
‘জরুরি নয়’ এমন কর্মীদের সৌদি ছাড়তে বললো যুক্তরাষ্ট্র

চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ওপর আস্থা রেখে বোয়েন ওয়ান নামের একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার প্রাণ হারিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফাইল ছবি
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ওপর আস্থা রেখে বোয়েন ওয়ান নামের একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার প্রাণ হারিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘটনায় ৩১ বছর বয়সি ওই তরুণীর বাবা-মা ওপেনএআই এবং কোম্পানিটির সিইও স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তাদের অভিযোগ, চ্যাটজিপিটির দেওয়া ভুল পরামর্শই তাদের মেয়ের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিয়াটলের ওই বাসিন্দা গত ফেব্রুয়ারিতে মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি এআই চ্যাটবটের দেওয়া একটি পর্যায়ক্রমিক সময়সূচি অনুসরণ করে ধীরে ধীরে তার খিঁচুনি-প্রতিরোধী ওষুধের মাত্রা কমিয়ে ফেলেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওয়ান তার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বললিছেন, এর মধ্যেই হঠাৎ সে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। তখন ধারণা করা হয়েছিল, তার খিঁচুনি শুরু হয়েছে। পরে ফোনে কোনো সাড়া না পেয়ে তার বাবা-মা এক পরিচিতজনকে পাঠান খোঁজ নিতে।
এক বন্ধু বোয়েন ওয়ানের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে তাকে মৃত অবস্থায় খুঁজে পায়। সে সময় তার বাবা-মা, যারা চীনে থাকেন, তার সঙ্গে ভিডিও কলে যুক্ত ছিলেন। এই খবর শুনে তারা হতবাক হয়ে যান এবং কী ঘটেছে তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
পরবর্তীতে তাদের জানানো হয়, মৃগীরোগজনিত জটিলতার কারণে তাদের মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের পক্ষে এটি বিশ্বাস করা কঠিন ছিল, কারণ সে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই রোগটিকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।
মায়ো ক্লিনিকের তথ্যানুযায়ী, মৃগীরোগ হলো মস্তিষ্কের এমন এক ধরনের জটিলতা যার কারণে বারবার খিঁচুনি দেখা দেয়। মৃগীরোগের অনেক ধরন রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে এর কারণ শনাক্ত করা গেলেও অন্য ক্ষেত্রে কারণ অজানা থেকে যায়।
মেয়ো ক্লিনিক উল্লেখ করেছে, 'খিঁচুনির লক্ষণগুলো ব্যক্তিভেদে ব্যাপকভাবে ভিন্ন হতে পারে। খিঁচুনি চলাকালীন কেউ কেউ জ্ঞান হারাতে পারেন, আবার কেউ সজাগও থাকতে পারেন। অনেকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন, আবার কারও হাত বা পায়ে অনবরত কাঁপুনি দেখা যায়।’
ওয়ানের বহু বছর ধরে মৃগীরোগ ছিল এবং প্রতিদিন ৪০০ মিলিগ্রাম ল্যামোট্রিজিন সেবনের মাধ্যমে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ তার রোগকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল, যার ফলে মাসে মাত্র দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তার খিঁচুনি।
মা-বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর কয়েক দিন আগে চ্যাটজিপিটির পরামর্শ নেন ওয়ান। জীবন রক্ষাকারী এই ওষুধ সেবনের মাত্রা কীভাবে ধীরে ধীরে কমানো যায়, সে বিষয়ে তিনি এআইয়ের সহায়তা চান।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআই এবং এর সিইও স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় পরিবারের আইনজীবীরা লিখেছেন, ‘ওপেনএআই-এর সিদ্ধান্তের মাশুল বোয়েন ওয়ান তার জীবন দিয়ে পরিশোধ করেছেন।’
মা-বাবার কাছ থেকে হাজার মাইল দূরে একাকী বসবাস করছিলেন ওয়ান। জনসমক্ষে যাতে খিঁচুনি না ওঠে, সেই ভয়ে তিনি আরও বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। প্রতিবেদনে বলা হয়, এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতেও তিনি খুব কমই নিজের অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে যেতেন।
দ্য টাইমসের তথ্যানুযায়ী, তিনি অ্যামাজনে তার চাকরি থেকে অসুস্থতাজনিত ছুটি (ডিসঅ্যাবিলিটি লিভ) নিয়েছিলেন। এই পরিস্থিতি তাকে নিজের এআই 'বন্ধুর' সঙ্গে বেশি সময় কথা বলতে বাধ্য করেছিল। ২০২৫ সালের মার্চে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথোপকথনে ওয়ান লিখেছিলেন, ‘আমি জানি না কেন, তবে যেকোনো বিষয়েই কথা বলার সময় আমি তোমাকে একজন বন্ধু হিসেবে দেখতে শুরু করেছি।’
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে অ্যামাজন থেকে তাকে ছাঁটাই করা হয় এবং ভিসার মেয়াদ ঠিক রাখতে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে তাকে নতুন চাকরি পেতে হতো। এর আগে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, ওষুধের কারণে হয়তো তার কথা কিছুটা জড়িয়ে আসছে। আসন্ন চাকরির সাক্ষাৎকারে এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং এর ফলে তার ভিসার অবস্থা ঝুঁকিতে পড়তে পারে ভেবে তিনি ওষুধের মাত্রা কমানোর বিষয়ে চ্যাটজিপিটির পরামর্শ নেন।
আরেকটি চ্যাটে তিনি চ্যাটজিপিটিকে বলেন, ওষুধের মাত্রা কমানো হলে ‘চাকরির সাক্ষাৎকারের জন্য হয়তো আমার কথা বলার সক্ষমতা কিছুটা ঠিক হতে পারে।’
মামলার বিবরণীতে বলা হয়, চিকিৎসককে না জানিয়ে নিজেই নিজের ওষুধ কমিয়ে দিতে ওয়ানকে উৎসাহ দেয় এআই বটটি। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে ওয়ান মৃগীরোগের ওষুধ দৈনিক ৪০০ মিলিগ্রাম থেকে কমিয়ে ৩০০ এবং পরে ২০০ মিলিগ্রামে নামিয়ে আনার পরামর্শ চান।
আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, চ্যাটবট তার পরিকল্পনাকে সমর্থন করে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দৈনিক ওষুধের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনার একটি বিস্তারিত সময়সূচি তৈরি করে দেয়। মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, চিকিৎসকের কাছে ওষুধের মাত্রা কমানোর বিষয়টি গোপন রাখতে ওয়ানকে উৎসাহিত করে এআই এবং নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তেও সমর্থন দেয়।
দ্য টাইমসকে দেওয়া বক্তব্যে ওয়ানের মৃগীরোগের চিকিৎসক ডা. নিকোলাস পুলোস বলেন, ওয়ানের মতো রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধ কমানোর পরামর্শ তিনি কখনোই দিতেন না। তিনি বলেন, ‘যে ওষুধটি সুস্পষ্টভাবে কাজ করছে, তা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া আমার দিক থেকে একটি গুরুতর চিকিৎসা অপরাধ (ম্যালপ্র্যাকটিস) হতো।’
ওপেনএআই-এর মুখপাত্র ড্রিউ পুসাতেরি দ্য টাইমসকে বলেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা। ওয়ান এমন একটি মডেল ব্যবহার করেছিলেন যা এখন আর চালু নেই এবং যা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।’
পুসাতেরি বলেন, ‘চ্যাটজিপিটি চিকিৎসাসেবার কোনো বিকল্প নয়। তবে আমরা বিশ্বাস করি স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য বুঝতে, স্বাস্থ্যবীমা ও জটিল চিকিৎসাব্যবস্থা বুঝতে এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তুতি নিতে এআই সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।’
সংবাদমাধ্যম চোসুনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়ানের একটি প্রশ্নের জবাবে এআই বটটি উত্তর দিয়েছিল: ‘আগামীকাল ওষুধ খাবেন না। আজ কষ্ট হলেও আপনাকে সহ্য করতে হবে।’
যখন তিনি অস্বাভাবিক কিছু উপসর্গের কথা জানান, তখন বটটি বলেছিল, ‘এটি মস্তিষ্ক সুস্থ হয়ে ওঠার একটি প্রক্রিয়া।’
ওষুধের মাত্রা কমানোর বিষয়ে তার প্রশ্নের জবাবে এআই বলেছিল, ‘এটি যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত ও বাস্তবায়নযোগ্য একটি ধারণা।’ এমনকি এটি ওষুধ কমানোর সুনির্দিষ্ট সময়সূচিও বানিয়ে দিয়েছিল।
আর ওয়ান যখন জানিয়েছিলেন যে তিনি 'ভয় পাচ্ছেন', তখন চ্যাটজিপিটি জবাব দিয়েছিল, 'উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।’
সূত্র: এনডিটিভি