
‘নেতানিয়াহু সরকারের প্রতি আস্থার চরম অভাব’, বুথফেরত জরিপের ফল নিয়ে আইজেনকোট
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১:৩২

ভোটকেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন এক ইসরাইলি ব্যক্তি। ছবি: রয়টার্স
দক্ষিণ ইসরাইলে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার তিন বছর পর দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন ইসরাইলিরা। গাজায় যুদ্ধ, অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই নির্বাচন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব ও সরকারের ভূমিকা নিয়েও দেশটির অভ্যন্তরে বাড়ছে প্রশ্ন।
৭ অক্টোবরের হামলার আগে নিরাপত্তা ব্যর্থতা, গাজায় নিয়ে যাওয়া জিম্মিদের উদ্ধারে সরকারের ভূমিকা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং অতি-গোঁড়া ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে যোগদান নিয়ে বিরোধ-এসব বিষয় নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) প্রকাশিত সর্বশেষ জনমত জরিপে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর জোট ও বিরোধী জোটের মধ্যে ব্যবধান খুবই কম। ইসরাইলের সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট সামান্য এগিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ দেশটির টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর জরিপের তথ্য সংকলন করেছে। শুক্রবার পর্যন্ত চ্যানেল ১১, ১২ ও ১৩-এর জরিপের গড় হিসাবে নেতানিয়াহুর জোট ৫০টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেতে পারে ৫৪টি আসন।
ইসরাইলের সংসদ নেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য কোনো জোটকে অন্তত ৬১টি আসন পেতে হবে। ফলে কোনো পক্ষই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় (জিএমটি ০৫:০০) ইসরাইলে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। চলবে রাত ১০টা (জিএমটি ২০:০০) পর্যন্ত।
দেশটিতে প্রায় ৭৩ লাখ ভোটার ভোট দেয়ার যোগ্য। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইসরাইলের ১২ লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিকও। রাত ১০টায় ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও, নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোট দেয়ার জন্য ভোটাররা লাইনে থাকলে কেন্দ্রগুলো খোলা রাখা হবে।
বিদেশে বসবাসকারী ইসরাইলিরা সাধারণভাবে ভোট দিতে পারবেন না। কারণ, দেশটিতে অনুপস্থিত ভোটারের জন্য সাধারণ কোনো ব্যালট ব্যবস্থা নেই। ভোটারদের নির্বাচনের দিন সশরীরে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে হয়।
তবে কূটনীতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে। তারা ২০ অক্টোবর ইসরাইলি দূতাবাসে ভোট দিয়েছেন।
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এক্সিট পোলের পূর্বাভাস প্রচার করবে। এতে নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে চূড়ান্ত ফলাফল নিশ্চিত হতে কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহও লেগে যেতে পারে।
ভোট শেষ হওয়ার পর ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ওয়েবসাইটেও ফলাফল সরাসরি প্রকাশ করা হবে। শুক্রবারের মধ্যে চূড়ান্ত ভোট গণনা শেষ হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
আর নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর, ৪ নভেম্বর, আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল প্রকাশ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে দেশটির রাষ্ট্রীয় রেডিওর তথ্যমতে, বুধবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যার মধ্যেই আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করার পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি।
তবে কোনো দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে ফলাফল চূড়ান্ত হতে আরও বেশি সময় লাগতে পারে।
ইসরাইলে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভোটাররা কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীকে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। জাতীয় পর্যায়ে কোনো দল যত শতাংশ ভোট পায়, নেসেটে তাদের আসনসংখ্যাও মূলত সেই অনুপাতের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি যদি জাতীয় ভোটের ৫০ শতাংশ পায়, তাহলে আনুপাতিক হিসাবে নেসেটের ১২০টি আসনের অর্ধেক পাওয়ার কথা।
তবে সংসদে আসন পেতে হলে কোনো দলকে জাতীয় ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হয়। নির্বাচনে প্রায় এক ডজন দল এই ন্যূনতম ভোটের সীমা অতিক্রম করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে ভোট গণনা ও দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টনের প্রক্রিয়ায় সময় লাগতে পারে।
চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তারা কাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান, তা জানার পর প্রেসিডেন্ট এমন একজনকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, যার সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিশ্চিত করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি মনে করেন।
মনোনীত ব্যক্তি সরকার গঠনের জন্য সর্বোচ্চ ৪২ দিন সময় পাবেন।
ইসরাইলে এখন পর্যন্ত কোনো একক দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে সরকার গঠনের জন্য সাধারণত একাধিক দলকে জোট করতে হয়। এ নিয়ে আলোচনা প্রায়ই কয়েক সপ্তাহ ধরে চলে।
নেতানিয়াহু বা তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা কেউই সরকার গঠন করতে না পারলে বর্তমান নেতানিয়াহু সরকারের মন্ত্রিসভা তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
তবে তার আগে নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া পক্ষের সামনে ছোট দলগুলোর সমর্থন আদায়ের নানা পথ খোলা থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘু সরকার গঠন কিংবা ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি করা। এমন চুক্তিতে দুই রাজনৈতিক নেতা পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
সব আলোচনা ব্যর্থ হলে এবং কোনো জোট কার্যকর সরকার গঠন করতে না পারলে ইসরাইলে নতুন নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।