
দখল-দূষণে বিপর্যস্ত ঢাকা, গ্রিন সিটির উদ্যোগ কি ফেরাবে স্বস্তি?
এ জে সাগর
প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৩:২৬
হিমালয়ের হিমবাহগুলো এক দশক আগের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হারে ভর হারাচ্ছে। এতে শুধু পাহাড়ে বরফই কমে যাচ্ছে না, আগামী দিনের পানির ব্যবস্থাও বদলে যেতে পারে। ছবি: সংগৃহীত
এক দশক আগের তুলনায় হিমালয়ের হিমবাহগুলো এখন প্রায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হারে ভর হারাচ্ছে। সম্প্রতি নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ আমাদের আবারও দেখিয়ে দিয়েছে পাহাড়ের বরফের পরিবর্তন শুধু পাহাড়ের সমস্যা নয়। তাহলে প্রশ্ন হলো- হিমালয়ের বরফ গলে গেলে বাংলাদেশের নদীতে কী প্রভাব পড়বে? আর হিন্দুকুশ-হিমালয় বা ‘থার্ড পোল’ কেন এশিয়ার দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
প্রথমে আসা যাক হিন্দুকুশ-হিমালয়ে। উত্তর মেরু বা আর্কটিক এবং দক্ষিণ মেরু বা অ্যান্টার্কটিকার বাইরে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ তুষার ও বরফভাণ্ডার হলো হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চল। তাই একে বলা হয় ‘থার্ড পোল’ বা তৃতীয় মেরু। এই অঞ্চলের বরফ, তুষার আর হিমবাহ শুধু পাহাড়ের সৌন্দর্য নয়। এগুলো আসলে এশিয়ার বিশাল এক প্রাকৃতিক পানির অবকাঠামো। হিমালয় ও আশপাশের ক্রায়োস্ফিয়ার অর্থাৎ বরফ, তুষার ও হিমবাহ থেকে আসা পানি যুক্ত হয় এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নদী ব্যবস্থায়।
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, মেকংসহ বহু নদীর পানির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে এই পাহাড়ি ক্রায়োস্ফিয়ারের সম্পর্ক রয়েছে। আর এই নদীগুলোর পানির ওপর নির্ভর করে কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, পানীয় জল, জলবিদ্যুৎ এমনকি জীববৈচিত্র্যও। অর্থাৎ, হিমালয় শুধু কয়েকটি দেশের অংশ নয়। এটি এশিয়ার একটি বিশাল প্রাকৃতিক পানির অবকাঠামো।
প্রশ্ন আসতেই পারে, বাংলাদেশ তো হিমালয়ের অনেক দূরে। তাহলে হিমালয়ের বরফ গললে আমাদের কি!
সম্পর্কটা নদীর মাধ্যমে। গঙ্গা হিমালয়ের হিমবাহ অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশে এসে গঙ্গা হয়ে যায় পদ্মা। পরে পদ্মা-যমুনা ও মেঘনার বিশাল নদী ব্যবস্থার সঙ্গে মিলিত হয়ে শেষ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে। অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্রের উৎসও তিব্বতের উচ্চভূমি। তিব্বত ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং যমুনা নামে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, হিমালয়ের বরফ-তুষার, পাহাড়ের পানি আর বাংলাদেশের নদী, এগুলো আলাদা কোনো গল্প নয়। একটি বিশাল নদী ব্যবস্থার পরস্পর সংযুক্ত অংশ।
এবার একটু সহজ করে বুঝি, হিমবাহ আমাদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? পাহাড়ের ওপর বছরের পর বছর তুষার জমে। চাপ ও সময়ের কারণে সেই তুষার ধীরে ধীরে ঘন বরফে পরিণত হয়। এই বিশাল বরফের ভাণ্ডার মাধ্যাকর্ষণের কারণে ধীরে ধীরে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। এটাই হিমবাহ। শীত ও অন্যান্য সময়ে বরফ-তুষার জমে, উষ্ণ মৌসুমে এর একটি অংশ গলে নদীতে পানি যোগ করে। তাই হিমবাহকে অনেকটা প্রাকৃতিক পানির ব্যাংক বলা যায়।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বরফের ব্যাংক থেকেই পানি বেরিয়ে যাচ্ছে দ্রুততর হারে। সাম্প্রতিক International Centre for Integrated Mountain Development (ICIMOD)- এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমালয়ের হিমবাহগুলো এখন এক দশক আগের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হারে ভর হারাচ্ছে। এর অর্থ শুধু পাহাড়ে বরফ কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ আগামী দিনের পানির ব্যবস্থাও বদলে যেতে পারে।
এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি। অনেকে ভাবতে পারেন- বরফ গলছে, তাহলে তো নদীতে পানি বাড়বে। সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো, এটি দীর্ঘমেয়াদি পানির হিসাব। স্বল্পমেয়াদে দ্রুত হিমবাহ গললে কোনো কোনো নদীতে পানির প্রবাহ বাড়তে পারে। কিন্তু যদি বছরের পর বছর হিমবাহের বরফের মজুত কমতেই থাকে, তাহলে একসময় সেই অতিরিক্ত পানির উৎসও ছোট হয়ে যাবে। অর্থাৎ— আজ বেশি পানি, কাল পানির ঘাটতি। বিষয়টি অনেকটা পানির ট্যাংকের মতো। ট্যাংক থেকে প্রয়োজনের চেয়ে দ্রুত পানি বের করলে শুরুতে পানি বেশি পাওয়া যাবে। কিন্তু ট্যাংক খালি হতে থাকলে একসময় পানিই কমে যাবে। হিমবাহের ক্ষেত্রেও ঝুঁকিটা অনেকটা এমন।
কিন্তু বিপদ শুধু পানির ঘাটতি নয়, হিমবাহ গলে শুধু নদীতে পানি বাড়ে না। হিমবাহের পাশে বা সামনে তৈরি হতে পারে হিমবাহ হ্রদ। বরফ, পাথর বা ধ্বংসাবশেষের প্রাকৃতিক বাঁধে আটকে থাকা এসব হ্রদের পানি কোনো কারণে হঠাৎ বেরিয়ে গেলে তৈরি হতে পারে Glacial Lake Outburst Flood বা GLOF। যা, অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও কাদা নিচের দিকে ছুটে যেতে পারে। ধ্বংস হতে পারে, সেতু, রাস্তা, বসতি, জলবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। অর্থাৎ, হিমালয়ের বরফ গলে যাওয়ার ঝুঁকি শুধু ভবিষ্যতের পানির সংকট নয়। এটি এখনকার আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
সম্প্রতি নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হিমবাহ-শিলা ধস ও আকস্মিক বন্যা পুরো অঞ্চলকে নাড়িয়ে দিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং নিখোঁজ হয়েছে। এই ঘটনার সুনির্দিষ্ট ট্রিগার বা প্রতিটি প্রক্রিয়ার ভূমিকা আলাদা করে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ পাতলা হওয়া ও পাহাড়ি পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার মতো পরিবর্তন এ ধরনের ধসের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। আর এটা শুধু নেপালের ঘটনা না, পুরো এশিয়ার নিরাপত্তার বিষয়।
এক জায়গায় নয়। বরং কয়েকটি ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করছে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, একটি পরিবর্তনের প্রভাব সীমান্তে থেমে থাকে না। কারণ, নদী সীমান্ত মানে না।
বরফ গলে যাওয়া কেন এত ভয়াবহ?
কারণ এখানে আমরা একটি বরফের স্তর হারাচ্ছি না। আমরা বদলে দিচ্ছি একটি সম্পূর্ণ পানি-ব্যবস্থা। হিমবাহ কমছে। তুষারের সময় বদলাচ্ছে। বরফ গলার সময় বদলাচ্ছে। কোথাও অতিরিক্ত পানি আসছে। কোথাও ভবিষ্যতের পানির উৎস কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আবার কোথাও তৈরি হচ্ছে হিমবাহ হ্রদ ও আকস্মিক বন্যার নতুন ঝুঁকি। অর্থাৎ, একই জলবায়ু পরিবর্তন একই অঞ্চলে একসঙ্গে অতিরিক্ত পানি এবং পানির ঘাটতি, দুটোরই ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, শুধু সময়টা আলাদা।
একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে, হিমালয়ের প্রতিটি বন্যা, ভূমিধ্বস বা আকস্মিক পানির প্রবাহকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, বৃষ্টিপাত, বরফধস, হিমবাহ হ্রদ, পারমাফ্রস্ট, নদীর গতিপথ এবং অন্যান্য কারণ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ছবিটা আমাদের একটি বড় সতর্কবার্তা দিচ্ছে। পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে। বরফ ও তুষারের আচরণ বদলাচ্ছে। হিমবাহের ভর কমছে। আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব পৌঁছে যাচ্ছে পাহাড় থেকে সমতলে।
তাই হিমালয়ের বরফ গলে যাওয়া মানে শুধু পাহাড়ের চূড়া থেকে সাদা বরফ কমে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে- পানির ভবিষ্যৎ। কৃষির ভবিষ্যৎ। খাদ্যের ভবিষ্যৎ। জলবিদ্যুতের ভবিষ্যৎ। আর কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা। তাই ‘থার্ড পোল’কে বোঝা, পর্যবেক্ষণ করা এবং এর ঝুঁকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো শুধু হিমালয়ের দেশগুলোর বিষয় নয়। এটি পুরো এশিয়ার পানির নিরাপত্তার প্রশ্ন।