
যুবলীগ নেতা সন্দেহে আটক ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে নিলেন জামায়াত নেতারা
জহিরুল হক বাবু
প্রকাশ: রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল নিয়ন্ত্রণে বিধিনিষেধ ও পুলিশের অভিযান থাকলেও বাস্তবে এসব যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। ছবি: সময় সংবাদ
রাতের আঁধারে মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেক যাত্রীর শেষ ভরসা সিএনজিচালিত অটোরিকশা। কিন্তু সেই বাহনেই কখনো ঘটছে ছিনতাই, ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধ। অপরিচিত চালকের গাড়িতে উঠে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে যাত্রীদের মধ্যে।
কুমিল্লায় রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী ও স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন হত্যাকাণ্ডে সিএনজিচালকের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে আসার পর এই আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
জানা যায়, মহাসড়কের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে রাতে যাত্রীদের অপেক্ষায় থাকে অসংখ্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এসব গাড়িচালকের পরিচয়, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং যানবাহনের কাগজপত্র যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা কতটা রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, কোনো কোনো গাড়িতে নম্বরপ্লেটও থাকে না। ফলে অপরাধের শিকার হলে গাড়ি ও চালককে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে চালকদের একটি অংশের দাবি, কিছু অসাধু চালকের অপরাধের কারণে পুরো পেশার মানুষকে সন্দেহের মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেক গাড়ির কাগজপত্র ঠিক নেই, আবার কিছু গাড়ি চালান অস্থায়ী চালকেরা। অপরাধ প্রতিরোধে চালকদের পরিচয়সংবলিত তথ্যভাণ্ডার তৈরির উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ। তবে সেই উদ্যোগ কবে বাস্তবায়িত হবে, কীভাবে চালকদের তথ্য যাচাই করা হবে এবং রাতের মহাসড়কে নজরদারি কীভাবে বাড়ানো হবে, তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
গত ২৪ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে নিখোঁজ হন রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। পরদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে ছিনতাই ও মারধরের পর তাকে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দেয় একটি চক্র।
এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রায় ছয় মাস পর একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয় স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন হত্যাকাণ্ডে। গত ৮ অক্টোবর রাতে কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে বাস থেকে নেমে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাজমিন। অভিযোগ, পথে ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সিএনজিচালক সুমনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
দুটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডেই সিএনজিচালকের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে আসায় মহাসড়কে রাতের যাত্রী পরিবহন, চালকদের পরিচয় যাচাই এবং যানবাহনের ওপর নজরদারি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে দূরপাল্লার বাস থেকে রাতে নেমে যারা একা বাড়ি ফেরেন, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের পদুয়ার বাজার, কোটবাড়ি, জাগুরঝুলি ও আলেখারচরসহ বিভিন্ন স্থানে রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করতে দেখা যায়। দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে যাত্রীরা এসব গাড়িতে করে শহর কিংবা আশপাশের এলাকায় যাতায়াত করেন।
যাত্রীদের অভিযোগ, রাতে গন্তব্যে যাওয়ার বিকল্প পরিবহন সীমিত থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়েই অপরিচিত চালকের অটোরিকশায় উঠতে হয়। চালকের পরিচয় বা গাড়ির বৈধ কাগজপত্র যাচাই করার সুযোগ থাকে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গাড়িতে দৃশ্যমান নম্বরপ্লেট না থাকায় যাত্রার আগে গাড়ি শনাক্ত করার উপায়ও থাকে না।
অভিযোগ রয়েছে, অপরাধীরা একা যাত্রীদের লক্ষ্য করে গাড়িতে তোলে। পরে নির্জন স্থানে নিয়ে অস্ত্রের মুখে টাকা, মোবাইল ফোন ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়া হয়। কোনো কোনো ঘটনায় যাত্রীকে মারধর করে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে রাতে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে পরিবহন তদারকি বাড়ানো, চালকদের পরিচয় যাচাই এবং সন্দেহজনক যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন যাত্রীরা।
নিয়মিত মহাসড়কে যাতায়াতকারী যাত্রীদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। যাত্রী বহনকারী অটোরিকশার চালককে, গাড়ির মালিককে এবং চালকের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে কি না এসব তথ্য সহজে যাচাই করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তাদের দাবি, প্রতিটি অটোরিকশায় স্পষ্ট ও দৃশ্যমান নম্বরপ্লেট নিশ্চিত করার পাশাপাশি চালকের পরিচয়সংবলিত কার্ড চালু করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট পোশাক বা পরিচয়চিহ্ন থাকলে যাত্রীদের জন্য চালককে শনাক্ত করা সহজ হবে। একইসঙ্গে মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি এবং রাতে নিয়মিত টহল বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
যাত্রীদের আশঙ্কা, পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা না থাকলে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং অপরাধের পর দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তাই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি অপরাধের সুযোগ কমাতে আগাম নজরদারি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকদের একটি অংশের ভাষ্য, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের কারণে বৈধভাবে জীবিকা নির্বাহকারী চালকেরাও ভোগান্তিতে পড়ছেন।
তাদের অভিযোগ, কিছু চালক ছিনতাইয়ের উদ্দেশে দূরদূরান্ত থেকে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে গাড়ি নিয়ে আসেন। আবার অনেক গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই এবং কিছু গাড়ি চালানো হয় অস্থায়ী চালক দিয়ে।
চালকদের মতে, সব চালককে একইভাবে সন্দেহ না করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা জরুরি। পাশাপাশি যেসব গাড়ির কাগজপত্র নেই, যেসব চালকের বৈধ লাইসেন্স নেই এবং যারা নিয়ম ভেঙে মহাসড়কে চলাচল করেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
তারা মনে করেন, চালকদের নিবন্ধন ও পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা কার্যকর হলে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে বৈধ চালকদের পরিচয়ও স্পষ্ট হবে, যা তাঁদের পেশাগত নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে।
মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল নিয়ন্ত্রণে বিধিনিষেধ ও পুলিশের অভিযান থাকলেও বাস্তবে এসব যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। রাতের বেলায় বিভিন্ন পয়েন্টে অটোরিকশার উপস্থিতি এবং যাত্রী পরিবহনের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ বলেন, ‘মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তবে জনবল ও যানবাহনের সংকটের কারণে পর্যাপ্ত চেকপোস্ট স্থাপন এবং নিয়মিত টহল পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।’
তিনি বলেন, অপরাধপ্রবণ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ রয়েছে। মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
কুমিল্লায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও চালকদের পরিচয়সংবলিত তথ্যভাণ্ডার তৈরির উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান।
পুলিশের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চালকদের পরিচয়, যানবাহনের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং অভিযোগের তদন্তে সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে তথ্যভাণ্ডার তৈরির পাশাপাশি তথ্যগুলো নিয়মিত হালনাগাদ করা, গাড়ির মালিকানা ও চালকের পরিচয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই এবং অস্থায়ী চালকদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে শুধু তালিকা তৈরি করেই কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় নিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ২২ হাজার ২৪৭টি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, জেলায় চলাচলকারী অটোরিকশার প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার হতে পারে।
এ দিকে কতজন চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে, তারও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। ফলে নিবন্ধিত গাড়ি, অনিবন্ধিত বা কাগজপত্রবিহীন গাড়ি এবং সেগুলোর চালকদের মধ্যে কারা নিয়ম মেনে চলছেন, তা নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
মহাসড়কে রাতের যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু অপরাধের পর গ্রেফতার বা অভিযান পরিচালনাই যথেষ্ট নয়। চালকদের পরিচয় যাচাই, বৈধ লাইসেন্স নিশ্চিত করা, গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা, নম্বরপ্লেট দৃশ্যমান রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে নিয়মিত টহল সবকিছুর সমন্বিত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
বুলেট বৈরাগী ও জান্নাতুল তাজমিন হত্যাকাণ্ডের পর রাতের মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাতায়াতের নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার কার্যকর সমাধান এখন সময়ের দাবি। চালকদের তথ্যভাণ্ডার তৈরির উদ্যোগ বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে রাতের যাত্রীদের নিরাপত্তা।