
মহেশখালীতে আরও তিনটি এলএনজি টার্মিনাল হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব
প্রকাশ: শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬, ৮:৪৫

কলসি হাতে সুপেয় পানির উৎসে যাচ্ছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা গ্রামের নারীরা। ছবি: সময় সংবাদ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে তীব্র হচ্ছে সুপেয় পানির সংকট। প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করায় মূত্রনালীর সংক্রমণে ভুগছেন অনেকে। বাড়ছে কিডনি রোগীর সংখ্যাও। চর্মরোগের পাশাপাশি দেখা দিচ্ছে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, উপকূলের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এখনই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সুপেয় পানির ব্যবস্থা।
পানির অপর নাম জীবন। অথচ সেই জীবন বাঁচাতেই প্রতিদিন অসহনীয় সংগ্রাম করতে হচ্ছে উপকূলের মানুষকে। কারণ চারদিকে পানি থাকলেও তা পান করার উপযোগী নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বেড়েছে পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা। ফলে দৈনন্দিন কাজে এই পানি ব্যবহারের কারণে দেখা দিচ্ছে নানা জটিল রোগ। সুপেয় পানির জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার মানুষকে।
সুপেয় পানি সংগ্রামের এই অভিজ্ঞতা মরিয়ম বিবির বহুদিনের। সুস্থতা কিংবা অসুস্থতা, ঝড়-বৃষ্টি কোনো কিছুই থামাতে পারে না পানির খোঁজে তার বের হওয়া। যুগের পর যুগ পাত্র হাতে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাকে। তবে দিন যত যাচ্ছে, বিশুদ্ধ পানির সংকটও তত বাড়ছে। পানির জন্য প্রতিদিনই যেন নতুন করে যুদ্ধ করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা গ্রামের মানুষের সকাল শুরু হয় কলসি হাতে পানির সন্ধানে বেরিয়ে। চারদিকে লবণাক্ত পানি থাকায় তাদের যেতে হয় সংরক্ষিত মিঠাপানির পুকুর, পানি শোধনাগার কিংবা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পানির উৎসে।
স্থানীয় নারীরা বলেন, পানির ওপরই মানুষের জীবন নির্ভর করে। লবণাক্ততার কারণে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি পান করে থাকতে হয়। বৃষ্টি শেষ হলে পাশের একটি পুকুরের পানি ব্যবহার করতে হয়। তবে সেখান থেকে পানি আনতে অনেক কষ্ট হয়।
এসআরডিআইয়ের তথ্যমতে, উপকূলীয় অঞ্চলের বাগেরহাটের শরণখোলা, খুলনার ডুমুরিয়া ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মতো এলাকায় লবণাক্ততার মাত্রা দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে দৈনন্দিন কাজে পানি ব্যবহারের কারণে চর্মরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ।
এক নারী বলেন, পানির কারণে শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। ভালো পানি দিয়ে গোসল করতে না পারলে এবং ভালো পানি পান করতে না পারলে নানা অসুবিধায় পড়তে হয়।
এ অবস্থায় বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সুপেয় পানির ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি স্থানীয়দের। অন্যদিকে, উপকূলীয় এলাকার চিকিৎসকরা বলছেন, প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করায় অনেকেই মূত্রনালীর সংক্রমণ ও কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। আবার পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে কয়েকবার ফিল্টার করার পরও ডায়ালাইসিসের জন্য প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের ম্যানেজার ডা. শাহরিয়ার হাসান বলেন, সাধারণত দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পুরুষদের মধ্যে মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউটিআই রোগীর সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু এ অঞ্চলে পুরুষ রোগীর সংখ্যাও অনেক। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ এ সমস্যায় ভুগছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের কিডনির সমস্যাও বাড়ছে। ডায়ালাইসিসের জন্য পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বা টিডিএস খুব কম থাকতে হয়, ১০-এর নিচে। কিন্তু কয়েক দফা ফিল্টার ও রি-ফিল্টার করার পরও কাঙ্ক্ষিত টিডিএস মাত্রা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
পানির সংকট মোকাবিলায় কিছু বেসরকারি সংস্থা কাজ করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু গভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন এলাকাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং টেকসই উদ্যোগ।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, এখন থেকে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দিকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পগুলো যাতে টেকসই হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও স্থানীয় মানুষ সেই সুবিধা ব্যবহার করছেন কি না, নাকি প্রকল্প শেষ হলে আবার নতুন প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন-এসব বিষয়েও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে।
তবে সুপেয় পানির এই সংকট থেকে কবে মুক্তি মিলবে, সেই অপেক্ষার যেন শেষ নেই স্থানীয় মানুষের।