
উপাচার্য পুর্নবহালের দাবিতে বিএনপি মহাসচিবের কাছে চুয়েট শিক্ষার্থীদের স্মারকলিপি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০:৩১

নানা সংকটে জর্জরিত নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সময় সংবাদ
আবাসন, শিক্ষক ও পরিবহনসহ নানা সংকটে ধুঁকছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার দু‘দশক পেরিয়ে গেলেও এখনও আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী।
অন্যদিকে, শিক্ষকের অনুমোদিত পদের প্রায় ৫৪ শতাংশই খালি। কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না চিকিৎসাকেন্দ্রেও। তবে উপাচার্য বলছেন, সংকট কমাতে কাজ করছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সমস্যা-সংকট নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ শেষ পর্ব।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য রয়েছে দোতলা একটি মেডিকেল সেন্টার। যার নাম ‘ব্যথার দান‘। এখানে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কথা। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই চিকিৎসাকেন্দ্রটির কার্যক্রম সীমাবদ্ধ সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। এরপরই বন্ধ হয়ে যায় চিকিৎসাকেন্দ্রের দরজা। ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্যসেবা দিতে এই মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র চারজন। জনবলসংকটের কারণে ২৪ ঘণ্টা সরাসরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে সন্ধ্যার পর কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যও ছুটতে হয় ক্যাম্পাসের বাইরে। যেতে হয় ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘুরে ‘ব্যথার দান’ মেডিকেল সেন্টারের কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত এমন চিত্র দেখা গেছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয় সন্ধ্যার পর। রাতে অসুস্থ হলে মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসক না থাকায় তাদের ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে হয়। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী শাকিব ভূঁইয়া বলেন, সন্ধ্যার পর কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ক্যাম্পাসে তাৎক্ষণিক চিকিৎসার সুযোগ সীমিত। তখন বাধ্য হয়ে বাইরে যেতে হয়। ক্যাম্পাসেই অন্তত প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের দাবি, শুধু দিনের বেলা নয়, রাতেও চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় ওষুধসহ মেডিকেল সেন্টার চালু রাখতে হবে। বিশেষ করে আবাসিক হলগুলোতে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য রাতের জরুরি চিকিৎসাসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মেডিকেল সেন্টার থেকে ওষুধ নিতে আসার সময় কথা হয় পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (ইএসসি) বিভাগের ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রত্না আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, এখানে পর্যাপ্ত ওষুধ পাওয়া যায় না, কেবল গ্যাস্ট্রিক বা নাপার মতো কয়েকটি সাধারণ ওষুধ মেলে। সন্ধ্যার পর অসুস্থ হলে কোনো ডাক্তার থাকেন না, চিকিৎসা কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তখন সামান্য চিকিৎসার জন্যও আমাদের ময়মনসিংহে ছুটতে হয়। যাতায়াতের পথে রোগীর অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। আমরা চাই চিকিৎসা কেন্দ্রটি ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা হোক, রাতে ডাক্তারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হোক এবং সব ধরনের জরুরি ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ বাড়ানো হোক।
মেডিকেল সেন্টারের অতিরিক্ত চিফ মেডিকেল অফিসার আবুল খায়ের মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, জনবল কাঠামো অনুযায়ী ৩৪ জন থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীসহ আছেন মাত্র ১১ জন। ফলে ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের মুঠোফোন নম্বর দেওয়া আছে, সন্ধ্যার পর কেউ অসুস্থ বোধ করলে টেলিমেডিসিন সেবা দেওয়া হয়, প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা দিয়ে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
মেডিকেল সেন্টারের উপপ্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মোছাম্মৎ মমতাজ বেগম বলেন, বর্তমানে চারজন চিকিৎসক দিয়ে ২৪ ঘণ্টা সেবা চালু রাখা সম্ভব নয়। অন্তত ১০ জন চিকিৎসক প্রয়োজন। বিশেষ করে রাতে এক থেকে দুইজন চিকিৎসক থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি জানান, প্রতিদিন মেডিকেল সেন্টারে প্রায় ২০০ থেকে ৪০০ রোগী আসেন। জ্বর, সর্দি, কাশি ও বিভিন্ন সাধারণ অসুস্থতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি আসেন। তবে চিকিৎসকের পাশাপাশি কখনো কখনো ওষুধেরও সংকট তৈরি হয়। সরবরাহের কাগজপত্র বা ওষুধ আসতে দেরি হলে সাময়িকভাবে কিছু ওষুধের ঘাটতি দেখা দেয়।।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মেডিকেল সেন্টারে বর্তমানে যে চারজন চিকিৎসক রয়েছেন, তা পর্যাপ্ত নয়। চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি আমরা অবগত আছি। এ সংকট নিরসনে আরও চিকিৎসক নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া গেলে মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়ানো সম্ভব হবে। শিক্ষার্থীরা যেন ক্যাম্পাসেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পান, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কাজ করছে।
পরিবহনেও সংকট
শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব যানবাহন রয়েছে ২৪টি। তবে স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম চালাতে প্রায় ৩০টি গাড়ি প্রয়োজন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রায় ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনের বাইরে থাকায় তাদের ময়মনসিংহ শহর বা আশপাশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে হয়। পরিবহনসংকটের ফলে প্রতিদিন দুর্ভোগে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, নতুন গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় আপাতত ভাড়া করা গাড়ির মাধ্যমে প্রয়োজন মেটানো হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনের কাছ থেকেও পরিবহন উপহার চাওয়া হচ্ছে যেন সংকট কাটানো যায়।
তিনি আরও বলেন, আমাদের আবাসন, শিক্ষক, চিকিৎসা ও পরিবহন- সব ক্ষেত্রেই কিছু সমস্যা রয়েছে। এগুলো সমাধানে আমরা কাজ করছি।
আরও পড়ুন:
প্রথম পর্ব: ২০ বছর পরও আবাসন সুবিধার বাইরে ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী
দ্বিতীয় পর্ব: অনুমোদিত পদের ৫৪ শতাংশ শিক্ষক নেই, পাঠদান-গবেষণা ব্যাহত