
নওগাঁয় ক্লিনিকের পাশ থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৫:৩৪

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ৩৫ বছরেও চালু হয়নি সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। ছবি: সময় সংবাদ
পর্যটনের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে বিদ্যুতের সংকট দীর্ঘদিনের। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ৩৫ বছরেও সচল হয়নি দ্বীপের সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফলে প্রায় ১১ হাজার মানুষের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে নির্ভর করতে হচ্ছে একটি বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর। কিন্তু সেই প্রকল্প থেকেও দিনে-রাতে বিদ্যুৎ মিলছে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা।
এর মধ্যে পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে গত ১ নভেম্বর থেকে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা বাড়িয়ে ৫২ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ না বাড়িয়ে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।
দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, একসময় সন্ধ্যা নামলেই সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের আলোয় আলোকিত হতো সেন্টমার্টিন। ১৯৮১ সালে স্থাপিত কেন্দ্রটির জেনারেটর ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আর সচল করা হয়নি। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।
একসময় যে জেনারেটর কক্ষে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো, এখন সেখানে নীরবতা। শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এর আওতাধীন সরকারি রেস্টহাউসেও নেই নিজস্ব বিদ্যুৎ সরবরাহ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করেই চলছে সেটি।
সেন্টমার্টিন বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রের কেয়ারটেকার তাতু বড়ুয়া সময় সংবাদকে জানান, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে জেনারেটরের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেগুলো মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেনারেটর কক্ষটি এখন পরিত্যক্ত। সরকারি রেস্টহাউসটি সীমিত পরিসরে চালু থাকলেও সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্লু মেরিন এনার্জি।
বেসরকারি প্রকল্পেও চাহিদা মিটছে না
সময়ের সঙ্গে বদলেছে দ্বীপের চিত্র। বেড়েছে জনসংখ্যা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল-রিসোর্ট ও পর্যটকের সংখ্যা। ফলে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু সরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় পুরো দ্বীপ এখন নির্ভরশীল বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর।
২০১৯ সালে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি চালু করে ব্লু মেরিন এনার্জি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বর্তমানে তাদের গ্রাহকসংখ্যা ৮০০-এর বেশি। তবে প্রকল্পের ব্যাটারির সক্ষমতা কমে যাওয়ায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ২৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতার প্রকল্প থেকে সিস্টেম লস বাদ দিয়ে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১৩৮ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এই বিদ্যুৎ দিয়ে ৮০০-এর বেশি গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, দ্বীপে কয়েক শ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক বা টমটম রয়েছে। এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দেয়ার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়েছে। তার অভিযোগ, টমটমের ব্যাটারি চার্জের বড় একটি অংশ অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে নেয়া হয়। এ ছাড়া প্রায় ৬০০টি বাসাবাড়ির মিটার থেকে আরও কয়েক শ বাসাবাড়িতে অবৈধ সংযোগ দেয়া হয়েছে। এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে কর্মীদের মারধরের শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
প্রকল্পের ব্যাটারির অবস্থাও ভালো নয় বলে জানান রফিকুল ইসলাম। তার ভাষ্য, ১০ বছর মেয়াদি ব্যাটারিগুলো সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যেই অচল হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ ব্যাটারি নষ্ট হওয়ায় নতুন ব্যাটারি আমদানির জন্য চীন থেকে ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে। এগুলো আসতে আরও দেড় মাস সময় লাগতে পারে।
জেনারেটরের খরচে বাড়ছে বিদ্যুতের দাম
প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করে রফিকুল ইসলাম সময় সংবাদকে বলেন, সম্প্রতি টানা সাত দিনের বৃষ্টিতে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন অনেক কমে যায়। এ ছাড়া সফ্টওয়্যার বা সার্ভারের ত্রুটির কারণে কখনো কখনো উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। তখন উচ্চক্ষমতার দুটি জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হয়।
তিনি বলেন, পর্যটন মৌসুমে দ্বীপের ২৩০টির বেশি হোটেল-রিসোর্ট এবং ২০০টির বেশি রেস্তোরাঁ ও দোকানপাট চালু হবে। তখন দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ৭০০ থেকে ৮০০ কিলোওয়াটে পৌঁছাতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ থেকে পাওয়া যাবে প্রায় ১৮০ কিলোওয়াট। বাকি চাহিদা মেটাতে জেনারেটর চালাতে হবে।
রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা। টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনে ডিজেল পরিবহনে লিটারপ্রতি আরও ৪০ টাকা খরচ হয়। এসব ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রায় ২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও এখন পর্যন্ত লাভের মুখ দেখেননি বলে দাবি করেন রফিকুল ইসলাম। তার মতে, সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে দ্বীপে আরও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হলে সরবরাহের চাপ কমবে।
দাম ও মিটার চার্জ নিয়ে অভিযোগ
বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে অসন্তোষের পাশাপাশি মিটারে রিচার্জ ও বিভিন্ন চার্জ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে গ্রাহকদের। তাদের দাবি, নিয়মিত বিদ্যুৎ না পেলেও প্রতিবার রিচার্জের সময় বিভিন্ন খাতে টাকা কেটে নেয়া হচ্ছে।
স্থানীয় শুঁটকি ব্যবসায়ী জমির উদ্দিন বলেন, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের আগে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দ্বীপে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। তখন প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল প্রায় দুই টাকা। ঘূর্ণিঝড়ে সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেটি আর সংস্কার করা হয়নি। সে সময় চাহিদা কম থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে। কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, রিসোর্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতের প্রয়োজন বেড়েছে। তাই সরকারি উদ্যোগে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা জরুরি।
সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ বলেন, ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে এক ঘণ্টাও ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। মিটারে কখনো ৭০০, কখনো ২০০ টাকা রিচার্জ করতে বলা হয়। মাসে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত রিচার্জ করেও কীভাবে টাকা খরচ হচ্ছে, তা গ্রাহকদের কাছে পরিষ্কার নয়।
আরেক বাসিন্দা আকতার কামালের অভিযোগ, প্রতি এক হাজার টাকা রিচার্জে প্রায় ৩০০ টাকা মিটার চার্জ হিসেবে কেটে নেয়া হয়। মাসে যতবারই রিচার্জ করা হোক, প্রতিবারই এই চার্জ দিতে হয়। এর সঙ্গে সরকারি কর যুক্ত হয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রকৃত খরচ ৬০ থেকে ৬২ টাকায় দাঁড়ায় বলে দাবি করেন তিনি।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করে বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আকতার কামাল। তার মতে, এ বিষয়ে গ্রাহকদের কাছে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর দাবি
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম সময় সংবাদকে বলেন, পর্যটন মৌসুমে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হলেও সে অনুযায়ী সরবরাহ বাড়ে না। ব্লু মেরিন এনার্জির মালিকপক্ষ প্রতিবছর ব্যাটারি সরবরাহের আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন করে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ফয়েজুল ইসলামের ভাষ্য, সম্প্রতি বিদ্যুৎ সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকে এক মাসের মধ্যে ব্যাটারি সরবরাহের আশ্বাস দিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়। তিনি এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তার মতে, ব্যাটারি সরবরাহ করতে না পারলে প্রতিষ্ঠানটির উচিত নিজেদের ব্যবস্থাপনায় বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া। সরকার চাইলে সৌরবিদ্যুৎ বা পিডিবির মাধ্যমে দ্বীপের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করতে পারে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সূর্যের আলো ব্যবহার করে দিনে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে বাসিন্দাদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও ভোগান্তিতে পড়ছেন। কোনো ধরনের সেবা না বাড়িয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দ্বীপবাসী মেনে নেবে না।
ফয়েজুল ইসলামের দাবি, সরকারি উদ্যোগে সৌরবিদ্যুৎ কিংবা বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের পাশাপাশি দ্বীপে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা পিডিবির
বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেডের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল্লাহ শিহাব সময় সংবাদকে বলেন, প্রকল্পটি চালুর সময় মূলত বাসাবাড়ির বিদ্যুতের চাহিদা বিবেচনায় অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ইজিবাইক, মিশুক, হোটেল-রিসোর্ট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাটারির সক্ষমতা কমে যাওয়ায় রাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। পর্যটন মৌসুমে বাড়তি চাহিদা মেটাতে জেনারেটর চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ কারণে ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল কাদের গণি সময় সংবাদকে বলেন, নানা কারণে সেন্টমার্টিনের অচল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সচল করা সম্ভব হয়নি। তবে সেখানে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের একটি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দ্বীপের বিদ্যুৎ সংকট দূর হবে বলে আশা করছেন তারা।
৩৫ বছর ধরে অচল সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, অন্যদিকে ব্যয়বহুল বেসরকারি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা-সব মিলিয়ে সেন্টমার্টিনের প্রায় ১১ হাজার বাসিন্দার জন্য বিদ্যুৎ এখন বড় সংকট। নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনার কথা জানালেও কবে নাগাদ এর সুফল মিলবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তাই সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ চান দ্বীপবাসী।