
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজে ন্যাশনাল সায়েন্স কার্নিভালের উদ্বোধন
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭:২০

ঢামেকে স্থায়ী পার্কিংয়ের দাবিতে অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘট চলছে। ছবি: ভিডিও থেকে নেয়া
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বাইরে সাদা কাপড়ে ঢাকা মরদেহের সামনে নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছেন এক স্বজন। ভেতরের হিমঘর থেকে মরদেহ বের করা হলেও বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। স্বজন হারানোর তাজা শোকের মাঝে এখন যুক্ত হয়েছে এক অসহায় অপেক্ষা–একটি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য আক্ষরিক অর্থেই হাহাকার চলছে ঢামেক প্রাঙ্গণে।
স্থায়ী পার্কিংয়ের দাবিতে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির ধর্মঘটের কারণে চিকিৎসা ও লাশ পরিবহন সেবা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে মিলছে না কোনো গাড়ি, আবার স্বজনেরা নিজেদের উদ্যোগে বাইরে থেকে অ্যাম্বুলেন্স বা ফ্রিজিং গাড়ি ভাড়া করে আনলেও সেগুলোকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। শোকাহত পরিবারগুলোর আকুল কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে ঢাকা মেডিকেলের বাতাস।
এমনই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের মুখোমুখি হন আব্দুর রহমান। অন্তঃসত্ত্বা এক আত্মীয়কে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন তিনি। চিকিৎসক ওই রোগীকে মৃত ঘোষণা করার পরই বিপাকে পড়েন আব্দুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা। মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় তাদের।
আব্দুর রহমান বলেন, ওই অন্তঃসত্ত্বা নারীর বৃহস্পতিবার সন্তান জন্ম দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাত ১২টার দিকে তিনি মারা যান। পরে মরদেহ গোসল করানো হয়। মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে পারেননি তারা।
তিনি আরও বলেন, পরে হাসপাতালের বাইরে থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্স ও ফ্রিজিং গাড়ির ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু গাড়ি হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। এ অবস্থায় মরদেহ নিয়ে কীভাবে বাড়ি ফিরবেন, তা বুঝতে পারছেন না তিনি।
একই করুণ চিত্র ঢামেকের প্রায় প্রতিটি কোণে। রাত ১১টা ১৫ মিনিটে রোগী হারানো এক স্বজন জানান, “লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য রাত থেকেই একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স খুঁজছি। ভেতরে ড্রাইভার-হেলপার যাকে জিজ্ঞেস করি, সে-ই স্পষ্ট বলে দেয় ‘বাইরে গিয়ে খোঁজেন, আমরা যাব না’।” রাত ১০টার দিকে মারা যাওয়া আরেক রোগীর আরেক রোগীর স্বজন জানান, সারা রাত হন্যে হয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো গাড়ি পাননি তিনি। কেউ কেউ বহিরাগত গাড়ি জোগাড় করতে পারলেও হাসপাতালের চত্বরে ঢোকার অনুমতি না পেয়ে গেটের বাইরেই স্বজনের লাশ নিয়ে বসে আছেন।
এদিকে আন্দোলনরত বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতি বলছে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার কারণেই তারা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে নেমেছেন। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বাদল মাদবর জানান, স্থায়ী পার্কিংয়ের সুনির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দসহ পাঁচ দফা দাবিতে একাধিকবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক হলেও কোনো সুরাহা হয়নি।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগের নীতিমালায় পার্কিংয়ের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে কোনো হাসপাতালেই আমাদের জায়গা দেয়া হয় না। জরুরি রোগী নামাতে বা ওঠাতে গেলে ট্রাফিক সার্জেন্ট আমাদের ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মামলা ঝুলিয়ে দেয়। সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেই প্রতিদিন এই হয়রানির শিকার হতে হয়। আমরা তো অপরাধী নই, আমরা শুধু একটা সুশৃঙ্খল পার্কিংয়ের ব্যবস্থা চাই যেন স্বাধীনভাবে রোগীদের সেবা দিতে পারি।’
অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটের কারণে সৃষ্ট এই মানবেতর পরিস্থিতি ও স্বজনদের হাহাকারের বিষয়ে কথা বলতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সাধারণ রোগী ও চরম সংকটে পড়া স্বজনদের একটাই দাবি–মানবিক দিক বিবেচনা করে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে এই অচলাবস্থার অবসান ঘটানো হোক, যাতে লাশ নিয়ে কোনো পরিবারকে এভাবে ফুটপাতে আটকে থাকতে না হয়।