
আইজেনকোটের সময় ২৮ দিন, কীভাবে মিলতে পারে আসন সমীকরণ?
আবদুল আজিজ জুয়েল
প্রকাশ: রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬, ২০:২

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বিজ্ঞানাগারে খাঁচার ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে একদল ইঁদুর। বাইরে থেকে দেখলে তাদের অন্য ইঁদুরের মতোই মনে হবে। তবে তাদের মস্তিষ্কে রয়েছে লাখ লাখ সক্রিয় মানব নিউরন বা স্নায়ুকোষ। মানুষের মস্তিষ্কের কোষ দিয়ে ইঁদুরের মস্তিষ্কের একটি বড় অংশ তৈরি করার এই গবেষণা বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু নৈতিক প্রশ্নও হাজির করেছে।
সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এই চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি করেছেন এই ইঁদুর, যাদের নাম দেয়া হয়েছে ‘এলিয়েন-কর্টিক্যাল’ ইঁদুর।
প্রাণীর দেহে মানব টিস্যু প্রতিস্থাপনের এই ঘটনা মেরি শেলির বিখ্যাত হরর উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’-এর কথা মনে করিয়ে দিলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, সিজোফ্রেনিয়া, সেরিব্রাল পলসি কিংবা ডিমেনশিয়ার মতো মানব মস্তিষ্কের জটিল রোগগুলো বোঝার ক্ষেত্রে এই গবেষণা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
বিজ্ঞানীদের এই অদ্ভুত পরীক্ষা কীভাবে কাজ করল? কতটুকুই-বা ‘মানুষ’ হয়ে উঠল এই ইঁদুরগুলো? আর এর পেছনে থাকা নৈতিক উদ্বেগগুলোই বা কী? চলুন জেনে নেয়া যাক।
প্রথমে গবেষকরা জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এমন কিছু ইঁদুর তৈরি করেন, যাদের মস্তিষ্কে সেরিব্রাল কর্টেক্সের বেশিরভাগ অংশ এবং এর পাশেই থাকা হিপ্পোক্যাম্পাস ছিল না। মস্তিষ্কের এই অংশ দুটি প্রাত্যহিক চলাফেরা, দেখা, চিন্তা করা, সিদ্ধান্ত নেয়া এবং স্মৃতির মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে।
ইঁদুরছানাগুলোর বয়স যখন মাত্র দুদিন, তখন বিজ্ঞানীরা তাদের মস্তিষ্কের ফাঁকা জায়গায় ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে তৈরি মানুষের ‘অর্গানয়েড’ ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করেন।
অর্গানয়েড কী?
গবেষণাগারে স্টেম সেল কিংবা টিউমার টিস্যু থেকে তৈরি ক্ষুদ্র কোষগুচ্ছ, যা মানুষের প্রকৃত অঙ্গের কিছু গঠন ও কার্যপ্রণালি অনুকরণ করতে পারে। এই গবেষণায় ব্যবহৃত প্রতিটি অর্গানয়েড তৈরি করা হয়েছিল সুস্থ মানবদাতার স্টেম সেল থেকে। একেকটি অর্গানয়েডে ছিল প্রায় এক লাখ মানবকোষ।
পরীক্ষায় গবেষকরা ইঁদুরের নিজস্ব প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ নিউরন সরিয়ে সেখানে প্রতিস্থাপন করেন প্রায় ৪০ লাখ মানব নিউরন। গবেষণায় মোট ২৯টি ইঁদুরের ওপর এই পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। এর মধ্যে ২৫টির ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপন সফল হয়।
তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন–এটি কিন্তু পুরো ‘মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন’ নয়। তাই এই ইঁদুরগুলোকে ‘মানুষের মতো চিন্তা করতে সক্ষম ইঁদুর’ ভাবার সুযোগ নেই।
মাত্র তিন মাসের মধ্যে ইঁদুরের মস্তিষ্কে বসানো মানব টিস্যুগুলো আকারে প্রায় পাঁচ গুণ বড় হয়ে ওঠে। বিস্ময়করভাবে, কোষগুলো ইঁদুরের নিজস্ব রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় এবং মস্তিষ্কের ফাঁকা জায়গার ৯০ শতাংশের বেশি পূরণ করে ফেলে।
পরীক্ষার পর গবেষকরা বেশ কিছু অকল্পনীয় বিষয় প্রত্যক্ষ করেন:
স্বাভাবিক আচরণ: মস্তিষ্কের বড় অংশজুড়ে মানুষের কোষ থাকা সত্ত্বেও ইঁদুরগুলো স্বাভাবিকভাবেই হাঁটাচলা ও শব্দ তৈরি করতে পারছিল।
বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধি: ইঁদুরগুলোর কার্যক্ষমতা যাচাই করতে গোলকধাঁধা মেজ টেস্ট করা হয়। দেখা যায়, মানব টিস্যু না থাকা স্বাভাবিক ইঁদুরগুলো গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে ফেলছিল। তবে মানবকোষযুক্ত ইঁদুরগুলো তুলনামূলক দ্রুত পথ খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়। এতে প্রমাণিত হয় যে, মানব টিস্যু ইঁদুরের বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাশক্তিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।
দুর্লভ ‘ভন ইকোনোমো’ নিউরনের জন্ম: সবাইকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্কে ‘ভন ইকোনোমো’ নামক বিশেষ ধরনের দীর্ঘ নিউরনের উপস্থিতি। সাধারণত ইঁদুরের মস্তিষ্কে এই নিউরন থাকে না এবং গবেষণাগারে এটি তৈরি করাও প্রায় অসম্ভব। এটি কেবল মানুষ, তিমি, হাতি বা অ্যাপসের (বানরজাতীয়) মতো প্রাণীর মস্তিষ্কে পাওয়া যায়।
সেরিব্রাল পলসির রহস্যভেদ: মানব শিশুরা দীর্ঘ ও জটিল প্রসবকালে অক্সিজেনের ঘাটতিতে পড়ে প্রায়ই ‘সেরিব্রাল পলসি’ রোগে আক্রান্ত হয়। কিন্তু ইঁদুরছানাদের ক্ষেত্রে এ ঘটনা বিরল বলে এতদিন এই রোগের ওষুধ আবিষ্কার কঠিন ছিল। কিন্তু মানব টিস্যুযুক্ত এই ইঁদুরগুলোকে কম অক্সিজেনে রাখার পর তাদের হাঁটাচলায় জটিলতা দেখা দেয়, যা এই রোগের নতুন গবেষণায় বড় ভূমিকা রাখবে।
মানুষের মস্তিষ্ক এক জটিল ব্যবস্থা। এতে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ কোটি স্নায়ুকোষ রয়েছে, যা ট্রিলিয়নসংখ্যক সংযোগের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। নৈতিকতা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বাধা এবং মস্তিষ্কের জটিলতার কারণে জীবিত মানুষের মস্তিষ্কের টিস্যু নিয়ে গবেষণার সুযোগ সীমিত।
বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে পেট্রি ডিশে অর্গানয়েড তৈরি করে গবেষণা চালানোর চেষ্টা করছেন। তবে এগুলো জীবন্ত মস্তিষ্কের মতো নয়। এসব কোষগুচ্ছে জীবন্ত মস্তিষ্কের মতো স্নায়বিক সংযোগ, বাইরের উদ্দীপনা ও পরিবেশ থাকে না।
এই গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা ও আচরণবিজ্ঞানের অধ্যাপক সার্জিউ প্যাসকা বলেন, ‘গত দুই দশক ধরে মানবদেহের বাইরে মানুষের মস্তিষ্কের মডেল তৈরির চেষ্টা চলছে। এই পদ্ধতি আগের সব মডেলের বিকল্প হয়ে উঠবে না। এই পদ্ধতি হয়তো আগের সব মডেলকে পুরোপুরি বদলে দেবে না, তবে মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে এমন সব তথ্য জানার সুযোগ করে দেবে, যা আগে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।’
গবেষণাগারে প্রাণীর দেহে মানব টিস্যু বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নৈতিক বিতর্কের পারদ। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো অন্য প্রাণীর দেহের ভেতর থাকা এই মানবকোষগুলোর কি নিজস্ব কোনো অনুভূতি বা ‘চেতনা’ তৈরি হতে পারে?
তবে গবেষকরা জানান, ইঁদুরের মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপন করা মানব স্নায়ুকোষগুলোর বয়স ছয় মাস হওয়ার আগেই পরীক্ষাটি থামিয়ে দেয়া হয়। যাতে সেগুলো ইঁদুরের মস্তিষ্কের সঙ্গে আরও বেশি স্নায়বিক সংযোগ তৈরি করতে না পারে। তখন পর্যন্ত চেতনার কোনো লক্ষণও দেখা যায়নি।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান দিয়েগো ক্যাম্পাসের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জন ইভান্স (যিনি এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না) জানান, ইঁদুরের ওপর চালানো এই নির্দিষ্ট পরীক্ষাটি হয়তো এখনই বড় কোনো নৈতিক সংকট তৈরি করছে না। তবে এটি প্রমাণ করে যে, ভবিষ্যতে অন্য কোনো প্রাণীর ওপর এমন পরীক্ষা চালানো হলে তা গুরুতর নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।
ইভান্সের মতে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই গবেষণার সুনির্দিষ্ট সীমারেখা বা ‘রেড লাইন’ টানা। ইঁদুর থেকে ধাপে ধাপে বানরজাতীয় প্রাণীর দিকে গবেষণাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কোথায় থামা উচিত, তার স্পষ্ট কোনো নিয়ম এখনো নেই। তাই নৈতিক বিতর্ক ও মানব-প্রাণীর মিশ্রণে কোনো ‘নিউরো-হাইব্রিড’ প্রজাতি সৃষ্টি এড়াতে আপাতত গবেষকদের কেবল ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।
সূত্র: আল জাজিরা