
স্টিকার লাগানো মাইক্রোবাসটি সময় টিভির নয়
নাঈম হাসান
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৩৮

মধ্যরাতে অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় পুলিশের অভিযান। ছবি: সংগৃহীত
মধ্যরাতে অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় পুলিশের অভিযান। একসঙ্গে ৮৫ তরুণ-তরুণীকে আটক করে কারও ১৫ দিন, কারও ৩০ দিনের কারাদণ্ড। সামান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধার হলেও উচ্চ স্বরে গান বাজিয়ে জনসাধারণের অসুবিধা করার দায়ে এ সাজা দেয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বিশেষ আদালত। আইনজীবী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযানের স্বচ্ছতা, মামলা না হওয়া এবং সাজা দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ। অপরাধী প্রমাণ হওয়ার আগেই ভিডিও ধারণ ও প্রচার করায় আইনি ব্যবস্থার পরামর্শ তাদের।
গত সোমবার (২০ অক্টোবর) মধ্যরাতে রাজধানীর ভাটারায় পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের বাসায় অভিযান চালায় ডিবি উত্তরা বিভাগের একটি দল। প্রায় ৩ ঘণ্টার অভিযান শেষে ভাড়া দেওয়া বাসাটি থেকে দুই বোতল মদ, এক পিস ইয়াবা ও এক চিলতে কুশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ও সদ্য পাস করা ৮৫ তরুণ-তরুণীকে আটক করে তরুণীদের ১৫ দিন এবং তরুণদের ৩০ দিন করে সাজা ও আর্থিক জরিমানা করে ডিএমপির বিশেষ আদালত। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, উচ্চ স্বরে গান বাজানো, জনসাধারণের অসুবিধা করার দায়ে দেওয়া হয়েছে এ শাস্তি।
ডিবির উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার ইলিয়াস কবীর বলেন, ‘ডিএমপি কোর্ট বা সামারি ট্রায়াল অনুযায়ী ছেলেদের এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও ১৫ দিনের কারাদণ্ড। এ ছাড়া মেয়েদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ৩ দিনের সাজা দেওয়া হয়েছে।’
অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরের বাড়ির ১০০ মিটারের মধ্যে কোনো আবাসিক ভবন নেই। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিবেশীদের অতিষ্ঠ হওয়ার অভিযোগ কীভাবে পেল পুলিশ? এ বিষয়ে জানতে চাইলে কথা বলতে নারাজ অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিবির উত্তরা বিভাগের ডিসি। মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আপনাদের সঙ্গে যত বেশি কথা বলব, তত বেশি ভুল হবে। প্লিজ ভাই, আমাকে মাফ করেন।’
যদিও এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশে চালানো হয়েছিল এ অভিযান। সেসময় ইলিয়াস কবীর বলেন, ‘আমার কাছে কোনো তথ্য ছিল না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য ছিল। তারাই আমাকে সেখানে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তাও আমাকে বলেননি যে অভিযান চালাতে হবে। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর তারা আমাকে অভিযানের নির্দেশ দেন।’
এদিকে আইনজীবীরা বলছেন, পুরো অভিযান ও শাস্তির প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ, অস্বচ্ছ। অপরাধী প্রমাণ হওয়ার আগেই ভিডিও ধারণ ও প্রচার করায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ তাদের।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত জাহান বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত চাইলেই কাউকে সাজা দিতে পারেন না। ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ঘটনা ঘটতে হবে। কিন্তু তারপরও তিনি সাজা দিতে পারবেন না, যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বীকারোক্তি না দেন। ফলে ৮৫ জনই যে স্বীকার করবেন তারা অপরাধ করেছেন, এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য।’
সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, ‘হাইকোর্টের রায় আছে, গুরুতর (সিভিয়ার) অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ছবি প্রকাশ করা যাবে না। গোটা বিষয়টিতেই আমি মনে করি, পুলিশ সাংঘাতিকভাবে অস্বচ্ছতার পরিচয় দিয়েছে।’
একসঙ্গে ৮৫ জনকে সাজা দেওয়ার ঘটনায় বিস্মিত অপরাধ বিশেষজ্ঞও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তাদের পেয়েছে এক অবস্থায়। কিন্তু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আরেক ধরনের অভিযোগে। এই অভিযোগের তো নৈতিক কোনো ভিত্তি নেই। মনে হচ্ছে, এখানে অপরাধমূলক কোনো কর্মকাণ্ড ম্যানেজের প্রসঙ্গ ধরে দূরত্ব তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে অভিযান চালানো হলো কি না, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।’
এ ঘটনায় কোনো মামলা না হওয়ারও সমালোচনা করেন আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞরা।