
কংগ্রেস নেতার দাবিভারতীয় ভূখণ্ডের ৪০-৫০ কিমি ভেতরে ঢুকে পড়েছে চীনের সেনারা!
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৮

ইসরাইলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন আরব ভোটাররা। ছবি: সংগৃহীত
ইসরাইলকে বলা হয় ইহুদি রাষ্ট্র। দেশটির রাজনীতিতেও ইহুদি জাতীয়তাবাদের প্রভাব ব্যাপক। কিন্তু সেই ইসরাইলের নির্বাচনেই এবার আলোচনায় উঠে এসেছে আরব দলগুলো। বুথফেরত জরিপ বলছে, দেশটির পার্লামেন্টে আরব-প্রধান দলগুলো ১৮ থেকে ১৯টি আসন পেতে পারে। আগের পার্লামেন্টে দল দুটির আসন ছিল মোট ১০টি। ফলে এবার সরকার গঠনের হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে তাদের ভূমিকা। প্রশ্ন হলো, ইহুদি রাষ্ট্রে আরব দলগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কীভাবে?
ইসরাইলের সব নাগরিক ইহুদি নন। সেখানে আরবরাও বাস করেন। ইসরায়েলে বসবাসরত এসব আরব সাধারণত ‘আরব ইসরাইলি’ বা ইসরাইলি আরব’ নামে পরিচিত। এরা হলেন সেইসব ফিলিস্তিনি এবং তাদের বংশধর, যারা ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার সময়ও ওই ভূখণ্ডে বসবাস করত এবং আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর ইসরাইল রাষ্ট্রের সীমানার ভেতরেই থেকে গিয়েছিলেন। এদের সংখ্যা বর্তমানে ২০ লাখের বেশি, যা ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১%।
ইসরাইলের আরব নাগরিকরা প্রধানত তিনটি ধর্মীয় গ্রুপে বিভক্ত— সুন্নি মুসলিম, খ্রিষ্টান এবং দ্রুজ। সুন্নি মুসলিম আরব জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশ (প্রায় ৮৪%)। এর মধ্যে একটি বড় অংশ হলো নেগেভ ও উত্তরাঞ্চলের যাযাবর বা বেদুইন সম্প্রদায়।
খ্রিস্টানরা মোট আরব জনসংখ্যার প্রায় ৮%। এদের বেশির ভাগই গ্রিক অর্থোডক্স এবং ক্যাথলিক চার্চের অনুসারী। বাকি ৮% হলো দ্রুজরা। তবে জাতিগতভাবে আরব হলেও তাদের একটি নিজস্ব ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয় রয়েছে।
ইসরাইলে আরবদের পরিচয় বেশ জটিল। তারা একদিকে যেমন ইসরাইলের নাগরিক, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক ও পারিবারিকভাবে পশ্চিম তীর, গাজা ও অন্যান্য স্থানে থাকা ফিলিস্তিনিদের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। তাই অনেকে নিজেদের ‘ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিক’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ইসরাইলের আরবদের ভোট দেওয়ার, রাজনৈতিক দল গঠনের এবং পার্লামেন্টে নির্বাচিত হওয়ার অধিকার রয়েছে।
তবে ইসরাইলের আরব নাগরিকদের সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। পশ্চিম তীর ও গাজার অধিকাংশ ফিলিস্তিনি ইসরাইলের নাগরিক নন। তাই তারা ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না।
ইসরাইলের পার্লামেন্টের নাম নেসেট। এখানে মোট আসন ১২০টি। বাংলাদেশে সাধারণত একটি আসনে একজন প্রার্থী নির্বাচিত হন। ভোটাররা সেই আসনের প্রার্থীদের মধ্যে একজনকে ভোট দেন। কিন্তু ইসরাইলে পদ্ধতিটি আলাদা। সেখানে ভোটাররা মূলত রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। আর দল যত ভোট পায়, সেই অনুপাতে পার্লামেন্টে আসন বন্টন করা হয়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা।
ইসরাইলে ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না। তারা পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচনের জন্য দলকে ভোট দেন। এরপর সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে হয়।
ধরা যাক, কোনো দল ৪৮টি আসন পেল। কিন্তু সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। ফলে এককভাবে ওই দল সরকার গঠন করতে পারবে না। তাকে অন্য দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে।
যেমন, ৪৮ আসন পাওয়া দলটি ২৪ আসন পাওয়া আরেকটি দলের সমর্থন পেলে মোট আসন হবে ৭২। অর্থাৎ, সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব হবে। এভাবে একাধিক দল মিলে জোট সরকার গঠন করতে পারে। জোটের সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান সংশ্লিষ্ট নেতা। ইসরাইরের ইতিহাসে কখনোই কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় যায়নি। প্রতিবারই জোট সরকার গড়তে হয়েছে।
ধরা যাক, ইসরাইলের আরব-প্রধান দলগুলো নির্বাচনে মোট ১৮টি আসন পেল। অন্যদিকে, সরকার গঠনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী দুই বড় জোটেরই আরও আসন প্রয়োজন।
সে ক্ষেত্রে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তারা কোনো একটি জোটকে সমর্থন দিলে সেই জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি যেতে পারে বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে।
ইসরাইলের এবারের নির্বাচনে আরব-প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। একটি রা’আম বা ইউনাইটেড আরব লিস্ট। অন্যটি জয়েন্ট লিস্ট। দ্য জেরুজালেম পোস্ট বলছে, বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, রা’আম ৭টি এবং জয়েন্ট লিস্ট ১১ থেকে ১২টি আসন পেতে পারে। সব মিলিয়ে তাদের আসনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ১৮ থেকে ১৯টি। আগের পার্লামেন্টে দল দুটির আসন ছিল পাঁচটি করে। অর্থাৎ, প্রাথমিক হিসাব ঠিক থাকলে তাদের প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তবে বুথফেরত জরিপের সংখ্যা চূড়ান্ত ফলাফল নয়।
এই ফলাফলের পেছনে আরব নাগরিকদের ভোটদানের হার বেড়ে যাওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরব-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটদানের হার প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছানোর প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দেশটির সাম্প্রতিক নির্বাচনের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। আরব দলগুলোর নেতারা আশা করছেন, বেশি ভোট তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়াবে এবং সরকার গঠনের আলোচনায় তাদের গুরুত্ব বাড়াবে।
এবারের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির—কেউই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি বলে বুথফেরত জরিপে দেখা যাচ্ছে। জরিপভেদে নেতানিয়াহুর জোটের সম্ভাব্য আসন ৫০ থেকে ৫২টি। বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য আসন ৪৯ থেকে ৫৩টি। অথচ সরকার গঠন করতে প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। ফলে দুই পক্ষেরই আরও সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আরব দলগুলোর ১৮ থেকে ১৯টি সম্ভাব্য আসন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তারা বিরোধী শিবিরকে সমর্থন দিলে নেতানিয়াহুর জোটের সরকার গঠনের পথ কঠিন হতে পারে। তবে আরব দলগুলো বিরোধীদের সমর্থন করলেই যে নতুন সরকার গঠন নিশ্চিত হবে, তা নয়। বিরোধী শিবিরের সব দল আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনে রাজি নয়। ফলে সংখ্যার হিসাবের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতাও বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।
ইসরাইলের আরব-প্রধান দলগুলোর রাজনীতি শুধু প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। আরব নাগরিকদের অধিকার, বৈষম্য কমানো, আরব অধ্যুষিত এলাকার উন্নয়ন এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণও তাদের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে তাদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব আরব দলের রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের মধ্যে আদর্শিক ও রাজনৈতিক পার্থক্য রয়েছে।
পার্লামেন্টে আসন বাড়া মানে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়া। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, রাষ্ট্রের নীতিতেও তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসবে। সরকার গঠনে সমর্থন দেওয়ার বিনিময়ে আরব দলগুলো নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরতে পারে। তবে সেই দাবিগুলো বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে জোটের সমঝোতা ও সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।
অন্যদিকে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আরব দলগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে আপত্তিও রয়েছে।
ইসরাইলের নির্বাচনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কে সরকার গঠন করতে পারবে। নেতানিয়াহুর জোট প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে পারে। আবার বিরোধী শিবিরও আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারে। কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। সেক্ষেত্রে জাতীয় বড় দলগুলো মিলে জাতীয় সরকার গঠন করতে পারে। এমনকি নতুন নির্বাচনের প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে। চূড়ান্ত ফলাফল ও পরবর্তী রাজনৈতিক আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সম্ভাবনাকেই নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।