
এইচএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন শুরু রোববার, মানতে হবে যেসব নিয়ম
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:২৩

বিগত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন ফলাফল হয়েছে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায়। ছবি: এআই/জিমিনি
চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ; যা বিগত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল ৪৭.৭৪ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ৬.৭১ শতাংশ (গত বছর পাসের হার ছিল ৫৮.৮৩ শতাংশ)। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও কমে এসেছে ৪০ হাজার ৮৪টিতে, যা গত বছরের তুলনায় ২৯ হাজার ১৩টি কম।
শিক্ষা বোর্ডের তথ্য ও শিক্ষাবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা স্কুলে থাকাকালীন কোভিড মহামারি, কলেজে জুলাই আন্দোলন, পড়াশোনায় অমনোযোগী এবং মূল্যায়নগত পরিবর্তনের কারণে এবারের ফলাফলে এ নিম্নমুখী প্রভাব দেখা গেছে।
রাজধানীর একটি কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয়া আব্দুস সাত্তার বলেন, আমার টার্গেট ছিলো এ প্লাস। কিন্তু পেয়েছি ৪.৫০। গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানে আমার পয়েন্ট কম এসেছে। আমাদের কলেজে পর্যাপ্ত গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক নেই। শিক্ষক না থাকায় ক্লাসে পড়াশুনা ভালো হয়নি। বাসায় এবং প্রাইভেটে যা পড়েছি, সেই প্রস্তুতি দিয়ে পরীক্ষা দিয়েছি। কলেজে ভালো পড়া হলে হয়তো রেজাল্ট ভালো হতো।
ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আরিফুর রহমান বলেন, এবার যারা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তাদের মধ্যে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিল। এতে তাদের পড়াশোনা কম হয়েছে। এছাড়া এবারের সিলেবাসও বড় ছিল। সরাসরি এই দুইটি কারণের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নির্বাচনে কিছু শিক্ষার্থীর পরোক্ষ অংশগ্রহণের কারণে ফলাফল এত খারাপ হয়েছে।
একই কলেজের পদার্থবিজ্ঞান (ফিজিক্স) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, এবারের ফিজিক্সের দুইটি প্রশ্নে সমস্যা হয়েছে। এ কারণে ফিজিক্সে অনেক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পায়নি। এছাড়া ভালো ফলাফলের জন্য তো পড়াশোনা করতে হয়। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা কম করেছে, তাই ফল বিপর্যয় হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবিব বলেন, এবার যারা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে সেই শিক্ষার্থীরা হাইস্কুলে থাকা অবস্থায় কোভিড পার করেছে। এরপর কলেজে উঠে তারা জুলাই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে গেছে। এছাড়া এইচএসসির যে সিলেবাস, তা দুই বছরের ভেতর শেষ করাও অনেক কঠিন। এসব কারণে ফলাফল খারাপ হয়েছে।
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার কমে যাওয়াকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
ফলাফল প্রকাশ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ফলাফলের এমন পতন বা বিপর্যয় কখনোই প্রশংসনীয় হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের শিখন-অর্জন, পাঠদান পদ্ধতি, অভিভাবকদের ভূমিকা ও শিক্ষার পরিবেশে নানা ঘাটতি রয়েছে।
ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর দায় চাপালে হবে না। শিক্ষক, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ও কার্যকর পাঠদানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিনের শিক্ষকসংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিগত দিনের শিক্ষকসংকটও রয়েছে, আমাদের নিয়োগ দেওয়ার বাধা রয়েছে। অর্থাৎ এত শিক্ষক একসঙ্গে নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না, পিএসসি দিতে পারছে না। গত ১৭ বছরের ব্যাকলগ রয়েছে।’
উত্তরণের পথ ও করণীয়
ভবিষ্যতে এমন ফলাফল বিপর্যয় এড়াতে করণীয় সম্পর্কে অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবিব বলেন, পরীক্ষার খাতার চাইতে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানকে বেশি মূল্যায়ন করতে হবে। ক্লাসরুমের মান ধরে রাখতে না পারলে ভালো ফলাফল আসবে না। ক্লাসরুমের মান ঠিক না করে মূল্যায়ন পদ্ধতি কঠিন করলে ফলাফল খারাপ হবেই। আগে ক্লাসরুমের মান ঠিক করে পরবর্তীতে অ্যাসেসমেন্ট (মূল্যায়ন) প্রক্রিয়াকে কঠিন করতে হবে। তাইলেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসবে।
এসএসসি পরীক্ষার পুনর্নিরীক্ষায় ফলাফলে অনেক পরিবর্তন আসার কথা তুলে ধরেছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ১৩ লাখ খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য এসেছিল। এর মধ্যে ৪৫ হাজারের গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে এবং ৫ হাজার জন ফেল থেকে পাস করেছে। আর ৩ হাজার ৭৯ জন বেশি জিপিএ-৫ পেয়েছিল।
এই পরিবর্তনের কারণ খতিয়ে দেখার কথা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমাদের এক্সামিনের সিস্টেমকে আবার আমরা রি-এক্সামিন করব, এক্সামিনারদের ট্রেনিং প্রোগ্রাম এবং ভ্যারিয়েশন যারা বেশি দিয়েছে তাদের জন্য পানিশমেন্টের ব্যবস্থা—সেগুলোরও কাজ চলছে।