
মার্কিন পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের গুঞ্জনে কী বলছে হোয়াইট হাউস?
ফয়সাল হাসান
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ১৩:৭

ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন সাম্রাজ্যের ‘অজেয় শক্তি’ প্রমাণ করতেই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন ডনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু আট মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ কৌশলগত পরাজয় ডেকে নিয়ে এলো সেই ইরান ইস্যুই। যুদ্ধক্ষেত্র ছিল ইরানে, কিন্তু এর ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্প’ আঘাত হেনেছে ওয়াশিংটনে।
তেহরানে সরকার পরিবর্তন চেয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু মার্কিন ভোটাররা কংগ্রেসেই সেই পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছেন।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেট, উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়েছে।
এর তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা মোকাবিলা করে টিকে গেছে ইরান। কিন্তু টিকতে পারেনি কংগ্রেসে ট্রাম্পের সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন ও ইসরাইল ইরানের ওপর সর্বাত্মক সামরিক শক্তি প্রয়োগ শুরু করে। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হয়, ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা হয় অবকাঠামো এবং সৃষ্টি হয় বিপুল মানবিক বিপর্যয়। তাদের হাতে ছিল যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, গোয়েন্দা ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব। তারা নেতাদের হত্যা করতে পেরেছে, স্থাপনা ধ্বংস করেছে এবং শহরগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কিন্তু ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি। এই ব্যর্থতাই তাদের কৌশলগত বিপর্যয়ের মূল কারণ।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের প্রতিরোধের এক শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয় হরমুজ প্রণালী। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতির চাপ, সামরিক ব্যয় এবং বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা– সব মিলিয়ে যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি পৌঁছে যায় মার্কিন পরিবারগুলোর জীবনে।
ওয়াশিংটন রফতানি করেছে বোমা। আর ইরান বাধ্য করেছে ওয়াশিংটনকে সেই যুদ্ধের পরিণতি আমদানি করতে।
পেন্টাগন তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের হিসাব রাখতে পেরেছে। কিন্তু সেই ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে ট্রাম্পকে কত ভোট হারাতে হবে, তার হিসাব রাখতে পারেনি।
এখানেই ইরানের অর্জনের গভীরতা। ভয়াবহ সামরিক হামলার শিকার একটি দেশ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ব্যবস্থার রাজনৈতিক দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ উপলব্ধি করেছে, ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সক্ষমতা আত্মসমর্পণে বাধ্য করার সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি।
অবশ্য রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুধু ট্রাম্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রে জায়নবাদী রাজনৈতিক শক্তির জন্যও সম্ভাব্য ঐতিহাসিক পরাজয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইসরাইপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলো ইসরাইলের সামরিক লক্ষ্যগুলোর প্রতি অবিচল সমর্থনকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রায় প্রশ্নাতীত নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। ওয়াশিংটনের কৌশলগত অগ্রাধিকার বারবার এমন একটি আঞ্চলিক জোটের স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে, যার ব্যয়ভার বহন করতে হয়েছে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সেই ব্যবস্থার বিপদকে নজিরবিহীনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ইসরাইলের সংঘাতকে সমর্থন করেছেন, তার যুদ্ধবিরোধী প্রতিশ্রুতি বিসর্জন দিয়েছেন এবং নিজের প্রেসিডেন্সিকে ঠেলে দিয়েছেন রাজনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে। নির্বাচনে এর প্রতিক্রিয়া এখন কেবল কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং ইসরাইলের সামরিক আগ্রাসনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একাত্মতার জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো বড় মূল্য দিতে হয় না— এমন ধারণাও এখন প্রশ্নের মুখে।
এখানে নির্মম এক পরিহাসও রয়েছে। অন্তহীন যুদ্ধ, ওয়াশিংটনের দুর্নীতি এবং পররাষ্ট্রনীতির প্রভাবশালী মহলের সমালোচনা করে নিজের রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন ট্রাম্প। অথচ শেষ পর্যন্ত তিনিই সেই হস্তক্ষেপবাদী প্রেসিডেন্টে পরিণত হয়েছেন, যাকে প্রত্যাখ্যান করতেই তার সমর্থকরা একসময় ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন।
তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। কিন্তু বাস্তবে দেশকে আরেকটি বিদেশি যুদ্ধে জড়িয়েছেন এবং ঘরোয়া রাজনীতিতে ডেকে এনেছেন বিপর্যয়।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্নীতি এবং ট্রাম্পের সামগ্রিক প্রেসিডেন্সি নিয়ে অসন্তোষও ডেমোক্র্যাটদের বড় নির্বাচনি জয়ে ভূমিকা রেখেছে। তবে ইরান যুদ্ধ এসব অসন্তোষকে আরও তীব্র করেছে এবং সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও রাজনৈতিক দায়মুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পররাষ্ট্রনীতির অন্তঃসারশূন্যতা প্রকাশ করেছে।
ইরানিদের দুর্ভোগ কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে কৌশলগত প্রতিরোধকে নিঃশর্ত সামরিক বিজয় হিসেবেও দেখা উচিত নয়। তবে ঐতিহাসিক তাৎপর্যটি স্পষ্ট: যে লক্ষ্য অর্জনের জন্য ওয়াশিংটন যুদ্ধে নেমেছিল, ইরান তা অর্জন করতে দেয়নি। অন্যদিকে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের অনুগত কংগ্রেস নিয়ে দেশ পরিচালনার সক্ষমতাও ধ্বংস করতে সহায়তা করেছে।
মার্কিন সাম্রাজ্য ইরানকে ধ্বংসযজ্ঞের মুখে ফেলতে পেরেছে। কিন্তু ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারেনি। এমনকি নিজেদের রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিদেরও এই যুদ্ধের পরিণতি থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
ট্রাম্প চেয়েছিলেন ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন। কিন্তু ইরান ঠিকই টিকে রইল। আর মার্কিন ভোটাররা বদলে দিলেন ট্রাম্পের শাসন।
লেখক: অধ্যাপক জুনায়েদ এস. আহমদ, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ইসলাম অ্যান্ড ডিকলোনাইজেশন’-এর পরিচালক।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর