
গুলশান ক্লাবে ‘বনানী উইমেন্স ক্লাব’র কাওয়ালি নাইট
অলিভার ফারশি
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪৫

সবার সময় ফুরিয়ে যায়। সবাই পৃথিবীকে বিদায় জানায়।
ছোটবেলায় আমার প্রপিতামহীকে অসুস্থ অবস্থায় দেখেছি। পরিবারে তার ছিলো এক নীরব উপস্থিতি। তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে তার ফ্ল্যাটে।
সেই বাড়ির কথা এখনো মনে পড়ে। আলমারিগুলো ভর্তি ছিল পুরোনো পোশাকে। রান্নাঘরের মেঝেতে ছিল সময়ের ছাপ। একটি তাকের ওপর রাখা ছিল বার্লিন দেয়ালের একটি টুকরো।
কিন্তু সেদিন তিনি সেখানে ছিলেন না। তাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বয়স্কদের থাকার একটি পুরোনো বাড়িতে।
তার মৃত্যুর কথা আমার মনে নেই। একদিন যেন তিনি হঠাৎ করেই আমাদের পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেলেন!
আমাদের পরিবারে মৃত্যু আসত। আবার হঠাৎ করেই চলে যেত। কিন্তু এর পেছনে যে গভীর ক্ষত তৈরি হতো, তার কিছু চিহ্ন আমি দেখেছি।
একবার কারও মৃত্যুর পর আমি বাবাকে তার শোবার ঘরে অন্ধকারের মধ্যে কাঁদতে দেখেছিলাম। তার দাড়ি ছিল এলোমেলো। আরেকবার জানতে পারি, মনের ভেতর জমা হওয়া কষ্টের কথা বলতে মা একজন থেরাপিস্টের কাছে গিয়েছিলেন। সেটি ছিল মাত্র একবারের জন্য।
মা আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘এখন সব ঠিক হয়ে গেছে।’
মৃত্যু ছিল আকস্মিক। এ নিয়ে কথা বলাও ছিল অস্বস্তিকর। তাই পরিবারের মধ্যে একধরনের নীরব সমঝোতা তৈরি হয়েছিল। আমরা আর এসব নিয়ে কথা বলব না। সবকিছু ভুলে যাব।
এটি শোক কাটিয়ে ওঠা ছিল না। বরং ছিল ভুলে যাওয়ার চেষ্টা।
গত তিন বছরে আমি উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি। কথা বলেছি নার্স, মৃত্যুপথযাত্রীদের সহায়তাকারী ডুলা এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে।
এখানে অনেক সময় মৃত্যু ঘটে বন্ধ দরজার আড়ালে। হাসপাতালের চিকিৎসাকক্ষেও ঘটে অনেক মৃত্যু।
আমি কথা বলেছি মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সঙ্গে। সময় কাটিয়েছি তাদের পরিবারের সদস্য ও সেবাদানকারীদের সঙ্গে। নিজের চোখে দেখেছি মানুষের মৃত্যু।
দেখেছি, আমেরিকায় মানুষ কীভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়।
আমার অভিজ্ঞতা বলছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই প্রক্রিয়া ঠিকভাবে সম্পন্ন হয় না।
তবে এর ব্যতিক্রমও দেখেছি। দেখেছি, কীভাবে মৃত্যুর সময়টুকু আরও মানবিক, শান্তিপূর্ণ ও অর্থবহ করে তোলা যায়।
আমার এই ভ্রমণে আমি একটি ভালো মৃত্যুর তিনটি মৌলিক দিক খুঁজে পেয়েছি। সেগুলো হলো—আচার, সহায়তা এবং স্মরণ।
আচার মানেই বড় কোনো আয়োজন নয়। এর সহজ একটি উদাহরণ হতে পারে মৃতদেহ ধুয়ে দেওয়া। এটি কেবল শেষকৃত্যের একটি কাজ নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে মৃত ব্যক্তির প্রতি যত্ন ও সম্মান প্রকাশ করা হয়।
অনেক সংস্কৃতি ও ধর্মে এমন রীতি প্রচলিত আছে। ইহুদি ধর্মে রয়েছে ‘তাহারা’ নামের একটি প্রথা। এতে মৃতদেহকে নির্দিষ্ট নিয়মে পরিষ্কার করা হয়।
এই রীতির একটি বিশেষ ধরন আমার খুব পছন্দ।
এখানে প্রিয়জনের কেউ একজন মৃত ব্যক্তির হাত ধুয়ে দেন। আর বলতে থাকেন,
আমার মনে আছে, ছোটবেলায় এই হাত দুটি আমাকে কোলে তুলে নিয়েছিল।
কথাটি খুব সাধারণ। কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর মমতা।
এ ধরনের আচার মৃত্যুর বাস্তবতাকে স্বীকার করতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে মৃত ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসা, কোমলতা ও শ্রদ্ধা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জীবনের শেষ পর্যায়ে সহায়তা দেওয়ার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডুলাদের কাছে যাচ্ছেন অনেকে। তাদের বলা হয় ‘এন্ড-অব-লাইফ ডুলা’।
মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ ও তাদের পরিবারের পাশে থাকেন তারা। শোক, বিচ্ছেদ এবং মৃত্যুর আগের কঠিন সময়টি সামলাতে সহায়তা করেন।
পরিবারের কোনো সদস্য যখন মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে যান, তখন স্বজনেরা একধরনের মানসিক ধাক্কার মুখে পড়েন। পরিচিত পৃথিবীটিই যেন হঠাৎ বদলে যায়।
কীভাবে পরিস্থিতি সামলাবেন, কী বলবেন, কীভাবে প্রিয়জনের পাশে থাকবেন—এসব নিয়ে তৈরি হয় নানা দ্বিধা ও অস্বস্তি।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক পরিবারই কারও সহায়তা চান। ডুলারা সেই কঠিন সময়টুকু পার করতে তাদের পাশে থাকেন।
একটি ভালো মৃত্যুর তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মৃত্যুকে স্মরণ করা এবং এ বিষয়ে সচেতন থাকা।
ভুটানের সংস্কৃতিতে দিনে একাধিকবার মৃত্যুর কথা চিন্তা করতে উৎসাহিত করা হয়। অন্যদিকে, ভিক্টোরীয় যুগে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে ছবি তোলার রীতি ছিল। মানুষ মৃত্যুর স্মারক হিসেবেও বিভিন্ন জিনিস যত্ন করে রেখে দিত। এসব স্মারককে বলা হয় ‘মেমেনটো মরি’।
মৃত্যুকে স্মরণ করার অর্থ মৃত্যু নিয়ে অস্বাভাবিক কৌতূহল দেখানো নয়। বরং এটি মৃত্যু ও জীবনের শেষ সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হওয়ার একটি উপায়।
এভাবে মৃত্যুকে জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করা যায়। বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়। কমে আসে ভয় ও উদ্বেগ।
জেনি রাকো এন্ড-অব-লাইফ ডুলা। তিনি ইন্টারন্যাশনাল এন্ড-অব-লাইফ ডুলা অ্যাসোসিয়েশনের সহপ্রতিষ্ঠাতাও। এটি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। হাসপাতাল ও হসপিসের সঙ্গে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি জীবনের শেষ পর্যায়ে মানুষের যত্ন ও সহায়তা নিয়ে।
জেনি মনে করেন, মৃত্যুর জন্য কোনো একটিমাত্র সঠিক পদ্ধতি নেই।
তিনি আমাকে বলেন, ‘মৃত্যু একান্তই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। একজনের কাছে যা শান্তিপূর্ণ ও অর্থবহ মনে হয়, অন্য কেউ হয়তো তা চাইবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি পরিস্থিতি আলাদা। তাই প্রতিটি মৃত্যুকেও আলাদাভাবে বিবেচনা করা উচিত।’
একটি ভালো মৃত্যু সংশ্লিষ্ট সবার জীবনে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে। এটি মানুষকে শক্তি ও নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি দিতে পারে।
কিন্তু এমন মৃত্যু যেন কেবল কিছু মানুষের ভাগ্যে জোটে, তা হওয়া উচিত নয়।
মৃত্যুর শেষ সময়টুকুতে যত্ন, সম্মান ও মানবিক আচরণ পাওয়ার অধিকার আমাদের সবার আছে।
লেখক: অলিভার ফারশি নিউইয়র্কে বসবাসকারী একজন ব্রিটিশ আলোকচিত্রী।
ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে অনুদিত।