
ইসরাইলের ক্ষমতায় কে এলো গেল তাতে কিছু যায় আসে না: ইরান
ফয়সাল হাসান
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৪৮

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত
হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরাইলে প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনকে মূলত প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ওপর একটি গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ভোটকে ইহুদি রাষ্ট্রটির ৭৮ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ এর ফলাফল ইসরাইলের দীর্ঘতম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতা নেতানিয়াহুর কয়েক দশকব্যাপী রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তিও ঘটাতে পারে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম ইসরাইলি আইনসভা কোনো আগাম বিলুপ্তি ছাড়াই চার বছরের পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করলেও, নেতানিয়াহু, তার দল এবং তার ক্ষমতাসীন জোট এক কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়েছে।
ভোট কবে
২৭ অক্টোবর (মঙ্গলবার) ইসরাইল ২৬তম নেসেটের ১২০ জন সদস্য নির্বাচনের জন্য ভোট দেবে। ইসরাইলের অধিকাংশ এলাকায় স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হবে এবং রাত ১০টায় তা শেষ হবে। তবে কিছু ছোট জনবসতি, হাসপাতাল ও কারাগারে ভোটগ্রহণের সময় কিছুটা কমানো হবে। ইসরাইলে নির্বাচনের দিনটি একটি সরকারি ছুটির দিন।
১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি সকল ইসরাইলি নাগরিক, যারা ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত এবং যাদের পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা ইসরাইলি পরিচয়পত্রের মতো বৈধ কোনো পরিচয়পত্র রয়েছে, তারা ভোট দিতে পারবেন।
তবে অনেক গণতান্ত্রিক দেশের বিপরীতে, ইসরাইলে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই এবং যেসব নাগরিক দেশের বাইরে অবস্থান করছেন, তাদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। ৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
পদ্ধতিটি যেভাবে কাজ করে
ইসরাইলিরা কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর পরিবর্তে একটি দলের তালিকার পক্ষে ভোট দেন। প্রতিটি দল তাদের প্রার্থীদের একটি ক্রমতালিকা তৈরি করে, যা একটি একক ব্যালট পেপারে থাকে। এর মাধ্যমে ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট দল বা সেই দলের প্রার্থী তালিকাকে নির্বাচিত করেন। যে দল সবচেয়ে বেশি ভোট পায়, সেই দলের নেতাই দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, যদিও এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে না।
ইসরাইলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় দেশব্যাপী আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। সংসদে স্থান পাওয়ার জন্য কোনো দলকে অবশ্যই বৈধ ভোটের অন্তত ৩.২৫ শতাংশ পেতে হয়। প্রায় ১০টি দল এবার এই নির্বাচনী সীমা অতিক্রম করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকার গঠনের জন্য কোনো দলের অন্তত ৬১টি আসনের প্রয়োজন হয়, আর এখন পর্যন্ত কোনো দলই এককভাবে এত আসন অর্জন করতে পারেনি। নির্বাচনের পর দলগুলো জোট গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পায়, প্রয়োজনে এই সময়সীমা আরও ১৪ দিন পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে। যদি কেউ তা করতে সক্ষম না হয়, তবে পুনরায় ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
২০১৯ সাল থেকে এটি ইসরাইলের ষষ্ঠ নির্বাচন। আর এই কারণেই ‘কে সবার আগে থাকল’ তার চেয়ে ‘কে ৬১-এর সংখ্যায় পৌঁছাতে পারল’ সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার কীভাবে গঠিত হয়?
ইসরাইলের ৭৮ বছরের ইতিহাসে কোনো একক দল কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। এর অর্থ হলো, দলগুলোকে অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতাকে নিয়ে একটি জোট সরকার গঠন করতে হয়।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সাত দিনের মধ্যে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যিনি মূলত একটি প্রতীকী ভূমিকা পালন করেন।
নেসেটের একজন সদস্যকে, যিনি সাধারণত সর্বাধিক আসন জয়ী দল বা জোটের নেতা হন, তাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন প্রেসিডেন্ট। এরপর সেই প্রার্থীকে ২৮ দিন সময় দেওয়া হয় অন্যান্য দলের সঙ্গে আলোচনা করার, জোট গঠন করার এবং নেসেটে আস্থা ভোটে অনুমোদন লাভের মাধ্যমে সরকার গঠন করার জন্য। তবে যদি তারা তা করতে ব্যর্থ হয়, তবে ওই দল বা জোটটি সময়সীমা ১৪ দিন বাড়ানোর অনুরোধ করতে পারে।
যদি সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তবে প্রেসিডেন্ট অন্য একজন প্রার্থীকে মনোনীত করতে পারেন এবং পুরো প্রক্রিয়াটি পুনরায় শুরু হবে। দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলে, তৃতীয় মনোনীত প্রার্থী সরকার গঠনের জন্য ১৪ দিন সময় পাবেন। যদি সেটিও ব্যর্থ হয়, তবে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হবে।
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কারা?
নব্বইয়ের দশকে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর, ২০০৯ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহু বিদেশে ইসরাইলের মুখ হয়ে উঠেছেন, আর নিজ দেশে তিনি পরিণত হয়েছেন এক মেরুকরণ সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্বে।
সমর্থকরা নেতানিয়াহুকে ‘কিং বিবি’ বলে অভিহিত করেন এবং তাকে এমন একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে দেখেন, যিনি প্রতিকূল অঞ্চলে ইসরায়েলের আত্মরক্ষার জন্য অপরিহার্য।
তবে গাজায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কাছে ‘ওয়ান্টেড’ ব্যক্তি এবং ইসরাইলে দুর্নীতির অভিযোগে বিচার চলা নেতানিয়াহু বর্তমানে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে আছেন।
নেতানিয়াহু বছরের পর বছর ধরে রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য দুটি অতি-অর্থোডক্স ইহুদি দল—‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম’ এবং ‘শাস’-এর ওপর নির্ভর করে এসেছেন। তাদের সম্প্রদায়ের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা থেকে বড় ধরনের অব্যাহতির দাবি, সেই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে তাদের স্বল্প অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় ভাতার ওপর নির্ভরশীলতার মতো বিষয় অনেক ইসরাইলিকে ক্ষুব্ধ করেছে, বিশেষ করে যুদ্ধের এই সময়ে তা আরও বেশি তীব্র হয়েছে।
নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে আছেন সাবেক সামরিক প্রধান গাডি আইজেনকোট, যিনি গাজায় লড়াইয়ের সময় নিজের এক ছেলেকে হারিয়েছেন। ৬৬ বছর বয়সি আইজেনকোট নিজেকে একজন রাজনৈতিক বহিরাগত, সৈনিক এবং কঠোর নিরাপত্তা-পন্থি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার সাধারণ পটভূমি ও পারিবারিক আত্মত্যাগের বিষয়টি নেতানিয়াহুর দীর্ঘ কয়েক দশকের উচ্চপদস্থ শাসনকাল এবং তার বিরুদ্ধে ঝুলে থাকা দুর্নীতির মামলাগুলোর সঙ্গে এক স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করে। তিনি 'ইয়াশার' নামে একটি নতুন মধ্যপন্থি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন; হিব্রু ভাষায় এই শব্দটির অর্থ 'সোজা' বা 'সৎ'।
৫৪ বছর বয়সি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও শীর্ষ এই পদের জন্য আরেক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি একজন ডানপন্থি, সাবেক কমান্ডো, নেতানিয়াহুর সাবেক সহযোগী এবং উচ্চ-প্রযুক্তি খাতের কোটিপতি।
বেনেট মধ্যপন্থি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। তাদের নতুন দলের নাম ‘টুগেদার’, দলটির বার্তার মূল লক্ষ্য হলো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একটি জাতিকে সারিয়ে তোলা এবং দেশকে পুনরায় সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা।
রাজনৈতিক মতাদর্শের বিপরীত মেরুতে অবস্থান করা সত্ত্বেও, তাদের জোট ২০২১ সালের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।
এছাড়া সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী, ৬৮ বছর বয়সি আভিগদোর লিবারম্যান, যিনি একসময় নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন, এখন তার বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন। ব্যাপক কট্টরপন্থি লিবারম্যান ২০১৮ সালে নেতানিয়াহুর সরকার থেকে পদত্যাগ করেন। সে সময় তিনি অভিযোগ করেছিলেন, গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী নমনীয় আচরণ করছেন। বর্তমানে তিনি নেতানিয়াহুর অন্যতম কঠোর সমালোচকে পরিণত হয়েছেন। তার দল, ‘ইসরাইল আওয়ার হোম’, মূলত ইসরাইলের সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আসা অভিবাসী সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বড় ধরনের সমর্থন পায়।
৬৪ বছর বয়সি সাবেক জেনারেল ইয়াইর গোলান, যিনি ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার শিকার একটি স্থান থেকে লোকজনকে উদ্ধার করে প্রশংসিত হয়েছিলেন, তিনি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার দলটি গঠিত হয়েছে ইসরাইলের ঐতিহাসিক লেবার পার্টির ক্ষয়িষ্ণু অবশিষ্টাংশ এবং ছোট বামপন্থি দল মেরেৎজ-এর সমন্বয়ে।
বলা হচ্ছে, যেসব দল কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের সাথে স্পষ্টভাবে যুক্ত নয় তারা নেতানিয়াহু বা তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের পক্ষে ভারসাম্য ঘুরিয়ে দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ‘রাম’ ও ‘জয়েন্ট লিস্ট’, যারা ইসরাইলের ২০ শতাংশ আরব সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব করে।
তাদের পাশাপাশি রয়েছে ‘পিপল অব ইসরাইল’ নামে একটি নতুন ডানপন্থি দল এবং ‘দ্য রিজার্ভিস্টস’ নামে একটি মধ্য-ডানপন্থি দল।
সূত্র: এনডিটিভি