
দাম বাড়ানোর পরও এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে কত টাকায়?
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৭:৫১

এলপি গ্যাস সিলিন্ডার। ছবি: সময় সংবাদ
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে চলছে নজিরবিহীন অস্থিরতা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। কিন্তু নভেম্বর মাসে ভোক্তাপর্যায়ে এলপি গ্যাসের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে দেশে দাম বেড়েছে ৫৭.৭৩ শতাংশ বা ৭৫৪ টাকা।
এদিকে নভেম্বর মাসে এলপিজির দাম বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে সোরগোল শুরু হয়েছে। ভোক্তা থেকে রাজনৈতিক দল, সবাই এমন দাম বাড়ানোর বিষয়টিকে মেনে নিতে পারেনি। তারা বলছে, বিষয়টিকে বিবেচনা করে সহনীয় করার উদ্যোগ নেয়া হোক।
অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে দাম নির্ধারণের আগেই আরও বেশি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ভোক্তারা। এ অবস্থায় আরও এক দফা উচ্চ মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি ভোক্তাদের আরও বিপাকে ফেলবে।
তবে নভেম্বর মাসে এলপিজির দাম বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা দিয়েছে বিইআরসি। সংস্থাটির সচিব মো. নজরুল ইসলাম সরকার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নভেম্বরের জন্য সৌদি আরামকো ঘোষিত প্রোপেন ও বিউটেনের কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সিপি) বিবেচনায় নিয়ে এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এ মাসে প্রতি মেট্রিক টন প্রোপেনের দাম ৭২০ মার্কিন ডলার এবং বিউটেনের দাম ৭৮০ মার্কিন ডলার। এলপিজিতে প্রোপেন ও বিউটেনের মিশ্রণের অনুপাত ৩৫:৬৫ বিবেচনায় গড় সিপি দাঁড়িয়েছে প্রতি মেট্রিক টন ৭৫৯ মার্কিন ডলার।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির প্রধান দুই উপাদান প্রোপেন ও বিউটেনের দাম নির্ধারিত হয় চাহিদা-সরবরাহ, উৎপাদন, জ্বালানি তেলের বাজারমূল্য এবং মৌসুমি ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে। এশিয়ার বাজারে এলপিজির মূল্য নির্ধারণে সৌদি আরামকোর মাসিক কন্ট্রাক্ট প্রাইস গুরুত্বপূর্ণ বেঞ্চমার্ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে প্রোপেন ও বিউটেনের জন্য আলাদা দাম প্রকাশ করে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা এলপিজির ক্ষেত্রে টেক্সাসের মন্ট বেলভিউ বাজারের মূল্যসূচক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে চাহিদা, উৎপাদনকারী দেশগুলোর সরবরাহ, জাহাজের প্রাপ্যতা ও পরিবহন ব্যয়ও দামের ওপর প্রভাব ফেলে।
প্রোপেন ও বিউটেনের দাম আলাদাভাবে নির্ধারিত হওয়ায় এলপিজিতে এই দুই উপাদানের মিশ্রণের অনুপাত অনুযায়ী আমদানি করা কাঁচামালের ব্যয় হিসাব করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে যেকোনো একটি উপাদানের দাম বাড়লেও দেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।
মূলত বিশ্বব্যপী চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশের এলপিজি আমদানির উৎসেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশের এলপিজি আমদানি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎস ছিল ওমান। পাশাপাশি ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলপিজি আমদানি হতো। তবে যুদ্ধের প্রভাবে এসব দেশ থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আমদানির উৎসে বড় পরিবর্তন এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের জায়গা নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
আর দেশের এলপিজি আমদানির বেশিরভাগই হয় বেসরকারি অপারেটরদের মাধ্যমে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট, জাহাজভাড়া বৃদ্ধি এবং আমদানির উৎস পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি পড়ছে বেসরকারি অপারেটরদের ব্যয় ও বাজার সরবরাহে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ বহন করতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
যেভাবে হলো এলপিজির দাম নির্ধারণ
বাংলাদেশে এলপিজির দাম নির্ধারণে সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইসকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে বিইআরসি। এর সঙ্গে আমদানি মূল্য, প্রিমিয়াম এবং দেশে বাজারজাতের বিভিন্ন ব্যয় যোগ করে প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়।
বিইআরসির মূল্য নির্ধারণের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কেজি বোতলজাত এলপিজির দাম নির্ধারণে সৌদি আরবের চুক্তিমূল্য (সৌদি সিপি) অনুযায়ী খরচ ধরা হয়েছে ৯৩ টাকা ৭১ পয়সা। এর সঙ্গে জাহাজভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম চার্জ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ৩০ টাকা ৮৭ পয়সা। ফলে আমদানিমূল্য দাঁড়ায় ১২৪ টাকা ৫৮ পয়সা। এর সঙ্গে ৯ টাকা ৩৪ পয়সা মূসক যোগ করে মূসকসহ আমদানিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৩ টাকা ৯২ পয়সা।
আমদানি সংক্রান্ত অন্যান্য চার্জ হিসেবে (ল্যান্ডিং চার্জ ০.৩২২০ টাকা, রিভার ডিউজ ০.০৫৫ টাকা, লেভি ০.০০৩৫ টাকা, পোর্ট চার্জ ০.০০২৩ টাকা, কাস্টমস সার্ভে ০.০১৩৮ টাকা, বিস্ফোরক পরিদফতরের অনাপত্তি ফিস ০.০০১৩ টাকা, এলসি চার্জ/কমিশন ০.৩০৮০ টাকা, ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম ০.০৯২৪ টাকা, সিএন্ডএফ কমিশন ০.৪১৮৫ টাকা, ডিসপোর্ট ইন্সপেকশন চার্জ ০.১৫৪০ টাকা ও এলসি অ্যামেন্ডমেন্ট চার্জ ০.০০০৩ টাকা) মোট ১ টাকা ৩৭ পয়সা যুক্ত করা হয়েছে। এতে ইমপোর্ট প্যারিটি প্রাইস দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকা ২৯ পয়সা।
এরপর মজুতকরণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ বাবদ ২৩ টাকা ৪৮ পয়সা যোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে অপারেটরের প্লান্ট থেকে ডিস্ট্রিবিউটর পর্যন্ত পরিবহন খরচও অন্তর্ভুক্ত। এতে মজুতকরণ ও বোতলজাতকরণ পরবর্তী মূসকসহ মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৫৮ টাকা ৭৭ পয়সা।
সবশেষে ডিস্ট্রিবিউটর চার্জ হিসেবে ৭ টাকা ৮ পয়সা এবং রিটেইলার চার্জ হিসেবে ৫ টাকা ৮৩ পয়সা যুক্ত করা হয়েছে। ডিস্ট্রিবিউটর চার্জের মধ্যে রিটেইলারের গুদাম বা আঙিনা পর্যন্ত পরিবহন খরচ অন্তর্ভুক্ত। রিটেইলার চার্জের মধ্যে হোম ডেলিভারি খরচ ধরা হয়নি। সব মিলিয়ে খুচরা বিক্রেতার পর্যায়ে ভোক্তাদের জন্য প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭১ টাকা ৬৮ পয়সা।
এই হিসাবে খুচরা বিক্রেতার পর্যায়ে ভোক্তাদের জন্য ১২ কেজি এলপিজির দাম দাঁড়ায় ১৭১.৬৮*১২= ২,০৬০.১৬ টাকা।
হাতবদলেই বাড়ছে দাম
বাংলাদেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়। আমদানি পর কয়েক হাত বদলের মাধ্যমে খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছায় সিলিন্ডারে করে। এই প্রক্রিয়ায় চলে নানা ধরনের কমিশন বাণিজ্য। আর এসব ধাপে বাড়তি মুনাফার অভিযোগ রয়েছে।
আমদানির পর গ্যাস সংরক্ষণ, সিলিন্ডারে বোতলজাতকরণ, পরিবেশকদের কাছে সরবরাহ এবং খুচরা পর্যায়ে বিক্রির খরচও মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হলেও এসব খাতে প্রকৃত ব্যয় কত এবং দাম সমন্বয়ের সময় কোন খাতে কত টাকা যুক্ত করা হয়েছে, তা নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব আছে বলে মনে করে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)।
সংগঠনটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, এক ধাপে ২২৩ টাকা এলপি গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘটনাকে বিইআরসির সঙ্গে ব্যবসায়ীদের যোগসাজশের নমুনা বলে মনে হচ্ছে। গণশুনানিতে কারিগরি কমিটি এভাবে দাম বাড়ানোর সুপারিশ করেনি। তারপরও এক ধাপে এত টাকা দাম বাড়ানো কার্যত ব্যবসায়ীদের দাবিই মেনে নেয়ার শামিল। কারণ, আমরা দেখছি, দাম বাড়ানোর পরও নির্ধারিত দামে এলপি গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিইআরসি এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, এলপিজির দাম নির্ধারণের যৌক্তিকতা গণশুনানিতেই প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর আগে দাম বাড়ানো বা কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে ঘরে বসে, যেখানে ব্যবসায়ীদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
তাই গণশুনানিকে কেবল নিয়মরক্ষার আয়োজন মনে করেন তিনি। ড. এম শামসুল আলম আরও বলেন, বিইআরসি আইনে নির্ধারিত দামের বেশি বিক্রি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান থাকলেও সংস্থাটি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বছরের পর বছর এমন পরিস্থিতি চলায় মনে হচ্ছে, বিইআরসি ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো দাম নিচ্ছেন, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা তা ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘কারিগরি কমিটির সুপারিশের চেয়ে বেশি দাম কেন নির্ধারণ করা হলো, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। দাম নির্ধারণের প্রস্তাবে মতামত দেয়ার জন্য মাত্র এক কর্মদিবস সময় দেয়া হয়েছিল। অথচ প্রতিবেদন পর্যালোচনা, মতামত বিশ্লেষণ ও কমিশনের সভা শেষে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চূড়ান্ত আদেশ দেয়া হয়েছে। এত অল্প সময়ে সব মতামত যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যান এবং সচিবকে কল করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মূলত এলপিজি আমদানিতে জাহাজভাড়া ও ট্রেডারদের প্রিমিয়াম প্রতি মেট্রিক টনে ২৫০ মার্কিন ডলার এবং প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ১২৩ টাকা ৪৬ পয়সা বিবেচনায় নেয়া হয়েছে আমদানি মূল্যের ওপর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে।
বিইআরসি জানায়, সৌদি আরামকোর চুক্তিভিত্তিক মূল্য (সৌদি সিপি) অক্টোবরের তুলনায় নভেম্বর মাসে প্রতি মেট্রিক টনে গড়ে ৪৬ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার বেড়েছে। এর ফলে মূসকসহ ১২ কেজির বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে প্রায় ৭৪ টাকা।
নভেম্বরে ১২ কেজি এলপি গ্যাসের নির্ধারিত দাম ৩০০ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ১৩৭ টাকা করার দাবি জানিয়েছিল আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াব। একই সঙ্গে পরিবেশক পর্যায়ে ১০০ টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে কমিশন ২০ টাকা বাড়ানোর দাবিও তুলেছিলেন ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটররা।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির কোষাধ্যক্ষ আবু তাহের বলেন, ব্যবসা পরিচালনায় বিস্ফোরক লাইসেন্স ও ট্রেড লাইসেন্সের পাশাপাশি টিআইএন, ভ্যাট নিবন্ধন এবং সরকারি কর পরিশোধ করতে হয়। এসব খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যয়ও বেড়েছে। এ কারণে দাম বাড়ানোর দাবি যুক্তিসংগত।
এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সিনিয়র সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশীদ বলেন, ‘পরিবহন খরচ বেড়েছে। ডিজেলচালিত জাহাজে জ্বালানি সরবরাহের ব্যয়ও বেড়েছে। এছাড়া পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের মজুরিও বেড়েছে। সব ধরনের ব্যয় বিবেচনায় নিয়েই আমরা যুক্তিসংগতভাবে দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলাম।’
গত ২ নভেম্বর এলপিজির দামে মূলত কয়েকটি খাতের ব্যয় সমন্বয় করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বজুড়ে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ায় এখন আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দূরবর্তী অঞ্চল থেকেও এলপিজি আমদানি করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। ফলে সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইসের (সিপি) বাইরেও ৪০০ থেকে ৫০০ ডলার পর্যন্ত প্রিমিয়াম দিয়ে লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলো এলপিজি আমদানি করছে, যাতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায়। তবে দ্রব্যমূল্য যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় দেশে এলপিজির দাম বাড়ানো হয়নি। বরং বিভিন্ন খাতে বেড়ে যাওয়া ব্যয় সমন্বয় করা হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক যুদ্ধ এবং ডলারের বিনিময় হারের মতো নানা অজুহাতেকে ব্যবসায়ীদের পুরনো কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেন ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের সব যুক্তি অন্ধভাবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশিতে সিলিন্ডার বিক্রি
ভোক্তারা বলছেন, সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সাফিজ নামে একজন ক্রেতা বলেন, ‘২ হাজার ৪০০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। কোথাও নির্ধারিত দামে পাওয়া যায় না।’
বাড়তি দাম রাখার জন্য খুচরা বিক্রেতারা দায় চাপান ডিলারদের ওপর। মহসিন নামে রাজধানীর একজন খুচরা বিক্রেতা বলেন, ‘সরবরাহ কম। ডিলারদের কাছ থেকেই কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে। তারা আমাদের মেমো দেন না। অনেক সময় গাড়ি আসে না। তখন অন্যভাবে সিলিন্ডার আনতে হয়। সব মিলিয়ে কিছুটা বাড়তি টাকা নিতে হচ্ছে।’
যদিও বাড়তি দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছে এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াব। সংগঠনটির সিনিয়র সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশীদ বলেন, ‘বিইআরসির নির্ধারিত দামেই অপারেটররা গ্যাস সরবরাহ করেন। তবে খুচরা বিক্রেতারা যে দামে এলপিজি কিনছিলেন, সেই দামে বিক্রি করে তাদের পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে তারা ভোক্তাদের কাছে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির চেষ্টা করছিলেন কিংবা বাড়তি দাম দাবি করছিলেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
এদিকে দেশে চাহিদার তুলনায় এলপিজির কোনো সংকট নেই বলেও উল্লেখ করেন লোয়াবের সিনিয়র সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশীদ। তিনি বলেন, ‘গত মাসে, এমনকি তার আগের মাসেও বাজারে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি সরবরাহ করা হয়েছে। তবে বর্তমান জরুরি পরিস্থিতিতে কোথাও কোথাও সরবরাহে কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। যেমন, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটেছে। কিন্তু যেখানে চাহিদা ১ লাখ ৩ হাজার টন, সেখানে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি সরবরাহ করা হলে ঘাটতি থাকার কথা নয়।’
গ্যাসের বাজার ঠিক করতে করণীয় কী?
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সে সময় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম প্রথম নির্ধারণ করা হয় ৯৭৫ টাকা। বর্তমানে দেশে এলপিজি আমদানির অনুমোদনপ্রাপ্ত কোম্পানি রয়েছে ৩৫টি। আর আমদানির অবকাঠামোগত সক্ষমতা রয়েছে ২৩টি কোম্পানির।
তবে ২৩টি কোম্পানির আমদানির সক্ষমতা থাকলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে এলপিজি আমদানি করেছে মাত্র ১০টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বিইআরসির গণশুনানিতে ১২ কেজি সিলিন্ডারে বর্তমান ২০০ টাকা কমিশন বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিল।
অর্থনীতিবিদ মাজেদুল হক বলেন, গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। বর্তমানে এলপিজি আমদানিকারকের সংখ্যা পাঁচ থেকে ছয়জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে। সরকারের উচিত আমদানিকারকের সংখ্যা বাড়ানো। আমদানিকারকের সংখ্যা বাড়লে বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়া সম্ভব হবে। এতে এলপিজির দাম কমার সুযোগ তৈরি হবে।
এছাড়া বাজারে সরকারের নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ২২৩ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে এ অজুহাতে যেন ভোক্তাদের কাছ থেকে আরও ৫০০ টাকা বেশি নেয়া না হয়, সেদিকে সরকারকে নজর রাখতে হবে।