
সবুজ কমেছে ৩১ শতাংশ, জলাশয় ৪৭ শতাংশদখল-দূষণে বিপর্যস্ত ঢাকা, গ্রিন সিটির উদ্যোগ কি ফেরাবে স্বস্তি?
এ জে সাগর
প্রকাশ: রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৪৪
নদীর বালুর মধ্যে থাকতে পারে ইলমেনাইট, রুটাইল, জিরকন, গারনেট ও ম্যাগনেটাইটের মতো বিভিন্ন ভারী খনিজ; যা প্রযুক্তির সাহায্যে শনাক্ত করা যায়। ছবি: সময় সংবাদ
নদীর বালু মানেই শুধু নির্মাণকাজের উপাদান নয়। এর মধ্যে থাকতে পারে ইলমেনাইট, রুটাইল, জিরকন, গারনেট ও ম্যাগনেটাইটের মতো বিভিন্ন ভারী খনিজ। বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে এসব খনিজ আলাদা করে শনাক্ত করা যায়। বাংলাদেশের নদীবাহিত বালু থেকে খনিজ পৃথকীকরণ তাই গবেষণা ও শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার মতো বড় নদীগুলোর বালু ও পলির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিমালয় পর্বতমালা এবং আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চল। দীর্ঘ সময় ধরে পাথর ও শিলার ক্ষয়, নদীর স্রোতে পরিবহন এবং বিভিন্ন স্থানে পলি জমার মাধ্যমে এসব উপাদান নদীব্যবস্থায় আসে। এই বালুর মধ্যেই মিশে থাকতে পারে বিভিন্ন ধরনের খনিজ, যেগুলোর বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহার একেক রকম। তবে সব নদীর বালুতে একই ধরনের খনিজ বা সমান পরিমাণে মূল্যবান উপাদান থাকে না। কোন এলাকায় কী ধরনের খনিজ রয়েছে, তা জানতে প্রয়োজন নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা।
নদীর বালু থেকে খনিজ পৃথক করার জন্য প্রথমে সংগ্রহ করা হয় বালুর নমুনা। এরপর কনভেয়ার বেল্টের মাধ্যমে তা হপার বা উপাদান সরবরাহের ব্যবস্থায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে বালু পৌঁছায় রাফার সিস্টেমে, যেখানে পানির সঙ্গে মিশিয়ে পরবর্তী প্রক্রিয়ার উপযোগী করা হয়। এরপর পানির প্রবাহ ও খনিজের ভৌত বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে স্পাইরাল সিস্টেমের মাধ্যমে তুলনামূলক ভারী ও হালকা উপাদান পৃথক করা হয়। পরবর্তী ধাপে বিভিন্ন ধরনের ম্যাগনেটিক সেপারেশন বা চৌম্বকীয় পৃথকীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের ভিত্তিতে খনিজগুলো আলাদা করা হয়। এভাবে পৃথক করা ভারী খনিজ সংগ্রহ করা হয়।

অন্যদিকে, কোয়ার্টজ ও ফেল্ডস্পারের মতো অপেক্ষাকৃত হালকা খনিজের একটি বড় অংশ টেইলিংস বা অবশিষ্ট উপাদানের সঙ্গে বেরিয়ে যেতে পারে। তবে এসব উপাদানের অনুপাত নির্ভর করে বালুর উৎস, খনিজের গঠন ও ব্যবহৃত প্রক্রিয়ার ওপর। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণত বালুর নমুনায় মোট উপাদানের প্রায় ৭–২৫ শতাংশ ভারী খনিজ এবং ৭০–৮০ শতাংশ হালকা খনিজ পাওয়া যায়। হালকা খনিজের মধ্যে কোয়ার্টজ, মাইকা ও ফেল্ডস্পারের মতো উপাদান থাকে। তবে এই অনুপাত নমুনার উৎস ও খনিজ গঠনের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। এভাবে মূলত ওয়েট মিনারেল পাওয়া যায়।
পানিনির্ভর পৃথকীকরণ প্রক্রিয়ায় পাওয়া খনিজে আর্দ্রতা থাকে। তাই পরবর্তী ধাপে উপযুক্ত শুকানোর ব্যবস্থা ব্যবহার করে পানি অপসারণ করা হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী আরও পৃথকীকরণ ও বিশুদ্ধতা যাচাই করা হয়। এতে বিভিন্ন খনিজের পরিচয়, পরিমাণ ও গুণগত মান নির্ণয় করা সহজ হয়।
নদীবাহিত বালু থেকে শনাক্ত হওয়া খনিজের মধ্যে কয়েকটির শিল্পগত গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য।
ইলমেনাইট ও রুটাইল রং, প্লাস্টিক, কাগজ ও কসমেটিক্স শিল্পে অপরিহার্য। এছাড়া বিমানের বডি এবং মহাকাশযানের যন্ত্রাংশ তৈরিতে টাইটানিয়াম ধাতু হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জিরকন প্রধানত সিরামিক শিল্পে ও টাইলসের গ্লেজ বা উজ্জ্বলতা বাড়াতে ব্যবহৃত হয়। ম্যাগনেটাইট লোহার একটি প্রধান আকরিক। লৌহ ও ইস্পাত শিল্পে লোহার উৎস হিসেবে এবং বিভিন্ন চুম্বকীয় যন্ত্রপাতি তৈরিতে এটি ব্যবহৃত হয়। গারনেট অত্যন্ত শক্ত হওয়ায় এটি মূলত ‘অ্যাব্রেসিভ’ বা ক্ষয়কারী পদার্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
মোনাজাইট একটি তেজস্ক্রিয় খনিজ এবং রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট। পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন, আধুনিক ইলেকট্রনিক্স, মোবাইল স্ক্রিন, শক্তিশালী চুম্বক ও এক্স-রে প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়। মাইকা চমৎকার বিদ্যুৎ ও তাপ কুপরিবাহী। তাই ইলেকট্রনিক্স ও বৈদ্যুতিক শিল্পে ইনসুলেটর বা নিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সিলিকা স্যান্ড কাচ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। অর্থ্যাৎ, নদীর বালুর প্রায় ১০০ শতাংশই কোনো না কোনো কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।