
চকলেটপ্রেমীদের দিন আজ
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৩৩

প্রতিবছর ২৭ অক্টোবর পালিত হয় ‘ন্যাশনাল ব্ল্যাক ক্যাট ডে’। ছবি: সংগৃহীত
প্রাচীন মিশরে ছিল সম্মানের প্রতীক, মধ্যযুগের ইউরোপে জড়িয়ে পড়ে শয়তান ও ডাইনিবিদ্যার কল্পকাহিনিতে। শতাব্দী পেরিয়েও কালো বিড়ালকে ঘিরে রয়ে গেছে নানা কুসংস্কার। কিন্তু এর পেছনের ইতিহাস কী?
কালো বিড়াল রাস্তা পার হলে অমঙ্গল হবে—এমন বিশ্বাস অনেকেরই পরিচিত। কোথাও কালো বিড়ালকে দুর্ভাগ্যের প্রতীক মনে করা হয়, আবার কোথাও এই প্রাণীকে সৌভাগ্যের চিহ্ন হিসেবেও দেখা হয়। অথচ বিড়ালের গায়ের রংয়ের সঙ্গে মানুষের ভাগ্য কিংবা ভবিষ্যতের কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই। তাহলে কীভাবে নিরীহ এই প্রাণীটি জড়িয়ে পড়ল অশুভ শক্তি, শয়তান ও ডাইনিবিদ্যার গল্পে?
প্রাচীন মিশরে বিড়াল ছিল সম্মানের প্রতীক
কালো বিড়ালকে অশুভ ভাবার ইতিহাস জানার আগে প্রাচীন সভ্যতায় বিড়ালের অবস্থান সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। প্রাচীন মিশরে বিড়াল ছিল অত্যন্ত সম্মানিত প্রাণী। মিশরীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাস ও শিল্পকলায় বিড়ালের বিশেষ স্থান ছিল। দেবী বাসতেতকে প্রায়ই বিড়ালের মাথাবিশিষ্ট নারী হিসেবে চিত্রিত করা হতো। তিনি পরিবার, সুরক্ষা ও মাতৃত্বের মতো ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বিড়ালকে ঘিরে মিশরীয়দের শ্রদ্ধা এতটাই গভীর ছিল যে, তাদের হত্যা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে কালো বিড়ালকে বিশেষভাবে দেবী ডায়নার প্রতীক হিসেবে দেখার যে দাবি প্রচলিত রয়েছে, তা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। গ্রিক-রোমান পুরাণে ডায়না ও অন্যান্য দেবীর সঙ্গে বিড়ালের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা থাকলেও প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে পরিচিত বিড়াল-সম্পর্কিত দেবী ছিলেন বাসতেত।
ত্রয়োদশ শতকে বদলাতে শুরু করে দৃষ্টিভঙ্গি
কালো বিড়ালকে অশুভ শক্তির সঙ্গে যুক্ত করার ইতিহাসে ত্রয়োদশ শতকের ইউরোপের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। সে সময় ইউরোপের খ্রিষ্টীয় সমাজে ধর্মীয় ভিন্নমত ও কথিত ধর্মদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে ঘিরে সন্দেহ এবং নিপীড়ন বাড়ছিল।
১২৩৩ সালে পোপ নবম গ্রেগরি ‘ভক্স ইন রামা’ নামে একটি পোপীয় দলিল জারি করেন। এতে জার্মানির কথিত একটি ধর্মদ্রোহী গোষ্ঠীর আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে বর্ণনা ছিল। সেই বর্ণনায় শয়তানি আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে একটি কালো বিড়ালের চিত্রও উঠে আসে।
ইতিহাসের জনপ্রিয় বর্ণনায় এই ঘটনাকে কালো বিড়াল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ছড়িয়ে পড়ার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখা হয়। তবে পোপের ওই দলিলে ইউরোপজুড়ে সব কালো বিড়াল হত্যা করার সরাসরি নির্দেশ ছিল—এমন দাবি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। দলিলটি মূলত কথিত ধর্মদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রেক্ষাপটে জারি হয়েছিল।
মধ্যযুগের শেষভাগ থেকে ইউরোপে কালো বিড়াল ও জাদুবিদ্যাকে ঘিরে নানা লোককাহিনি ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে ডাইনিবিদ্যা নিয়ে ভয় ও নিপীড়নের সময় বিড়ালকে ডাইনিদের সঙ্গী বা অতিপ্রাকৃত সহকারী হিসেবে চিত্রিত করা হতে থাকে।
তৎকালীন কিছু বিশ্বাসে বলা হতো, ডাইনিরা বিড়ালের রূপ ধারণ করতে পারে কিংবা শয়তান বিড়ালের রূপে মানুষের সামনে হাজির হতে পারে। আবার কালো বিড়ালকে ডাইনিদের গোপন কাজে সহায়তাকারী প্রাণী হিসেবেও কল্পনা করা হতো।
এসব ধারণার পেছনে ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককাহিনি, অজানার ভয় এবং তৎকালীন সমাজের কুসংস্কার ভূমিকা রেখেছিল। তবে ডাইনিদের সঙ্গে কালো বিড়ালের অতিপ্রাকৃত সম্পর্কের কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
কালো বিড়ালের গায়ের রং এবং রাতের বেলায় তাদের চলাফেরাও মানুষের কল্পনাকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে। অন্ধকারে কালো লোমের কারণে বিড়ালকে সহজে দেখা যায় না। আবার আলো পড়লে বিড়ালের চোখ উজ্জ্বল দেখাতে পারে, যা অনেকের কাছে রহস্যময় মনে হয়।
বিড়ালের চোখে আলো প্রতিফলিত হওয়ার একটি বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে, যা কম আলোতে দেখতে সাহায্য করে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বিড়াল সম্পূর্ণ অন্ধকারে দেখতে পায় কিংবা তার চোখে অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তি রয়েছে।
প্রকৃতির এই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে যখন অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে, তখনই কালো বিড়ালকে ঘিরে নানা ভীতিকর গল্প আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
দুর্ভাগ্যের প্রতীক, নাকি সৌভাগ্যের?
কালো বিড়ালকে নিয়ে পৃথিবীর সব সংস্কৃতিতে একই ধারণা প্রচলিত নয়। ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে একে দুর্ভাগ্যের প্রতীক মনে করা হলেও স্কটল্যান্ড ও জাপানের কিছু লোকবিশ্বাসে কালো বিড়াল সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি কিংবা শুভ ঘটনার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
অর্থাৎ, একটি প্রাণীকে অশুভ কিংবা শুভ ভাবার বিষয়টি অনেকাংশেই নির্ভর করে সমাজের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও প্রচলিত বিশ্বাসের ওপর। একই প্রাণী এক জায়গায় ভয়ের কারণ, অন্য জায়গায় আশীর্বাদের প্রতীক—এটাই লোকবিশ্বাসের বৈচিত্র্য।
কুসংস্কারের প্রভাব আজও রয়েছে
কালো বিড়ালকে ঘিরে প্রচলিত ধারণা কেবল গল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কিছু জায়গায় গায়ের রংয়ের কারণে কালো বিড়ালকে দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনীহা দেখা যায়। প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে কালো বিড়াল নিয়ে মানুষের নেতিবাচক ধারণা তাদের দত্তক পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে।
অথচ একটি বিড়ালের স্বভাব, আচরণ ও স্বাস্থ্য তার গায়ের রং দিয়ে নির্ধারিত হয় না। কালো বিড়াল অন্য রঙের বিড়ালের মতোই স্নেহশীল, খেলাপ্রিয় এবং মানুষের সঙ্গ উপভোগ করতে সক্ষম হতে পারে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানুষের ভয়, ধর্মীয় দ্বন্দ্ব এবং কল্পকাহিনি কখনো কখনো নিরীহ প্রাণীর পরিচয়ও বদলে দিয়েছে। কালো বিড়াল তার একটি উদাহরণ। ত্রয়োদশ শতকের ইউরোপে ধর্মদ্রোহিতা ও শয়তানি আচার নিয়ে প্রচলিত ধারণা থেকে শুরু করে পরবর্তী শতকের ডাইনিবিদ্যার গল্প—বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট মিলে এই কুসংস্কারকে শক্তিশালী করেছে।
যুক্তরাজ্যে প্রতিবছর ২৭ অক্টোবর পালিত হয় ‘ন্যাশনাল ব্ল্যাক ক্যাট ডে’। প্রাণীকল্যাণমূলক সংস্থা ক্যাটস প্রোটেকশন ২০১১ সালে দিবসটি চালু করে। কালো ও সাদা-কালো বিড়ালের সৌন্দর্য তুলে ধরা এবং তাদের দত্তক নেওয়ার বিষয়ে মানুষকে উৎসাহিত করাই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে, ১৭ আগস্ট পালিত হয় ‘ব্ল্যাক ক্যাট অ্যাপ্রিসিয়েশন ডে’ বা কালো বিড়ালের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের দিন। এই দিবসের উদ্দেশ্যও কালো বিড়ালকে ঘিরে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা এবং তাদের প্রতি যত্নশীল হওয়ার আহ্বান জানানো।
সূত্র: হিস্টোরি ডট কম এবং মধ্যযুগীয় ইউরোপের ইতিহাসবিষয়ক গবেষণা