
গুলুস্তান প্রাসাদের নৈশভোজে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
প্রতিবেদক, কক্সবাজার
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২১:৩১

বাঁ দিক থেকে- ডুবন্ত অবস্থায় পড়ে আছে কোটি টাকার উপরে খরচ করে বানানো ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নামের নৌযানটি। পরিবারের দুই সদস্যকে নিয়ে নিউজিল্যান্ড ফিরেছেন অ্যাডওয়ার্ড।
নিউজিল্যান্ডের সাবেক কোস্টগার্ড সদস্য অ্যাডওয়ার্ড পুডনির। ২০২৪ সালে আগে তিনি বাংলাদেশে আসেন। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী বেলা, ১৬ বছর বয়সী সন্তান আলবার্ট ও ছোট ছেলে রালফ। প্রায় দুই বছরের মতো বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থান করে পরিবারটি। স্বপ্ন ছিল এখানে বানানো নৌযান দিয়ে সাগরপথেই ফিরবেন নিজ দেশে।
স্বপ্ন বাস্তবায়নে কক্সবাজারের স্থানীয় কারিগরদের সহযোগিতায় প্রায় দুই বছর ধরে তৈরি হয়েছিল ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নামের নৌযান। এতে কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছিল।
কিন্তু গত ২৫ আগস্ট কক্সবাজারের সোনাদিয়া চ্যানেলে বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতে ডুবে যায় নৌযানটি। স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় প্রাণে বেঁচে যান অ্যাডওয়ার্ড, তার স্ত্রী বেলা ও ছোট ছেলে রালফ। তবে নিখোঁজ হয় তাদের ১৬ বছর বয়সী সন্তান আলবার্ট। ৩২ ঘণ্টা পর সমুদ্র উপকূলে ভেসে ওঠে তার মরদেহ।
আইনগত প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত শেষে গত ১৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে আলবার্টের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এরপর থেকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে হোটেল শৈবালে অবস্থান করছিলেন পরিবারের বেঁচে যাওয়া সদস্যরা।
প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে বাংলাদেশ ছাড়েন তারা। বাবা, মা ও ছোট ছেলে ফিরলেও আলবার্ট ফিরছে না। তাদের স্বপ্নের নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’ এখন ডুবন্ত অবস্থায় পড়ে আছে বাঁকখালী নদীতে।
‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে সাগরপথে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন
অ্যাডওয়ার্ড ও তার পরিবারের বিশ্বভ্রমণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তৈরি হয়েছিল ‘আইল্যান্ড গার্ল’। পরিবারের সদস্যদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কক্সবাজারের স্থানীয় কারিগরদের সহযোগিতায় নৌযানটি নির্মাণে প্রায় দুই বছর সময় লাগে।
স্থানীয় বিএনপি নেতা দিদারুল ইসলাম রুবেলের ভাষ্য অনুযায়ী, নৌযানটিতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ ও রান্নাঘরসহ বিভিন্ন সুবিধা ছিল। ব্যক্তিগত অ্যাডভেঞ্চার ও সমুদ্রভ্রমণের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল এটি। নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল এক কোটি টাকার বেশি বলে ধারণা করা হয়।
দুটি কাঠের নৌযান জোড়া দিয়ে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ তৈরি করা হয়েছিল বলে জানান স্থানীয় জেলে আবদুর রহমান। তার ভাষ্য, বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌযানটির সংযোগস্থল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রথমে একটি অংশ দ্রুত ডুবে যায়, এরপর কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য অংশটিও তলিয়ে যায়।
নৌযানটি দীর্ঘদিন ধরে বাঁকখালী নদীতে নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীত পাশে নোঙর করা ছিল। দুর্ঘটনার পর সেটি ডুবন্ত অবস্থায় সেখানেই পড়ে রয়েছে।
একই নৌযানে ঘুরতে গিয়ে ডাকাতের কবলে পড়েছিল পরিবারটি
নৌকাডুবির কয়েক মাস আগে ওই নৌযানে ঘুরতে গিয়ে বিপদের মুখে পড়েছিল নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল রাতে কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া চরে তাদের ওপর হামলা চালায় একদল দুষ্কৃতকারী। পরদিন ৯ এপ্রিল কোস্টগার্ডের গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনার কথা জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, অ্যাডওয়ার্ড পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালে পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাঠের নৌযানে সমুদ্রযাত্রার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তারা।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছিল, নিরাপত্তাঝুঁকি পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পরিবারটিকে এ ধরনের সমুদ্রযাত্রা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছিল। ১ মার্চ তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনাও দেয়া হয়। তবে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষা করে তারা সোনাদিয়া চরে নৌযানসহ অবস্থান করছিলেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
হামলার খবর পেয়ে কোস্টগার্ডের একাধিক দল ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযান চালায় এবং পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করে।
নদীতে পড়ে আছে ‘আইল্যান্ড গার্ল’
বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন নিয়ে তৈরি করা ‘আইল্যান্ড গার্ল’ এখন বাঁকখালী নদীতে ডুবন্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আর পরিবারের ১৬ বছর বয়সী আলবার্টের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে কক্সবাজারে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানিয়েছিলেন, আলবার্টের মরদেহ উদ্ধারের পর আইনগত প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। পরে নিউজিল্যান্ডের দূতাবাস ও পরিবারের সম্মতি নিয়ে পুলিশের উপস্থিতিতে কক্সবাজারে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
যে যাত্রা শুরু হয়েছিল চারজনকে নিয়ে, তার শেষ হলো তিনজনের দেশে ফেরা আর একজনের চিরবিদায়ে। হয়তো কোনো একদিন বাঁকখালী নদী থেকে উদ্ধার করা হবে ‘আইল্যান্ড গার্ল’। কিন্তু পরিবারের হারানো সন্তান আর ফিরবে না। একসঙ্গে বিশ্বভ্রমণ শেষে দেশে ফেরার স্বপ্নটিও আর পূরণ হবে না।
হোটেল শৈবালে শেষ ৫০ দিন
নৌকাডুবির পর থেকে কক্সবাজারের হোটেল শৈবালে ছিলেন অ্যাডওয়ার্ড ও তার পরিবারের অন্য দুই সদস্য। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে তাদের থাকা-খাওয়া ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়। নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে পুলিশ প্রশাসন।
বিদায়ের আগে হোটেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সময় কাটান পরিবারের সদস্যরা। একসঙ্গে ছবি তোলেন তারা। দীর্ঘদিনের আন্তরিক সম্পর্কের স্মারক হিসেবে তাদের হাতে দেশীয় পণ্য উপহার হিসেবে তুলে দেয় হোটেল কর্তৃপক্ষ।
পর্যটন করপোরেশনের হোটেল শৈবাল ও মোটেল লাবণীর ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন আহমেদ সময় সংবাদকে বলেন, ২৫ আগস্ট নৌকাডুবির পর উদ্ধার হওয়া নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদের জেলা প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় হোটেল শৈবালে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এ সময়ে তাদের খাবার, আবাসন ও লন্ড্রি সেবাসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।
রায়হান উদ্দিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন একসঙ্গে অবস্থানের কারণে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হোটেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। দুর্ঘটনার পরও বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা নিয়ে তারা দেশে ফিরছেন বলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন তিনি।
বিদায় উপলক্ষে বাংলাদেশি ঐতিহ্য ও দেশীয় পণ্য তুলে ধরতে হোটেলের পক্ষ থেকে তাদের স্মারক উপহার দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
যেভাবে হলো ফেরা
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, নৌকাডুবির পর থেকে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের থাকা-খাওয়াসহ সার্বিক বিষয়ে পর্যটন করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও সহযোগিতা করেছেন।
তিনি সময় সংবাদকে বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে দেশে ফেরানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। প্রথমে ৯ অক্টোবর তাদের ফেরার কথা থাকলেও পাসপোর্ট, ভিসা ও বিমান টিকিটসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগে। সব প্রক্রিয়া শেষে ১৪ অক্টোবর তাদের দেশে ফেরার দিন নির্ধারণ করা হয়।
তাসনীম জাহান আরও বলেন, দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা কাটিয়ে পরিবারের সদস্যরা যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সেটিই জেলা প্রশাসনের প্রত্যাশা।