
দুই বছরেও উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া ২১ আগ্নেয়াস্ত্র, ঝুঁকিতে জননিরাপত্তা
আব্দুল্লাহ আল মামুন রুবেল, খুলনা
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৪

পণ্য খালাসের অপেক্ষায় মোংলা বন্দরের জেটিতে নোঙর করা একটি বাণিজ্যিক জাহাজ। ছবি: সময় সংবাদ
পদ্মা সেতু ও রেল যোগাযোগের কারণে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলার সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। নাব্য সংকট, জেটি স্বল্পতা ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে বছরের বড় একটি সময় বন্দরটির জেটি ফাঁকা পড়ে থাকে। তবে এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিকায়নসহ নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবশেষ অর্থবছরে মোংলায় জাহাজ এসেছে ৯৮৭টি। আগের অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল এক হাজার ৫২টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জাহাজের আগমন কমেছে ৬৫টি। গত কয়েক বছরে কার্গো হ্যান্ডলিং বাড়লেও জাহাজের সংখ্যা কমায় বন্দরের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দেশের পাঁচ অঞ্চলের মধ্যে তিনটির সঙ্গেই চট্টগ্রামের তুলনায় মোংলার দূরত্ব কমেছে। অথচ রেল যোগাযোগ চালুর দেড় বছরেও উল্লেখযোগ্য পণ্য পরিবহন হয়নি। ফলে সড়ক ও রেল যোগাযোগের সুবিধা বন্দরের ব্যবসা বৃদ্ধিতে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি।
মোংলা বন্দরের সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘পর্যাপ্ত পণ্য না থাকায় নিয়মিত জাহাজ পরিচালনায় আগ্রহী হচ্ছে না শিপিং লাইনগুলো। আবার নিয়মিত জাহাজ না থাকায় ব্যবসায়ীরাও মোংলা বন্দর ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতি কাটাতে ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়ানোর পাশাপাশি বন্দর ব্যবহারে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।’
বর্তমানে বন্দরের বড় চ্যালেঞ্জ নাব্য সংকট। চ্যানেলে পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়ায় বেশি ড্রাফটের (পানির নিচে বেশি গভীরতা প্রয়োজন হয় এমন) জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হচ্ছে। প্রতিবছর ড্রেজিং করে পলি সরানো হলেও নাব্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলছে না। আউটার বার ও ইনার বার ড্রেজিংয়ের পর এখন রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং চললেও বড় জাহাজ আনার সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বন্দর ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, বর্তমানে সর্বোচ্চ সাত মিটার ড্রাফটের জাহাজও আনা যাচ্ছে না। এতে সময় ও খরচ—দুটিই বাড়ছে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নাব্যতা নিশ্চিত করতে কার্যকর ড্রেজিং প্রয়োজন। ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনায় সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতও যথাযথভাবে নেয়া হয়নি।’ জাহাজ চলাচলের বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা ও কাজ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. নাসিফ আহসান বলেন, ‘মোংলা বন্দরের সুযোগ কাজে লাগাতে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পুরো পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার কার্যকর সমন্বয় জরুরি। বন্দর, সড়ক ও রেল যোগাযোগের সুবিধাগুলো সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।’
এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সক্ষমতা বাড়াতে চীনের ঋণ সহায়তায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদির সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্প’ হাতে নেয়া হয়েছে। এর আওতায় ৩৬৮ মিটার দীর্ঘ দুটি নতুন কনটেইনার জেটি, কনটেইনার ইয়ার্ড এবং আধুনিক ক্রেন ও স্বয়ংক্রিয় পণ্য ওঠানো-নামানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) শেখ শওকত আলী জানান, নতুন জেটি ও আধুনিক সরঞ্জাম যুক্ত হলে বন্দরের পণ্য হ্যান্ডলিং সক্ষমতা অনেক বাড়বে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, ‘বেশি ড্রাফটের জাহাজ আনার উপযোগী নাব্যতা নিশ্চিত করতে নতুন প্রকল্পে ড্রেজিংসহ একাধিক উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বন্দরের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সক্ষমতা বাড়াতে কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।’
শুধু বন্দর নয়, পুরো মোংলাকে ঘিরেই রয়েছে বড় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। ১১০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পাশাপাশি ইপিজেড সম্প্রসারণ, মোংলা নদীর ওপর ঝুলন্ত সেতু, বিমানবন্দর নির্মাণ এবং সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের পরিকল্পনাও নেয়া হচ্ছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মোংলাকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক হাব এবং দক্ষিণাঞ্চলকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে এসব উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে এসব পরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি নাব্যতার কার্যকর সমাধান এবং সাশ্রয়ী পণ্য পরিবহন নিশ্চিত করতে হবে। তবেই এই বন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।