরনের আইনগত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে।
ট্রাম্প নির্বাহী পদক্ষেপের মাধ্যমে তার কর্মসূচি বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখতে পারবেন। পাশাপাশি ঋণসীমা নিয়ে বিরোধের আশঙ্কাও থাকবে।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে জয় এবং সিনেটে সমান ৫০-৫০ আসন পেলে
প্রভাব: ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। অর্থনৈতিক, বিচার বিভাগীয় ও রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে অল্প কয়েকজন সুইং সিনেটরের ভোটই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করতে পারে। ভ্যান্সের সিদ্ধান্তমূলক ভোটের কারণে ট্রাম্প তার মনোনীত ব্যক্তিদের সিনেটে অনুমোদন করিয়ে নিতে পারবেন। একই সঙ্গে শুল্কনীতি, অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্তগুলো অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণহীন থাকবে।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষে জিতলে
শুধু প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার তুলনায় সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার প্রভাব আরও বেশি হতে পারে। কারণ, বিচারপতি নিয়োগ, মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়োগ এবং রাষ্ট্রদূত মনোনয়নের অনুমোদন সিনেটের হাতে থাকে।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা: ২ আসন
প্রভাব: ট্রাম্পের নিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর ডেমোক্র্যাটরা উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। তবে সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ফিলিবাস্টার নিয়ম এবং ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতার কারণে বড় ধরনের আইনগত সাফল্য সীমিত থাকবে।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা: ৪ থেকে ৬ আসন
প্রভাব: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় এবং ডেটা সেন্টার নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ মোকাবিলায় ডেমোক্র্যাটদের বিল পাসের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে রিপাবলিকানদের ওপর চাপও বাড়বে।
তবে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ আইন আটকে দেওয়ার ক্ষমতা ট্রাম্পের হাতে থাকবে। বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ভোটাররা শুধু ট্রাম্পের বিরোধিতা নয়, বরং অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানেও ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকে কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করবে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পও রাজনৈতিকভাবে বিরোধীদের সামনে দাঁড় করানোর সুযোগ পাবেন। ওয়াশিংটনের ব্যর্থতার দায় ডেমোক্র্যাটদের ঘাড়ে দিতে পারবেন এবং অর্থনৈতিক সমস্যা ও উচ্চমূল্যের জন্য তাদের দায়ী করতে পারেন।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা: ৮ বা তার বেশি আসন
প্রভাব: ডেমোক্র্যাটদের দর-কষাকষির ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তবে ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা, ফিলিবাস্টার এবং অর্থনীতির জন্য যৌথ রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার কারণে শাসন পরিচালনায় তাদের ক্ষমতা সীমিত থাকবে।
রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে
প্রতিনিধি পরিষদে অনেক রিপাবলিকান সদস্যের আসন ঝুঁকির মুখে থাকায় এই পরিস্থিতি তুলনামূলক কম সম্ভাব্য বলে মনে করা হচ্ছে। তবে একেবারে অসম্ভব নয়।
প্রভাব: ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা তার প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছরের জন্য নতুন করে জনসমর্থন পাওয়ার দাবি করতে পারবেন।
ওয়াশিংটনের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে থাকায় ট্রাম্প আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তার বিভিন্ন কর্মসূচি এগিয়ে নিতে পারবেন। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে তার ওপর বাধা আসবে খুব কম। বিচারপতি মনোনয়নসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের প্রক্রিয়াও তিনি অব্যাহত রাখতে পারবেন।
এ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের বাজেটসংক্রান্ত বিরোধ, সরকারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এবং ঋণসীমা নিয়ে সংঘাতের আশঙ্কা কমে আসবে।
সূত্র: রয়টার্স