
এইচএসসির সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার তারিখ জানা গেল
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:১৩

আবাসন, শিক্ষক ও পরিবহনসহ নানা সংকটে ধুঁকছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার দু’দশক পেরিয়ে গেলেও এখনও আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী।
অন্যদিকে, শিক্ষকের অনুমোদিত পদের প্রায় ৫৪ শতাংশই খালি। কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না চিকিৎসাকেন্দ্রেও। তবে উপাচার্য বলছেন, সংকট কমাতে কাজ করছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সমস্যা-সংকট নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ দ্বিতীয় পর্ব।
আবাসনসংকটের পাশাপাশি শিক্ষকস্বল্পতায় নাজুক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম। ২৫টি বিভাগে প্রায় ৫০০টি অনুমোদিত শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৩০ জন। অর্থাৎ শূন্য রয়েছে ৫৪ শতাংশ পদ। এর মধ্যে ৪০ জন শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে এবং দুজন রয়েছেন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। ফলে প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত পাঠদান, ব্যবহারিক ক্লাস ও গবেষণা কার্যক্রম। কোনো কোনো বিভাগে বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অতিথি শিক্ষক এনে চলছে পাঠদান।
অন্যদিকে, সীমিত জনবলের কারণে অতিরিক্ত কাজের চাপে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরত শিক্ষকরাও। এতে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার মান নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে ছয়টি ব্যাচে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র চারজন। তাদের একজন চলতি বছরের এপ্রিল থেকে শিক্ষা ছুটিতে থাকায় বর্তমানে তিনজন শিক্ষক দিয়ে চলছে বিভাগের একাডেমিক কার্যক্রম। ফলে নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি ব্যবহারিক ক্লাস ও ল্যাব কার্যক্রম সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিভাগটিকে। বাধ্য হয়ে বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খণ্ডকালীন ও অতিথি শিক্ষক এনে পাঠদান চালাতে হচ্ছে।
বিভাগটির শিক্ষার্থী ইফতেখার আহমেদ বলেন, একটি বিভাগ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক ও উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। কিন্তু তারা কোনোটিই পাচ্ছেন না। ক্লাস ও ল্যাবের নাজুক পরিস্থিতির কারণে ব্যবহারিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে পড়াশোনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনেও পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মেরাজুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকসংকটের কারণে বাইরের ছয়জন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালাতে হচ্ছে। বিভাগের প্রত্যেক শিক্ষককে অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হয়। এর বাইরে সেমিনার রেজিস্ট্রার, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ও ল্যাব ডেমোনস্ট্রেটরও নেই। ফলে সীমিত জনবল নিয়ে বিভাগ পরিচালনা করতে হচ্ছে। এ সংকট কাটাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
শুধু পরিসংখ্যান বিভাগ নয়, একই চিত্র মার্কেটিং বিভাগেও। ছয়টি ব্যাচে প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র চারজন। ফলে প্রয়োজনীয় ক্লাস নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে সীমাবদ্ধতা।
বিভাগটির প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রোহানা জামান বলেন, শিক্ষকস্বল্পতার কারণে পর্যাপ্ত ক্লাস হচ্ছে না। অন্য বিভাগের শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করে পাঠদান চালাতে হচ্ছে। এতে নিজ বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ ও স্বাচ্ছন্দ্যে ক্লাস করার সুযোগ কমে যাচ্ছে। কোনো বিষয়ে বিস্তারিত জানতে কিংবা শিক্ষকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। দ্রুত নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে এ সংকট দূর করার দাবি জানান তিনি।
মার্কেটিং বিভাগের প্রভাষক সুমনা আক্তার বলেন, শিক্ষক কম থাকায় একই শিক্ষকের ওপর একাধিক কোর্স পরিচালনার পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বও এসে পড়ছে। এতে স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের যথাযথ সময় দেওয়া এবং কাঙ্ক্ষিত মানের পাঠদান নিশ্চিত করাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষকসংকটের প্রভাব পড়ছে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত গবেষণা ও পেশাগত উন্নয়নেও। সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ছয়জন শিক্ষকের মধ্যে তিনজনই রয়েছেন শিক্ষা ছুটিতে। ফলে বাকি তিনজন শিক্ষককে ছয়টি ব্যাচের পাঠদানসহ একাধিক কোর্স, থিসিস ও মনোগ্রাফের কাজ তত্ত্বাবধান করতে হচ্ছে বলে জানান বিভাগটির বিভাগীয় প্রধান মাসুদুর রহমান।
তিনি বলেন, শিক্ষকস্বল্পতার কারণে ছয়টি ব্যাচের পাঠদান পরিচালনা করতে নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সময় ও মনোযোগ দিয়ে পড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। একজন শিক্ষককে সাতটি পর্যন্ত কোর্স পড়ানোর পাশাপাশি থিসিস ও মনোগ্রাফের কাজও তত্ত্বাবধান করতে হচ্ছে। এতে অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে কোর্স শেষ করতে হয়। সব ক্লাস নেওয়া কিংবা প্রতিটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত কাজের চাপে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত গবেষণা ও লেখালেখির সুযোগ কমে যাচ্ছে। পরিবারকে সময় দেওয়াসহ কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে ভারসাম্য রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক—উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানও ব্যাহত হচ্ছে। প্রত্যাশিত মানের দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষার্থী তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকস্বল্পতা অত্যন্ত প্রকট। কোনো কোনো বিভাগে মাত্র দুজন শিক্ষক রয়েছেন। অথচ একটি পরীক্ষা কমিটি গঠন করতেও ন্যূনতম তিনজন শিক্ষক প্রয়োজন। ফলে এসব বিভাগের পরীক্ষা কমিটি গঠনের জন্য অন্য বিভাগ থেকে শিক্ষক যুক্ত করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, শিক্ষকসংকটের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবহিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ১১টি নতুন শিক্ষক পদ অনুমোদন করেছে। দ্রুত এসব পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। এতে শিক্ষকস্বল্পতা কিছুটা হলেও কমবে। পাশাপাশি নতুন করে আরও শিক্ষক পদের চাহিদাও দেয়া হয়েছে।