
১১৭ বছর আগে জাপান থেকে প্রথম পবিত্র হজ পালন করেন যিনি
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৩১

শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন মহাঅষ্টমী। ছবি: সংগৃহীত
শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন মহাঅষ্টমী। শারদীয় দুর্গাপূজার অষ্টম তিথিতে পালিত এই দিনটি শক্তি, সাহস, ভক্তি ও অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক। মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর আরাধনা, অঞ্জলি, বিশেষ পূজার্চনা এবং নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনটি উদ্যাপন করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। তবে মহাঅষ্টমীর গুরুত্ব শুধু উৎসবের আনন্দে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেবী দুর্গার অসুরবধ, দেবী চামুণ্ডার আবির্ভাব এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক গভীর পৌরাণিক আখ্যান।
মহাঅষ্টমীর পৌরাণিক ইতিহাস
মহাঅষ্টমীর ইতিহাস বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় হিন্দুধর্মের প্রাচীন শাস্ত্র ও পুরাণের কাহিনিতে। দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য বর্ণনায় দেবীমাহাত্ম্য বা দুর্গাসপ্তশতী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্ভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে দেবীকে মহাশক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, মহিষাসুর নামে এক শক্তিশালী অসুর দেবতাদের পরাজিত করে স্বর্গলোক দখল করে নেয়। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেবতারা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শরণাপন্ন হন। তখন দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূত হন মহাশক্তিরূপী দেবী দুর্গা। বিভিন্ন দেবতা তাঁকে তাঁদের অস্ত্র প্রদান করেন। সিংহবাহিনী দেবী সেই অস্ত্র ধারণ করে মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন।
দেবী ও মহিষাসুরের মধ্যে দীর্ঘ ও ভয়াবহ যুদ্ধের পর দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেন। এই কাহিনি অশুভ শক্তির ওপর শুভ শক্তির বিজয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। তবে মহাঅষ্টমীর সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে দেবী চামুণ্ডার আবির্ভাব ও চণ্ড-মুণ্ড বধের কাহিনি।
দেবী চামুণ্ডার আবির্ভাব ও অসুরবধ
দেবী চামুণ্ডার পৌরাণিক কাহিনি মহাঅষ্টমী ও সন্ধিপূজার ধর্মীয় তাৎপর্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দেবীমাহাত্ম্য অনুসারে, চণ্ড ও মুণ্ড ছিল অসুররাজ শুম্ভ ও নিশুম্ভের সেনাপতি। দেবী কৌশিকী যখন অসুরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, তখন চণ্ড ও মুণ্ড তাকে আক্রমণ করে। সেই সময় দেবীর ভ্রূমধ্য থেকে এক ভয়ংকরী দেবীমূর্তির আবির্ভাব ঘটে। তিনি কালীরূপে অসুরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করেন। চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করার কারণে দেবী কালী ‘চামুণ্ডা’ নামে পরিচিত হন। এই কাহিনি দেবীমাহাত্ম্যের সপ্তম অধ্যায়ে বর্ণিত।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য পৌরাণিক আখ্যান হলো রক্তবীজের বধ। রক্তবীজের বিশেষ ক্ষমতা ছিল, তার রক্তের এক ফোঁটা মাটিতে পড়লেই সেখান থেকে তার মতো আরেক অসুরের জন্ম হতো। ফলে তাকে পরাজিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। দেবী কালী বা চামুণ্ডা তার রক্ত মাটিতে পড়তে না দিয়ে পান করেন এবং তার বংশবিস্তার রোধ করেন—এভাবেই রক্তবীজের বিনাশ ঘটে।
তবে শাস্ত্রীয় বর্ণনায় চণ্ড-মুণ্ডের বধ এবং রক্তবীজের বধ পৃথক যুদ্ধপর্বের ঘটনা। লোকাচার ও প্রচলিত কাহিনিতে এই ঘটনাগুলো মহাঅষ্টমীর মাহাত্ম্যের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত।
কেন মহাঅষ্টমীকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়?
আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মহাঅষ্টমী পালিত হয়। কালিকাপুরাণে এই তিথির বিশেষ মাহাত্ম্যের উল্লেখ রয়েছে। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায়, দেবীর আরাধনার মাধ্যমে বিপদ থেকে মুক্তি, শক্তি অর্জন এবং অশুভের বিনাশের কামনা করা হয়।
মহাঅষ্টমীর গুরুত্ব কয়েকটি দিক থেকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-
- শক্তির আরাধনা: দেবী দুর্গার শক্তি ও সাহসের প্রতীকী প্রকাশ ঘটে এই দিনের পূজায়।
- অশুভের বিনাশ: অসুরবধের পৌরাণিক কাহিনি অন্যায়, অহংকার ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বার্তা দেয়।
- ভক্তি ও আত্মশুদ্ধি: পূজা, প্রার্থনা ও অঞ্জলির মধ্য দিয়ে ভক্তরা মানসিক শান্তি ও কল্যাণ কামনা করেন।
- নারীশক্তির মর্যাদা: দেবীকে সর্বশক্তির আধার হিসেবে কল্পনা করা হয়, যা নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যায়।
অষ্টমীর অঞ্জলি: ভক্তি ও সমর্পণের অনন্য রীতি
মহাঅষ্টমী বলতেই বাঙালির মনে প্রথমে যে দৃশ্যটি ভেসে ওঠে, তা হলো দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি। সকালবেলা স্নান করে পরিষ্কার পোশাকে পূজামণ্ডপে সমবেত হন ভক্তরা। পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে ফুল ও বেলপাতা হাতে নিয়ে দেবীর উদ্দেশে অঞ্জলি নিবেদন করেন তারা। অনেকের কাছে অষ্টমীর অঞ্জলি কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং পরিবারের মঙ্গল, প্রিয়জনের সুস্থতা, জীবনের বাধা অতিক্রম এবং শান্তি কামনার এক আবেগময় মুহূর্ত। পূজামণ্ডপে ঢাকের শব্দ, শঙ্খধ্বনি ও ধূপের সুবাসে তৈরি হয় এক বিশেষ আবহ। বাংলার দুর্গোৎসবে অষ্টমীর অঞ্জলি ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি সামাজিক মিলন ও সামষ্টিক আনন্দেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সন্ধিপূজা: অষ্টমী ও নবমীর মিলনক্ষণ
মহাঅষ্টমীর অন্যতম আকর্ষণ সন্ধিপূজা। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট—এই মোট ৪৮ মিনিটের সন্ধিক্ষণে পূজাটি অনুষ্ঠিত হয়। তবে এই সময় নির্ধারিত হয় চন্দ্রতিথি অনুসারে; তাই প্রতিবছর ঘড়ির সময় এক থাকে না।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, এই সন্ধিক্ষণেই দেবী চামুণ্ডার ভয়ংকরী শক্তির প্রকাশ ঘটে এবং চণ্ড ও মুণ্ডের বিনাশের স্মৃতি স্মরণ করা হয়। সন্ধিপূজায় ১০৮টি প্রদীপ প্রজ্বালন ও ১০৮টি পদ্ম নিবেদনের প্রচলন রয়েছে। অঞ্চল ও পারিবারিক রীতিভেদে পূজার উপাচারে পার্থক্য দেখা যায়। অষ্টমী থেকে নবমীতে উত্তরণের এই মুহূর্তকে তাই অনেক ভক্ত বিশেষ পবিত্র বলে মনে করেন। সন্ধিপূজা মহাঅষ্টমীর ধর্মীয় আবহকে আরও গভীর করে তোলে।
কুমারীপূজা: নারীর মধ্যে দেবীশক্তির উপলব্ধি
মহাঅষ্টমীর সঙ্গে কুমারীপূজারও বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। এই রীতিতে একজন বালিকাকে দেবীশক্তির প্রতীক হিসেবে সম্মান ও পূজা করা হয়। বিশেষ করে বেলুড় মঠসহ বিভিন্ন স্থানে এই পূজা প্রচলিত। তবে সব অঞ্চলে বা সব মণ্ডপে একই দিনে কুমারীপূজা হয় না; কোথাও অষ্টমীতে, কোথাও নবমীতে এই আয়োজন করা হয়। এই আচারের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো—নারীর মধ্যে পবিত্রতা, শক্তি ও সৃষ্টিশীলতার প্রতীকী উপস্থিতিকে সম্মান জানানো। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এটি নারীকে শ্রদ্ধা করার একটি সাংস্কৃতিক বার্তাও বহন করে।
মহাঅষ্টমীর শিক্ষা: অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়
মহাঅষ্টমীর পৌরাণিক কাহিনিগুলোকে শুধু দেবতা ও অসুরের যুদ্ধ হিসেবে দেখলে এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য পুরোপুরি উপলব্ধি করা যায় না। এসব আখ্যান মানুষের জীবনের নানা সংকট, অন্যায়, অহংকার ও অশুভ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীকী ব্যাখ্যাও বহন করে। দেবী দুর্গার মহিষাসুরবধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার বার্তা দেয়।
দেবী চামুণ্ডার আবির্ভাব মনে করিয়ে দেয়, বিপদের মুখে প্রয়োজনীয় শক্তি ও সাহস জাগিয়ে তোলার গুরুত্ব। আর রক্তবীজের কাহিনি প্রতীকীভাবে বোঝায়, কোনো সমস্যার মূল কারণ দূর না করলে তার বিস্তার থামানো কঠিন। এই অর্থে মহাঅষ্টমী কেবল একটি পূজার দিন নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, সাহস, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং শুভ শক্তির জাগরণেরও প্রতীক।
শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাঅষ্টমী বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে গভীর ধর্মীয় আবেগ, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চেতনার দিন। দেবী দুর্গার আরাধনা, চামুণ্ডার পৌরাণিক আখ্যান, পুষ্পাঞ্জলি, সন্ধিপূজা ও কুমারীপূজা—সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মহাঅষ্টমীর মূল বার্তা হলো, শক্তি যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, সাহস যেন সংকট মোকাবিলায় পথ দেখায় এবং শুভবোধ যেন অশুভ প্রবৃত্তিকে পরাজিত করে। দেবী দুর্গার বন্দনার মধ্য দিয়ে ভক্তরা সেই শক্তি, শান্তি ও কল্যাণেরই প্রার্থনা করেন।