
বিসিবির বয়সভিত্তিক ক্রিকেটার বাছাই, দুই শতাধিক খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণ
জহিরুল ইসলাম বাবু, কুমিল্লা
প্রকাশ: শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ৯:১৪

কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের সাহেববাজারের পাশে সমেশপুর গ্রামের মাঠজুড়ে সারি সারি চারা রোপণের বেড। ছবি: সময় সংবাদ
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার সমেশপুর গ্রামে মৌসুমজুড়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকার সবজির চারা বিক্রি হয়। দেশের অন্তত ৩৬ জেলা থেকে ক্রেতারা চারা কিনতে আসেন এখানে। কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হলেও একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয় হাজার হাজার চারা। এর সঙ্গে রয়েছে মানসম্মত বীজের সংকট ও রোগবালাইয়ের ঝুঁকি। এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চারা উৎপাদনকারীদের জন্য নেই সরকারি প্রণোদনা বা বিশেষ আর্থিক সহায়তা।
কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের সাহেববাজার থেকে কয়েক মিনিটের পথ পেরোলেই সমেশপুর গ্রাম। দূর থেকে মাঠজুড়ে চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ। কাছে গেলে দেখা যায়, সারি সারি বেডে বেড়ে উঠছে বিভিন্ন জাতের সবজির চারা। ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, মরিচ, শিম, লাউ, কুমড়া ও ব্রকলিসহ অন্তত ২৩ ধরনের সবজির চারা উৎপাদন হয় এখানে।
স্থানীয়দের উদ্যোগে প্রায় সাত দশক আগে সমেশপুরে বাণিজ্যিকভাবে সবজির চারা উৎপাদন শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে। বর্তমানে গ্রামের প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হচ্ছে বিভিন্ন জাতের সবজির চারা। মৌসুমে প্রতিদিনই জমে ওঠে চারা কেনাবেচার বাজার।
কুমিল্লার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট ও রংপুরসহ দেশের অন্তত ৩৬ জেলা থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা চারা কিনতে আসেন। কেউ কেনেন কয়েক হাজার, আবার কেউ নেন লাখ লাখ চারা। তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের চারা পাওয়ায় দূর-দূরান্তের কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সমেশপুর।
স্থানীয় চারা উৎপাদনকারীদের দাবি, মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে মৌসুমে বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা।
তবে সম্ভাবনাময় এই বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় বাধা জলাবদ্ধতা। বৃষ্টি হলেই অনেক জমিতে পানি জমে যায়। এতে পানিতে ডুবে পচে নষ্ট হয় বিক্রির উপযোগী হাজার হাজার চারা। উৎপাদন খরচ উঠে আসার আগেই লোকসানে পড়তে হয় চাষিদের। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আবার নতুন করে বীজ বপন করতে হয়, ফলে বাড়ে উৎপাদন ব্যয়।
চারা উৎপাদনকারী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্ট করে চারা তৈরি করি। বীজ, সার, শ্রমিক ও জমি প্রস্তুত করতে অনেক টাকা খরচ হয়। কিন্তু বৃষ্টি হলে জমিতে পানি জমে হাজার হাজার চারা নষ্ট হয়ে যায়। তখন আমাদের লোকসান গুনতে হয়। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা গেলে এই ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।’
স্থানীয় উৎপাদনকারীদের দাবি, এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রায় ২ কিলোমিটার খাল খনন করা প্রয়োজন। খালটি খনন করা হলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যাবে। এতে জলাবদ্ধতা কমার পাশাপাশি চারার উৎপাদন ও বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে।
জলাবদ্ধতার পাশাপাশি মানসম্মত বীজের সংকটও ভোগাচ্ছে উৎপাদনকারীদের। তাদের অভিযোগ, ভালো মানের বীজের জন্য অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। আমদানি করা বীজের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এর ওপর বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস ও রোগবালাইয়ের আক্রমণে নষ্ট হয় চারার একটি অংশ।
আরেক চারা উৎপাদনকারী বলেন, ‘ভালো বীজের দাম অনেক বেশি। বীজ কিনে চারা তৈরি করার পর রোগবালাই দেখা দিলে অনেক চারা নষ্ট হয়ে যায়। তখন খরচের টাকাও ওঠে না। আমাদের জন্য সহজে মানসম্মত বীজ পাওয়া এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রয়োজন।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরিণা আক্তার বলেন, সমেশপুরে প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে সবজির চারা উৎপাদন হচ্ছে। আমদানিনির্ভর বীজের কারণে উৎপাদনকারীরা তুলনামূলক কম লাভ করছেন। দেশে মানসম্মত বীজ উৎপাদন বাড়ানো গেলে তাদের লাভের পরিমাণও বাড়বে। তবে চারা উৎপাদনকারীদের জন্য আলাদা কোনো প্রণোদনা বা আর্থিক সহায়তার সুযোগ নেই।
কৃষি-সংশ্লিষ্টদের মতে, সমেশপুরের চারা উৎপাদন শুধু স্থানীয় অর্থনীতিতেই অবদান রাখছে না, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সবজি চাষেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, মানসম্মত বীজের সহজলভ্যতা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সহায়তা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
স্থানীয় উৎপাদনকারীদের প্রত্যাশা, তাদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নেবে। এতে একদিকে যেমন চারার অপচয় ও উৎপাদন খরচ কমবে, অন্যদিকে সমেশপুরের সম্ভাবনাময় এই বাণিজ্য আরও এগিয়ে যাবে।