
দোহায় শুরু হচ্ছে বিশ্ব কুরআন সম্মেলন, থাকছেন বিশিষ্ট গবেষক ও কারিরা
মুফতি আবদুল্লাহ তামিম
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৫৮

১৯৪০ থেকে ১৯৮০-এর দশকে মিশরের কারিগণ।
১৯৪০ থেকে ১৯৮০-এর দশক। পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের জগতে তখন মিশরের ছিল একচ্ছত্র প্রভাব। মুহাম্মদ রিফাত, মোস্তফা ইসমাইল, মাহমুদ খলিল আল-হুসারি, মুহাম্মদ সিদ্দিক আল-মিনশাওয়ি ও আবদুল বাসিত আবদুস সামাদের মতো কিংবদন্তি ক্বারীদের কণ্ঠ মুগ্ধ করত বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে।
তাদের তিলাওয়াত ছিল শুধু সুমধুর কণ্ঠের প্রকাশ নয়, বরং কোরআনের অর্থ, তাজবিদ, স্বরের বৈচিত্র্য ও আধ্যাত্মিক আবেদনের এক অনন্য সমন্বয়। কিন্তু সেই স্বর্ণযুগের পুনরাবৃত্তি কেন আর হয়নি?
ইরানের কোরআনবিষয়ক সংবাদ সংস্থা ইকনার এক প্রতিবেদনে মিশরের কোরআন তিলাওয়াতের সেই গৌরবময় অধ্যায়, কিংবদন্তি ক্বারীদের উত্থান এবং তাদের উত্তরাধিকার থেকে বর্তমান প্রজন্মের বিচ্ছিন্নতার কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
মিশরের ক্বারীদের স্বর্ণযুগে প্রত্যেকের তিলাওয়াতের ধরন ছিল স্বতন্ত্র। মুহাম্মদ সিদ্দিক আল-মিনশাওয়ির কণ্ঠে ফুটে উঠত গভীর আবেগ ও বিষাদ, আবদুল বাসিত আবদুস সামাদের তিলাওয়াতে ছিল কণ্ঠের অসাধারণ ব্যাপ্তি ও অনুরণন, আর মাহমুদ খলিল আল-হুসারির তিলাওয়াতে প্রকাশ পেত গাম্ভীর্য, শুদ্ধতা ও অনন্য নিয়মানুবর্তিতা।
তাদের তিলাওয়াত শুধু মিশরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপ ও আমেরিকার মুসলিম সমাজেও ছড়িয়ে পড়ে তাদের খ্যাতি। কায়রোর কোরআন রেডিও হয়ে ওঠে এই মহান ক্বারীদের কণ্ঠ ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাদের অনেকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও রয়ে গেছে তাদের তিলাওয়াতের অমর রেকর্ডিং, যা আজও অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে আছে।
মিশরের কিংবদন্তি ক্বারীদের তিলাওয়াতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল আয়াতের অর্থ ও আবেগের সঙ্গে কণ্ঠের স্বাভাবিক সামঞ্জস্য। তাদের তিলাওয়াতে স্বরের ওঠানামা কেবল শ্রুতিমধুরতার জন্য ছিল না; বরং আয়াতের বক্তব্য, ভাব ও আবেগের সঙ্গে মিল রেখে তা প্রকাশ পেত।
একবার মুহাম্মদ সিদ্দিক আল-মিনশাওয়িকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি বিভিন্ন মাকামে এত দক্ষতা অর্জন করেছেন কীভাবে। জবাবে তিনি বলেছিলেন, তিনি মাকাম কী, তা জানেন না এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সেগুলো শেখেননি। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মিশরের সেই প্রজন্মের তিলাওয়াতের একটি বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। দীর্ঘদিনের অনুশীলন, কোরআনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং শ্রবণ ও চর্চার মধ্য দিয়ে তাঁরা স্বরের এক অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।
মিশরের তিলাওয়াতের স্বর্ণযুগের পেছনে শুধু প্রতিভাবান কণ্ঠ বা সাংস্কৃতিক জাগরণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ঐতিহ্যবাহী কোরআনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা মক্তবখানার। এসব প্রতিষ্ঠানে শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে কোরআন মুখস্থ করা, শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করা এবং উচ্চারণ ও পাঠের নিয়ম শেখার সুযোগ পেত।
এই ধারাবাহিক শিক্ষার পরিবেশ থেকেই গড়ে উঠেছিল এমন একটি প্রজন্ম, যাদের কাছে কোরআন তিলাওয়াত ছিল নিয়মিত সাধনা ও নিবিড় অনুশীলনের বিষয়। মক্তবখানার প্রভাব কেবল ক্বারী তৈরিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; মিশরের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পজগতের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিও এসব প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন।
প্রতিবেদনটিতে মিশরের উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সাংস্কৃতিক জাগরণকেও এই উত্থানের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার প্রসার, আরবি ভাষা ও ঐতিহ্যের প্রতি নতুন আগ্রহ এবং ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা কোরআন তিলাওয়াতের বিকাশে ভূমিকা রেখেছিল।
অন্যদিকে, বর্তমান সময়ে তিলাওয়াতের কিছু ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক প্রবণতা ও বাহ্যিক চাকচিক্য গুরুত্ব পাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে ওয়াকফ, ইবতিদা, তাজবিদ এবং আয়াতের অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিলাওয়াতের মতো সূক্ষ্ম বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন উঠছে।
প্রতিবেদনটির মূল বক্তব্য হলো, মিশরের কিংবদন্তি ক্বারীদের উত্তরাধিকার শুধু তাদের কণ্ঠ অনুকরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের তিলাওয়াতের পেছনে ছিল দীর্ঘ সাধনা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং কোরআনের অর্থ অনুধাবনের গভীরতা।
সেই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন পুরোনো ক্বারীদের তিলাওয়াত সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ, মৌলিক শিক্ষাপদ্ধতির পুনর্মূল্যায়ন এবং শুদ্ধতা ও অর্থবোধকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন ক্বারী গড়ে তোলা।
তাহলেই মিশরের সেই সোনালি উত্তরাধিকার নিছক অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকবে না; বরং কোরআন তিলাওয়াতের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হয়ে উঠতে পারে জীবন্ত অনুপ্রেরণা।