
দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে পরিত্রাণের দোয়া

মৃত ব্যক্তির সম্মান রক্ষার বিষয়টি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দৃষ্টিশক্তি মহান আল্লাহ তায়ালার এক অমূল্য নিয়ামত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভাবনীয় উৎকর্ষের কারণে বর্তমানে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অনেক অন্ধ বা দৃষ্টিহীন মানুষকে পুনরায় পৃথিবীর আলো দেখানো সম্ভব হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে যে, আফগানিস্তানের তালেবান সরকার 'ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থি' আখ্যা দিয়ে দেশটিতে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন নিষিদ্ধ করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে অঙ্গ বা কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের প্রকৃত বিধান কী?
যারা অঙ্গ বা কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের বিরোধিতা করেন, তাদের মূল দলিল হলো ইসলামে মানবদেহের পবিত্রতা ও সম্মান। জীবিত হোক বা মৃত, মানুষের শরীর অত্যন্ত সম্মানিত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর নিশ্চয়ই আমি বনি আদমকে সম্মানিত করেছি। (সুরা বনী ইসরাঈল: ৭০)।
হাদিস শরিফে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙা জীবিত ব্যক্তির হাড় ভাঙারই সমতুল্য। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩২০৭)। এই হাদিসের আলোকে অনেক আলেম মনে করেন, মৃত ব্যক্তির শরীর কাটাছেঁড়া করা বা তার চোখ তুলে নেওয়া মৃতদেহের অসম্মান, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। তালেবান সরকারের নিষেধাজ্ঞার পেছনে ফিকহের এই দৃষ্টিভঙ্গিটিই কাজ করেছে।
আধুনিক ফিকহ ও সমকালীন আলেমদের মতামত
তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই যুগে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি ফিকহ একাডেমি এবং সমকালীন বড় বড় মুফতি ও আলেমগণ বিষয়টি নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। ওআইসি-এর ‘আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমি’, মক্কার ‘রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামি’-এর ফিকহ বোর্ড এবং মিসরের আল-আজহারসহ বিশ্বের অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য দারুল ইফতা নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনকে জায়েজ (বৈধ) বলে ফতোয়া দিয়েছেন। এর পেছনে কোরআন, সুন্নাহ ও ইসলামি ফিকহের বেশ কিছু শক্তিশালী দলিল রয়েছে।কোরআনের দলিল ও শরিয়তের মূলনীতি
১. জীবন ও অঙ্গ রক্ষার গুরুত্ব, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যে ব্যক্তি কারও জীবন রক্ষা করল, সে যেন দুনিয়ার সব মানুষের জীবন রক্ষা করল। (সুরা মায়েদা: ৩২)। একজন মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া তাকে একটি নতুন জীবন দেওয়ারই নামান্তর, যা ইসলামি শরিয়তের বৃহত্তর উদ্দেশ্যের (মাকাসিদুশ শরিয়াহ) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
২. প্রয়োজনীয়তা বা জরুরত, ইসলামি ফিকহের একটি সুপরিচিত মূলনীতি হলো, আদ-দারুরাতু তুবীহুল মাহযূরাত অর্থাৎ চূড়ান্ত বাধ্যবাধকতা বা চরম প্রয়োজনীয়তা নিষিদ্ধ বস্তুকেও সাময়িকভাবে বৈধ করে। দৃষ্টিহীনতার মতো চরম অসহায়ত্ব দূর করতে মৃত ব্যক্তির কর্নিয়া ব্যবহার করাকে ফকিহগণ এই নিয়মের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
৩. কষ্ট লাঘব করা, কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, তোমাদের জন্য কঠিন করতে চান না। (সুরা বাকারা: ১৮৫)।
চিকিৎসা গ্রহণের নির্দেশনা নবীজি থেকে পাওয়া যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) চিকিৎসা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা, মহান আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার নিরাময় তিনি দেননি। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২০৩৮)।
ইসলামি শরিয়তের আরেকটি মৌলিক কানুন হলো, লা দারারা ওয়ালা দিরার অর্থাৎ ইসলামে কারও ক্ষতি করা বা ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০)। অন্ধত্বের মতো একটি বিশাল ক্ষতি (ضرر) দূর করার জন্য মৃত ব্যক্তির কর্নিয়া ব্যবহার করাকে ইসলামি ফিকহবিদগণ বৃহত্তর জনকল্যাণ (মাসালেহ মুরসালা) হিসেবে গণ্য করেছেন।কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের শর্তাবলি
তবে কয়েকটি শর্ত মানা জরুরি
সমকালীন ফকিহগণ কর্নিয়া প্রতিস্থাপনকে ঢালাওভাবে বৈধ করেননি, বরং এর জন্য কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করেছেন,
১. পূর্বানুমতি, মৃত ব্যক্তির জীবিত থাকা অবস্থায় দেওয়া অসিয়ত (সম্মতি) অথবা তার মৃত্যুর পর তার বৈধ ওয়ারিশদের স্বতঃস্ফূর্ত অনুমতি থাকতে হবে।
২. বাণিজ্যিকীকরণ নিষিদ্ধ, কোনোভাবেই চোখ বা কর্নিয়া কেনাবেচা বা ব্যবসা করা যাবে না। এটি সম্পূর্ণ মানব সেবার উদ্দেশ্যে হতে হবে। মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কোনো পণ্য নয় যে এর মূল্য নির্ধারণ করা যাবে।
৩. বিকল্প না থাকা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, রোগীর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য কর্নিয়া প্রতিস্থাপন ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসা বা বিকল্প ব্যবস্থা না থাকতে হবে।সম্মান বজায় রাখা: মৃতদেহ থেকে কর্নিয়া সংগ্রহের সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও মৃতদেহের প্রতি পূর্ণ সম্মান বজায় রাখতে হবে, যেন অযথা কোনো বিকৃতি না ঘটে।
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, মৃত ব্যক্তির সম্মান রক্ষার বিষয়টি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, একজন জীবিত মানুষের কষ্ট দূর করা এবং দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেয়ার মতো বৃহত্তর মানবিক প্রয়োজনকে ইসলাম সমান গুরুত্ব দেয়। তাই শর্তসাপেক্ষে এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছাড়া কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা আধুনিক ইসলামি স্কলারদের মতে নাজায়েজ নয়, বরং এটি মানবকল্যাণের একটি প্রশংসনীয় মাধ্যম হতে পারে।