
ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ইরান যুদ্ধকে ব্যবহার করতে পারেন নেতানিয়াহু: গোলান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৩৪

ইসরাইলে ইহুদি ও আরব দলগুলোর সমন্বয়ে নতুন সরকার গঠনের দাবিতে আজ শনিবার রাতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন দেশটির পরিবর্তনকামী জনতা। ছবি: সংগৃহীত
ইসরাইলে ইহুদি ও আরব দলগুলোর সমন্বয়ে নতুন সরকার গঠনের দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন দেশটির পরিবর্তনকামী জনতা। আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে ইসরাইলজুড়ে বেশ কয়েকটি বিক্ষোভ হওয়ার কথা রয়েছে।
দেশটির গত সপ্তাহের নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়ার পরও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় এই বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ‘স্ট্যান্ডিং টুগেদার’ নামের একটি সংগঠন।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, আজ শনিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায়) রাজধানী তেল আবিবের হাবিমা স্কয়ার, জেরুজালেমের প্যারিস স্কয়ার, বিয়ারশেবা, হাইফা ও তাইবেতে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হবে।
গত মঙ্গলবারের নির্বাচনে যুদ্ধবাজ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে বিরোধী জোট পেয়েছে ৬৭টি আসন। যার মধ্যে ৪৮টি ইহুদি জায়নবাদী দলগুলোর এবং ১৯টি আরব ফিলিস্তিনি আরব দলগুলোর দখলে। ফলে সরকার গঠনে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গড়া নিয়ে ইহুদি নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
ইহুদি জায়নবাদী চারটি দল হলো গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার, নাফতালি বেনেটের বি'ইয়াহাদ, ইয়ার গোলানের দ্য ডেমোক্র্যাটস এবং আভিগদর লিবারম্যানের ইসরাইল বেইতেনু। অন্যদিকে আরব নেতৃত্বাধীন দুটি দল হলো ইউসুফ জাবারিনের জয়েন্ট লিস্ট এবং মনসুর আব্বাসের রা'আম।
বিক্ষোভের আয়োজকরা বলেন, ‘পরিবর্তনের পক্ষে থাকা জোটের নেতারা নির্বাচনে নিজেদের বিজয় স্বীকার করে ইহুদি-আরব অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সরকার গঠন করবেন, এটাই বিক্ষোভকারীদের দাবি।’
তারা আরও বলেন, ‘পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দেওয়া ইহুদি-আরব সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিফলন পরবর্তী সরকারেও থাকতে হবে। এখন অংশীদারত্ব থেকে সরে আসার সময় নয়, বরং এটিকে এমন রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে, যা বাস্তবতা বদলে দিতে পারে। আরবদের ভোটের মূল্য ইহুদিদের ভোটের সমান। দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আরব নাগরিকদেরও পূর্ণ অংশীদার হতে হবে।’
শুক্রবার রাতে বিরোধী নেতা ইয়ার গোলান আশাবাদ প্রকাশ করেন, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন নিয়ে পরিবর্তনের জোট সরকার গঠন করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে নিয়ে কোনো জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা তিনি নাকচ করে দেন।
গোলানের ভাষায়, বিরোধী দলগুলো সরকার গঠন করতে পারে এবং তাদের অবশ্যই তা করতে হবে। যদিও ১২০ আসনের নেসেটে জায়নবাদী বিরোধী দলগুলোর আসন মাত্র ৪৮টি। রা'আমকে সঙ্গে নিলে তাদের আসন দাঁড়াবে ৫৬টিতে। আর জয়েন্ট লিস্টের রয়েছে আরও ১১টি আসন।
গোলান জানান, বৃহস্পতিবার তিনি ইয়াশার নেতা গাদি আইজেনকোট, বি'ইয়াহাদের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ইয়ার লাপিদ এবং রা'আমের প্রধান মনসুর আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তার ভাষায়, তিনজনকেই সরকার গঠনের বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনে হয়েছে।
তবে আভিগদর লিবারম্যান শুক্রবার আবারও স্পষ্ট করেন, পরবর্তী নেসেটে আরব নেতৃত্বাধীন দল দুটিকে নিয়ে কোনো জোট সরকারে অংশ নেবে না তার দল। ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘আমরা সন্ত্রাসবাদের সমর্থকদের সঙ্গে বসব না!’ এ সময় রা'আম ও জয়েন্ট লিস্টের কয়েকজন সংসদ সদস্যের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
লিবারম্যান এর আগে নেতানিয়াহুর সঙ্গেও কোনো সরকারে যোগ না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
এদিকে নির্বাচনে আরব ভোটারদের ঐতিহাসিকভাবে বেশি অংশগ্রহণ দেশটির আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। ফলে তাদের সমর্থন ছাড়া সরকার গঠন করতে না পারার বাস্তবতায় পড়েছে জায়নবাদী বিরোধী দলগুলো।
অন্যদিকে নির্বাচনে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে এলেও নেতানিয়াহুর সামনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের স্পষ্ট পথ নেই। তার বর্তমান কট্টর ডানপন্থি ও অতি-গোঁড়া ধর্মীয় মিত্রদের বাইরে নতুন সমর্থন না পেলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাওয়া কঠিন।
এমন পরিস্থিতিতে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান মোশে ইয়ালনও আরব দল রা'আমকে নিয়ে সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। শুক্রবার তিনি ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোকে মনসুর আব্বাসকে মন্ত্রিত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও দেন।
ইয়ালন উগ্র ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মনসুর আব্বাসের অবস্থানের তুলনা করেন।
বেন গভির সম্পর্কে তিনি বলেন, একসময় হেবরন এলাকায় ঘৃণা, উসকানি ও সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগে তিনি ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের নজরদারিতে ছিলেন। ইহুদি সন্ত্রাসী সংগঠনকে সমর্থনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে আটটি পৃথক অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।
অন্যদিকে স্মোত্রিচকে ২০০৫ সালে গাজা থেকে ইসরাইলের প্রত্যাহার পরিকল্পনার আগে আটক করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি একটি মহাসড়কে ৭০০ লিটার জ্বালানি বিস্ফোরণের পরিকল্পনা করেছিলেন।
ইয়ালন বলেন, ‘মনসুর আব্বাস ইহুদি নন। কিন্তু আমি আশা করি, অধিকাংশ ইসরাইলি নাগরিকের মূল্যবোধ উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী ও ফ্যাসিবাদী মনোভাবাপন্নদের চেয়ে তার মূল্যবোধের সঙ্গে বেশি মিলবে।’
নির্বাচনের পর ইসরাইলের রাজনীতিতে সরকার গঠন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতে আরব দলগুলোর সমর্থন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বিরোধী জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য কাটিয়ে ইহুদি-আরব অংশীদারত্বের সরকার গঠন সম্ভব হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তথ্যসূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরাইল