
দুই বছরেও উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া ২১ আগ্নেয়াস্ত্র, ঝুঁকিতে জননিরাপত্তা
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৮

ডিপ সেচ পদ্ধতির প্রচলন প্রকল্প। ছবি: সময় সংবাদ
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কার্যক্রম নিরীক্ষা করে ৭৯টি আপত্তি তুলেছে কৃষি ও পরিবেশ অডিট অধিদফতর। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়, আটটি প্রকল্প ও ১১টি জোন অফিসসহ মোট ২০টি ব্যয় কেন্দ্র নিরীক্ষার আওতায় এসেছে। ৬৭২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ক্রয়, নির্মাণ, বিল পরিশোধ, ব্যাংক আমানত ও কর আদায়সহ নানা খাতে অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭৯টি আপত্তির মধ্যে ২৯টি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক অনিয়ম, যার পরিমাণ ৩৩৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। বাকি ৫০টি আপত্তিতে অনিয়মের পরিমাণ ১২০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ৪৬০ কোটি ৯৩ লাখ টাকার প্রকল্পে অনিয়ম ধরা পড়েছে।
নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, সেচনালা বর্ধিতকরণের মাধ্যমে সেচ এলাকা ও সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরীক্ষামূলকভাবে ডিপ সেচ পদ্ধতির প্রচলন প্রকল্পের জন্য ১২টি চেয়ার কুশন কেনা হয়েছে ৯০ হাজার ৫৪৫ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৫৪৫ টাকা। কেনা এসব কুশনের কোনো রেকর্ড বিএমডিএ অফিসে নেই। স্টক রেজিস্টার বা ইনভেন্টরিতেও এন্ট্রি করা হয়নি। একই প্রকল্পে আরও ২০ লাখ ২৫ হাজার টাকার এ ধরনের মালামাল কেনা হলেও তার হদিস মেলেনি।
রাজশাহীর একাধিক কুশন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, ভালো মানের চেয়ার কুশনের দাম ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকার মধ্যে।
প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা প্রশাসনিক কর্মকর্তা দিলরুবা পরভীন জানিয়েছেন, এসব মালামালের কথা তিনি জানেন না। কারণ সব মালামাল ক্রয় করতেন প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলী। এরমধ্যে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন।
একই প্রকল্পে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর তিনটি প্রদর্শনী বাগানে ১৫ হাজার গাছে ডিপ সেচ বসানোর কথা ছিল। বাস্তবে আছে মাত্র ৪ হাজারটি। ফলে ঠিকাদারকে ২১ লাখ টাকা অতিরিক্ত দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নিরীক্ষক দল।
নিয়ম অনুযায়ী, ২০ কোটি টাকার বেশি ক্রয়ে বোর্ড বা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগে। অডিট বলছে, পাইপ কেনা ও সেচনালা নির্মাণের ১০৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকার কাজ অনুমোদন দিয়েছেন নির্বাহী পরিচালক নিজেই। এই কাজের বিল থেকে ৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা ভ্যাট কাটা হলেও জমার যথাযথ প্রত্যয়ন ছাড়াই বিল পরিশোধ করা হয়েছে। বরাদ্দ ফেরত যাওয়া এড়াতে ২০২৫ সালের ৩০ জুন, অর্থাৎ অর্থবছরের শেষ দিনে একদিনেই ১৩৯টি বিলে ২৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে বিএমডিএ।
গোদাগাড়ীর ভুষনা থেকে পাকড়ী বাগধানী পর্যন্ত খাল খননে মাটি কম কাটা হলেও পুরো বিল দেয়ায় ক্ষতি ৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। পদ্মার পানি ডাবল লিফটিং প্রকল্পে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ১৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকার পাইপ সরবরাহের কাজ দেওয়া হয় একটি প্রতিষ্ঠানকে। এইচডিপিই পাইপে বরাদ্দের চেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ১৩ কোটি ৪ লাখ টাকা। সোলার প্যানেল গ্রিডে যুক্ত না হওয়ায় ক্ষতি ২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
প্রধান কার্যালয়ের ১০ তলা ভিত্তির ওপর ৬ তলা নতুন ভবন নির্মাণে ২২ কোটি ১১ লাখ টাকার চুক্তি হয় ২০২৫ সালের ১৫ জুন। ১৫ দিনে ১৫ শতাংশ অগ্রগতি দেখিয়ে ঠিকাদারকে ২ কোটি ৩৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু হোসেন এন্টারপ্রাইজের ঠিকাদার রওশন কামাল তারেক বলছেন, তাঁরা কাজ শুরু করেছেন চার মাস পর। এ ছাড়া অফিস নির্মাণের রডের ৩৯টি টেস্টের বিল দেওয়া হলেও পরীক্ষা হয়েছে মাত্র ৩টি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা না মেনে বিএমডিএ নিজস্ব আয়ের ৪০৬ কোটি টাকার আমানতের ২৯৮ কোটি টাকা রেখেছে ২২টি বেসরকারি ব্যাংকে। সীমার বাইরে রাখা ৮৫ কোটি ৮০ লাখ টাকায় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে অডিটের মত। এ ছাড়া ২৬৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকার অমূলধনী আয়ে ২৫ শতাংশ আয়কর না কাটায় ৬৫ কোটি ২৩ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
৭৯টি আপত্তির মধ্যে ৩টির জবাব দেয়নি বিএমডিএ। ১৩টিতে নথি যাচাই করে পরে জানানোর কথা বলেছে। বাকি ৬৩টিতে ব্যাখ্যা দিয়েছে, যার ১৭টিতে আপত্তি নিষ্পত্তির অনুরোধও করেছে। নিরীক্ষা দল দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান জানান, অডিট আপত্তি যাতে কমে সেলক্ষ্যে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। আগামী অর্থবছর থেকে কোটেশন পদ্ধতি বন্ধ করা হবে। প্রতিষ্ঠানের কেনা কাটায় স্বচ্ছতা আনা হবে।