
তিস্তার কান্না থামবে কবে? মহাপরিকল্পনায় নতুন আশার আলো
প্রকাশ: শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:৬

প্রতিটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু দিন থাকে, যা শুধু একটি ঘটনার স্মারক নয়, বরং রাষ্ট্র নিজেকে কীভাবে চিনবে তার দিকনির্দেশক। বাংলাদেশের জন্য ৭ নভেম্বর তেমনই একটি দিন। একান্ন বছর পর আজ যখন দিনটি পালিত হচ্ছে, তখন প্রশ্নটি শুধু ইতিহাস স্মরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং সেই বিপ্লব ও সংহতির দর্শন আজকের রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতে কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিও আলোচনার বিষয়।
বিপ্লবের পটভূমি
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সপরিবারে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করা হয়। একই দিনে কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। পরের কয়েক দিন দেশে ক্ষমতা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা চলে, আর অনেকের মনে আশঙ্কা জন্মায় যে সদ্য স্বাধীন দেশের ভাগ্য হয়তো বাইরের শক্তির প্রভাবেই নির্ধারিত হবে। ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতে সিপাহিরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে আসেন, ভোর হতেই তাঁদের সঙ্গে রাস্তায় নামে সাধারণ মানুষ। জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। ঢাকার রাজপথে সৈনিক ও জনতার সেই মিলিত উচ্ছ্বাস বরণ করে নেয় জিয়াউর রহমানকে, যিনি পরবর্তীকালে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ দর্শনের প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে দিনটি “জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস” হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
সংহতির দর্শন
৭ নভেম্বরের মূল বার্তা তিনটি বলে আমি মনে করি। প্রথমত, সার্বভৌমত্বঃ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে ঢাকায়, বাংলাদেশের মানুষের হাতে। দ্বিতীয়ত, সংহতিঃ সৈনিক আর সাধারণ মানুষ আলাদা নয়, রাষ্ট্র রক্ষায় তারা একই কাতারে। তৃতীয়ত, ক্ষমতার উৎস জনগণঃ একটি সংকটের মুহূর্তে মানুষের সম্মিলিত ইচ্ছাই রাষ্ট্রের দিক বদলে দিতে পারে। এই তিনটি ধারণাই পরবর্তী বাংলাদেশ ও রাষ্ট্র সংস্কারের ভিত্তি তৈরি করে।
তৎকালীন রাষ্ট্র সংস্কার
৭ নভেম্বর-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় যে পরিবর্তনগুলো আসে, তার কেন্দ্রে ছিল একদলীয় কাঠামো থেকে বহুদলীয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন। সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়। ১৯৭৭ সালে ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষাকে শীর্ষে রেখে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, গ্রামীণ উন্নয়ন, খাল খনন, গণশিক্ষা ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে আনে। গ্রাম সরকারের মাধ্যমে ক্ষমতা তৃণমূলে নেওয়ার চেষ্টা হয়। রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প ও মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির যে ভিত তখন গড়ে ওঠে, আজকের অর্থনীতির দুই প্রধান স্তম্ভ সেখান থেকেই এসেছে। পররাষ্ট্রনীতিতে আসে বহুমুখীকরণঃ চীন, মুসলিম বিশ্ব ও পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তৃত হয়, আর দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার যে প্রস্তাব রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেন, তা পরে সার্ক হিসেবে রূপ নেয়।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
মুক্তিযুদ্ধ ও বিপ্লবের দার্শনিক ভিত্তি ছিল ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতির একটি জাতীয়তাবাদী কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। যে কাঠামো স্বাধীন-সার্বভৌম একটি ভূখণ্ড, মুক্তচিন্তা, ও উদার গণতন্ত্র চর্চা ও ধারণ করবে। পরবর্তীতে যার ওপর ভিত্তি করে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়। মূল কথা হলো, আমাদের পরিচয় গড়ে উঠেছে এই ভূখণ্ডের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক সীমানাকে কেন্দ্র করে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর থেকে স্বতন্ত্র। ভাষা দিয়ে একে সংজ্ঞায়িত করলে সীমান্তের ওপারের বাঙালিও এর অংশ। ধর্ম দিয়ে সংজ্ঞায়িত করলে পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার যুক্তি থাকে না। তাই ভিত্তি হলো ভূখণ্ড ও তার মানুষ। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বাঙালি ও পাহাড়ের জাতিসত্তা সবাই। সবাইকে নিয়ে একটি একক জাতিসত্তার স্বাধীন-সার্বভৌম উদার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।
সমালোচকেরা বলেন, এই ধারণা বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি থেকে সরে এসেছিল। কিন্তু এর সমর্থকদের যুক্তি হলো, মুক্তিযুদ্ধ নিজেই ছিল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের লড়াই। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা কোনো একক ভাষা বা ধর্মের মানুষের জন্য নয়, এই ভূখণ্ডের সকল মানুষের জন্য। অতএব, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকল্প নয়, বরং তার রাষ্ট্রীয় রূপ। ১৯৭১ যে ভূখণ্ডভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়, ৭ নভেম্বর সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব পুনর্ব্যক্ত করে, আর বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ তাকে একটি স্থায়ী পরিচয়ের কাঠামো দেয়।
সবার আগে বাংলাদেশ: ধারাবাহিকতা ও নতুন প্রেক্ষাপট
এই কাঠামোর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের “না দিল্লি, না পিন্ডি, সবার আগে বাংলাদেশ” নীতিকে বুঝতে হবে। দার্শনিকভাবে এটি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সরাসরি উত্তরাধিকার। বাংলাদেশ তার স্বার্থ নির্ধারণের দায়িত্ব কাউকে দিতে পারে না, কারণ বাংলাদেশ সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে একটি বিরাট সংখ্যক জনগণের ভূখণ্ড। পিন্ডি মনে করিয়ে দেয় ১৯৭১-এর অতীত, যা থেকে মুক্তির জন্য যুদ্ধ হয়েছিল; দিল্লি মনে করিয়ে দেয় গত দেড় দশকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও বিশেষ গোষ্ঠীর অনুভূত নির্ভরশীলতা। দুটিকে একসঙ্গে প্রত্যাখ্যানই এই স্লোগানের ভারসাম্য।
রাজনৈতিকভাবেও যোগসূত্র স্পষ্ট।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফার মতোই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র ছিল ‘বন্ধুত্ব হ্যাঁ, প্রভুত্ব নয়’, আর প্রতিশ্রুতি ছিল একটি অর্থনীতিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির। ৭০-এর দশকের বহুমুখী কূটনীতি আর আজকের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের চেষ্টা একই চিন্তার দুই সময়ের প্রকাশ। আর ১৯৭৫-এর সিপাহি-জনতার সংহতির সঙ্গে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মিলও বিএনপির রাজনৈতিক বয়ানে বারবার উঠে আসে: দুই ক্ষেত্রেই সংকটের মুহূর্তে মানুষ রাস্তায় নেমে রাষ্ট্রের দিক বদলে দিয়েছে। মৃতপ্রায় গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করেছে।
যে পরীক্ষা সামনে
সবার আগে বাংলাদেশ-এর প্রথম পরীক্ষা হলো, এটি যেন বিচ্ছিন্নতার নীতি না হয়ে দৃঢ় দর কষাকষির নীতি হয়। তিস্তার পানি, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সুনির্দিষ্ট অর্জনই এর প্রমাণ। দ্বিতীয় পরীক্ষা, দিল্লি-পিন্ডির বাইরে অন্য শক্তির সাথেও স্বার্থ ভিত্তিক সম্পর্ক তৈরি; বহুমুখীকরণ মানে সব দরজা খোলা রাখা, কোনো দরজা অতিরিক্ত খোলা নয়। তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ঘরের ভেতরে। সবার আগে বাংলাদেশ মানে সবার আগে বাংলাদেশের মানুষ, সব মানুষ। ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদের প্রতিশ্রুতি ছিল খুলনার হিন্দু জেলে আর রাঙামাটির চাকমা কৃষককে সমান মর্যাদা দেওয়া। একই প্রতিশ্রুতি প্রযোজ্য সমালোচকের ক্ষেত্রেও। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর গনঅভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় থাকা একটি সরকারের জন্য এই সতর্কতা আরও বেশি জরুরি।
৭ নভেম্বরের প্রকৃত শিক্ষা সংহতি। সংহতি মানে সবাইকে এক মতে আনা নয়, বরং ভিন্নমতের মানুষদেরও একটি অভিন্ন রাষ্ট্রের ছাতার নিচে রাখা। এবং এই সংহতির কথা বর্তমান বাংলাদেশের সরকার প্রধানের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে। এটি কত জোরে উচ্চারিত হলো তা নয়, কত যত্নে চর্চিত হলো, সেটিই ঠিক করবে ইতিহাসে এর অবদান।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, পাবলিক অ্যাফেয়ার্স, ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট ডালাস, যুক্তরাষ্ট্র।