
ইসরাইলের ক্ষমতায় কে এলো গেল তাতে কিছু যায় আসে না: ইরান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:২৪

দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে জীবনের সূচনা, শ্রমিক আন্দোলন থেকে দেশ পরিচালনা, দুর্নীতির দায়ে কারাবরণ এবং শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন। সবকিছু মিলিয়ে ব্রাজিলের রাজনীতিতে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার জীবন যেন কোনো নাটকীয় রূপকথা। নানা চড়াই-উতরাই ও বিতর্ক পেরিয়ে আবারও ল্যাটিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলের মসনদে বসেছেন এই প্রবীণ বামপন্থি নেতা।
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থি সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন প্রবীণ এই নেতা। অক্টোবরের শুরুর দিকে হওয়া প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে পড়ার পরও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে এ জয় পেয়েছেন লুলা।
রোববার (২৫ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ৯টার কিছু পর ব্রাজিলের সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কোর্ট লুলাকে বিজয়ী ঘোষণা করে। তিনি ৫১ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলার পক্ষে ভোট দিয়েছেন ৬ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি ভোটার। অন্যদিকে বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ শতাংশ ভোট। তাকে ভোট দিয়েছেন ৫ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি ভোটার। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ৪০ লাখেরও বেশি।
এই জয়ের মাধ্যমে ইতিহাস গড়লেন লুলা। আধুনিক ব্রাজিলের ইতিহাসে আর কোনো রাজনীতিবিদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম পর্বে হেরে যাওয়ার পর দ্বিতীয় দফার ভোটে জয়ী হতে পারেননি। যেটা করে দেখিয়েছেন এই বামপন্থি রাজনীতিবিদ।
৮১ বছর বয়সে এসেও লুলার রাজনৈতিক লড়াই সহজ ছিল না। বয়স নিয়ে বিরোধীদের নানা প্রশ্নের জবাবে নির্বাচনি প্রচারণায় নিজে দৌড়ে ও কসরত করে শারীরিক সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে পিছিয়ে পড়ার পর কৌশল পরিবর্তন করেন লুলা। জীবনের প্রথমবারের মতো স্মার্টফোন কিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হন এবং তরুণ ও অনলাইননির্ভর ভোটারদের মন জয় করেন।
লুলার উত্থানের গল্পটি অনুপ্রেরণাদায়ক। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পেরনামবুকো রাজ্যের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে আট সন্তানের মধ্যে সপ্তম হিসেবে লুলার জন্ম। শৈশবে বেঁচে থাকার তাগিদে রাস্তায় জুতা পালিশ ও চিনাবাদাম বিক্রি করেছেন। পরবর্তীতে ধাতুশ্রমিক হিসেবে কাজ করার সময় জড়িয়ে পড়েন শ্রমিক ইউনিয়ন আন্দোলনে। ষাটের দশকে কারখানায় দুর্ঘটনায় একটি আঙুল হারালেও শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লড়াই থামাননি তিনি।
রাজনীতিতে এসে প্রথম তিনটি নির্বাচনে পরাজিত হলেও ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন লুলা। ২০০৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হয়ে ২০১০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তার এই শাসনামলে ব্রাজিলের অর্থনীতিতে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি ঘটে। বিখ্যাত ‘বলসা ফ্যামিলিয়া’সহ নানা সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় তিন কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেন তিনি, যা তাকে দেশের শ্রমজীবী মানুষের কাছে এক অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে।
তবে সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও তার সঙ্গী হয়েছে। ক্ষমতার শেষদিকে লুলা ও তার দল ওয়ার্কার্স পার্টির বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। দুর্নীতির মামলায় তাকে জেলেও যেতে হয়। এই জনঅসন্তোষের সুযোগ নিয়ে ২০১৮ সালে ক্ষমতায় আসেন ডানপন্থি নেতা জইর বলসোনারো। পরবর্তীতে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ আদালত রায়ে জানান, লুলার বিচারক পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন এবং আইনি ত্রুটির কারণে তাঁর সাজা বাতিল করা হয়। সাজামুক্ত হয়ে ২০২২ সালের নির্বাচনে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর বলসোনারোকে হারিয়ে আবারও প্রেসিডেন্ট ভবনে ফেরেন লুলা।
তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে বলসোনারো সরকারের সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত সামাজিক কর্মসূচিগুলো পুনর্বহাল, আমাজন বন ধ্বংস রোধ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে জোর দিয়েছেন লুলা। তবে উচ্চ সরকারি ঋণ, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক নীতির কারণে তাঁকে কঠোর সমালোচনার মুখেও পড়তে হচ্ছে।
রাজনৈতিকভাবে প্রবল মেরুকরণের দেশ ব্রাজিলে লুলা দা সিলভা যেমন কোটি কোটি মানুষের কাছে আশা ও সামাজিক সুরক্ষার প্রতীক, তেমনি সমালোচকদের কাছে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। তবে সব বিতর্ক ছাপিয়ে দারিদ্র্য থেকে ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছানো এবং কারাবাস পেরিয়ে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার এই দীর্ঘ সংগ্রাম শুধু লুলার ব্যক্তিগত জয় নয়, এটি ব্রাজিলের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।