
৭ নভেম্বর: সংহতির দর্শন থেকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’
নাজমুল ইসলাম নিশাত
প্রকাশ: শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬, ১৭:৭

লেখক: নাজমুল ইসলাম নিশাত
তিস্তার এই দুর্দশা কেবল একটি নদীর নাব্যতা হারানোর গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদী পাড়ের মানুষের জীবন জীবিকা এবং উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি। উজান থেকে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, নদীর তলদেশে পলি জমা, ভাঙন ও বন্যার মতো সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে প্রতি বছরই হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ছেন নদীপাড়ের মানুষ। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়, আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানির চাপে ভেসে যায় ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। এই বাস্তবতায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা আর কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; উত্তরের মানুষের জীবন ও অর্থনীতি বদলে দেয়ার সম্ভাবনাময় উদ্যোগ।
তিস্তা মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, ভাঙন নিয়ন্ত্রণ, বন্যার ঝুঁকি কমানো এবং নদীর পানি ও ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় রয়েছে নদীশাসন, ১১০ কিলোমিটার নদী খনন ও তীর সংরক্ষণ, ২২৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, ৬৭টি স্পার স্থাপন এবং প্রায় ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার। পাশাপাশি রয়েছে স্যাটেলাইট টাউন ও কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এর সুফল কেবল নদীভাঙন রোধেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নদীশাসন ও তীর সংরক্ষণের মাধ্যমে বসতভিটা ও কৃষিজমি রক্ষার সুযোগ তৈরি হবে। পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা কৃষি উৎপাদনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে পুনরুদ্ধার করা জমিতে কৃষিভিত্তিক শিল্প, নগর অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে কৃষিনির্ভর উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের অবকাঠামো গড়ে উঠলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে। এতে কৃষক যেমন ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন, তেমনি বাড়তে পারে স্থানীয় পর্যায়ে শিল্প ও কর্মসংস্থান। অর্থাৎ, তিস্তা মহাপরিকল্পনার গুরুত্ব শুধু নদীকে ঘিরে নয়; বরং নদীকে কেন্দ্র করে একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা ও প্রত্যাশা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই নদীপাড়ের মানুষ এ দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিস্তাকে ঘিরে নানা রাজনৈতিক আলোচনা ও প্রতিশ্রুতি থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর নতুন করে আশার সঞ্চার হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলো। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সেই ঘোষণা বাস্তবে রূপ নেয়নি। ফলে আবারও অনিশ্চয়তায় পড়ে নদীপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা।
তবে এবার নতুন করে আশার কথা শুনিয়েছে বিএনপি সরকার। ক্ষমতায় আসার পর তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ জানিয়েছেন, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই তৈরি করা হবে ডিপিপি।
এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন তিস্তা অববাহিকার মানুষ। দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নে সরকারের এমন অবস্থান নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। বিশেষ করে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ করে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হতে পারে।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের মনে প্রশ্নও রয়েছে এবার কি সত্যিই দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে?
তিস্তা একটি আন্তঃসীমান্তীয় নদী। উজানের পানিপ্রবাহ ও পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার বিষয়টি এর সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এ কারণে নদী ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক আলোচনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে। তবে শুধু উজানের পানির সমাধানের অপেক্ষায় বসে থাকলে অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনার সংকটও দীর্ঘায়িত হবে। নদীশাসন, খনন, তীর সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ ও পানি ব্যবস্থাপনার মতো অভ্যন্তরীণ কাজগুলো এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক সমীকরণের পাশাপাশি নিজস্ব সক্ষমতা ও অর্থায়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
উত্তরের দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আর বিলম্বের সুযোগ নেই। প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। তিস্তার সংকট কোনো নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়ছে পুরো উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ। তিস্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা, আন্দোলন ও প্রতিশ্রুতির পর এবার নতুন করে আশার জায়গা তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকারের ইতিবাচক অবস্থান সেই আশাকে আরও জোরালো করেছে। এখন প্রয়োজন ঘোষণাকে কার্যকর পরিকল্পনায় রূপ দেওয়া।
প্রকল্পের অনুমোদন, অর্থায়ন নিশ্চিত করা, বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ এবং পর্যায়ক্রমে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করা এই চারটি বিষয়ই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে।
তিস্তার নানামুখী সংকটে যুগের পর যুগ অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন নদী পাড়ের মানুষ। সেই অনিশ্চয়তা কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে নতুন সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগে। এ উদ্যোগ যেন আবারও কেবল প্রতিশ্রুতির পাতায় আটকে না থাকে। কেননা তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেবল একটি নদী রক্ষার প্রকল্প নয়; এটি রংপুর অঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্য কমিয়ে মানুষের জীবনমান বদলে দেওয়ার প্রকল্প।