
ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে নতুন উদ্যোগ, আলোচনায় সম্মতি পুতিনের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৪:১৩

হুতিদের সঙ্গে চলমান সংঘাতে সৌদি আরবের পাশে সামরিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়াতে পারে মিশর।
ইয়েমেনের হুতিদের হামলা থেকে সৌদি আরবকে রক্ষায় রিয়াদের অনুরোধ পেলে দেশটির পাশে দাঁড়াতে মিশরের সশস্ত্র বাহিনীকে অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে চলতি সপ্তাহে পার্লামেন্টে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।
এই পদক্ষেপের ফলে আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ মিশর, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ফেব্রুয়ারিতে শুরু করা বিমান হামলার জেরে ছড়িয়ে পড়া বিস্তৃত সংঘাতে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়ার আরও কাছাকাছি পৌঁছাবে।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) এক ভাষণে মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি এ বিষয়ে পার্লামেন্টের অনুমোদন চেয়েছেন। তিনি বলেন,
উপসাগরীয় অঞ্চলে আমাদের ভাইদের আমরা কখনোই ভুলব না, কখনোই না।
সৌদি আরবের নেতাদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের সুরক্ষায় আমরা যেকোনো পদক্ষেপ নেব।’
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে তেহরানের হামলার শিকার উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো মিশরও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অংশীদার। চলমান সংঘাতের কারণে সেই নিরাপত্তাব্যবস্থা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সিসির এই বক্তব্য ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মিশরীয় কর্তৃপক্ষের নেওয়া তুলনামূলক সংযত অবস্থান থেকে স্পষ্টতই সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। উপসাগরীয় মিত্রদের প্রতি কায়রো বারবার জোরালো সমর্থন জানালেও সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো অঙ্গীকার করেনি।
গত মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মিশরের রাফায়েল যুদ্ধবিমানের উপস্থিতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। মিশরের প্রেসিডেন্ট সিসির একটি সরকারি সফর নিয়ে আমিরাতের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। তবে মিমরের গণমাধ্যমে ওই সফরের সংবাদে যুদ্ধবিমান মোতায়েনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।
গত আগস্টে সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। তবে মিশর তাতে যোগ দেয়নি। যদিও দেশটি জানিয়েছিল, চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি তারা বিবেচনা করছে।
সৌদি আরবের তেল স্থাপনাসহ অন্যান্য অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিদের হামলা জোরদার হওয়ার পর মিশরের অবস্থানে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। গত মাসে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মিশর সফর করেন। সেখানে তিনি বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন। উভয় দেশেরই এসব জলপথের বিস্তীর্ণ উপকূল রয়েছে।
মিশরের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘদিন ধরেই উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এসব দেশে কর্মরত মিশরীয় প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। একই সঙ্গে এই অর্থের ওপর নির্ভরশীল মিশরের বহু পরিবারের জীবিকাও।
বর্তমানে মিশরে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে রয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। এমন সময়ে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশটির অর্থনীতি ও পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০১৩ সালে সেনাবাহিনী মুসলিম ব্রাদারহুডের জ্যেষ্ঠ নেতা প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো সিসির অন্যতম প্রধান আর্থিক সহায়তাকারী হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। এ সময় তারা মিশরকে কয়েক হাজার কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আমানত এবং বিনিয়োগ দিয়েছে।
সিসি তার ভাষণে বলেন,
সেই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর আমাদের ভাইয়েরা যেভাবে মিশরের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তা আমরা কখনোই ভুলতে পারি না।
বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগও কায়রোকে আরও সক্রিয় অবস্থান নিতে উৎসাহিত করছে। গত জুলাইয়ে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের বন্দরনগরী দামিয়েত্তায় দুটি গ্যাসবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনা মিশরকে বুঝিয়ে দিয়েছে, এই সংঘাত থেকে দেশটি পুরোপুরি দূরে থাকতে পারবে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই।
লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার বিষয়েও সৌদি আরব ও মিশরের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল থেকে মিশর প্রতিবছর কয়েকশ' কোটি ডলার আয় করে।
এই অভিন্ন উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরে মিশরের রাজনৈতিক গবেষক ও সাংবাদিক শরিফ আরেফ বলেন, ‘সৌদি আরবের নিরাপত্তা মিশরের জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।’
তিনি বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ হলো সৌদি আরব ও মিশরের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক। মিশরের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি শুরু হয় যেখান থেকে হুমকির সূত্রপাত। যতক্ষণ হুমকি থাকবে, ততক্ষণ তা মিশরের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই প্রধান উদ্বেগের বিষয় হবে। সে ক্ষেত্রে সৌদি আরবের নিরাপত্তাও মিশরের জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
এ ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূল লোহিত সাগরের দিকে, আর মিশরের পূর্ব উপকূলও এই সাগরের তীরে অবস্থিত। বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে যাওয়া নৌপথগুলো নিয়ে দুই দেশেরই স্বার্থ রয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে মিশরের। দেশটির সক্রিয় সামরিক সদস্যের সংখ্যা কয়েক লাখ। এ ছাড়া তাদের হাতে রয়েছে বিপুলসংখ্যক বিমান, স্থলযান ও নৌযান।
মিশর বিভিন্ন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করে। দেশটির বিমানবাহিনীতে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬, ফ্রান্সের তৈরি রাফায়েল এবং রাশিয়ার তৈরি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে মিশর প্রতিবছর প্রায় ১৩০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা পায়। এই অর্থ দেশটির মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনার ব্যয় মেটাতে সহায়তা করে। চলতি বছর মানবাধিকারসংক্রান্ত শর্ত শিথিল করে যুক্তরাষ্ট্র এই সহায়তার একটি অংশ ছাড় করেছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মিশরের ‘সহায়ক ভূমিকার’ কথা উল্লেখ করে ওয়াশিংটন এ সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়েছে।
২০১১ সালের গণ-অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পতনের পরের বছরগুলোতে মিশরের সশস্ত্র বাহিনী সিনাই উপদ্বীপে ইসলামপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে।
এ ছাড়া ২০১৫ সালে ইয়েমেনে হস্তক্ষেপকারী সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে মিশর বিমান ও নৌবাহিনীর সদস্য পাঠিয়েছিল। লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ চলাকালে দেশটিতে ইসলামিক স্টেটের লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলাও চালিয়েছিল মিশর।
তবে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে মিশর বড় পরিসরে বিদেশে স্থলসেনা মোতায়েন করেনি। ওই যুদ্ধে ইরাকের বাহিনীকে কুয়েত থেকে বিতাড়িত করতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছিল মিশরের সেনারা।
এর প্রায় তিন দশক আগে, মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের ইয়েমেনে সেনা পাঠিয়েছিলেন। ব্যয়বহুল সেই সামরিক হস্তক্ষেপকে পরবর্তী সময়ে ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
সিসির ভাষণ এবং পরবর্তী বক্তব্যগুলোতে মিশর শেষ পর্যন্ত কী ধরনের সামরিক বাহিনী পাঠাতে পারে, কিংবা আদৌ কোনো বাহিনী পাঠাবে কি না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা হয়নি। সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ইয়েমেনের ভেতরে মিশরের স্থলসেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা কম।
অবসরপ্রাপ্ত মিশরীয় সামরিক কর্মকর্তা এবং আরব ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রধান সামির রাগেবের মতে, সম্ভাব্য সামরিক সহায়তার মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ও নৌবাহিনীর সহায়তা থাকতে পারে।
সৌদি আরবে মরুভূমির ভেতরেও তেলের কূপ ও জ্বালানি পরিবহনের পাইপলাইন রয়েছে। এসব স্থাপনা সুরক্ষায় ব্যাপক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন। এ জন্য কৌশলগত, অপারেশনাল ও ট্যাকটিক্যাল—বিভিন্ন পর্যায়ের রাডার ব্যবহার করতে হয়। পাশাপাশি নির্দিষ্ট এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু সুরক্ষায়ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দরকার। এসব ক্ষেত্রে আকাশ প্রতিরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিশর ও সৌদি আরবের সামরিক ব্যবস্থার মধ্যে পারস্পরিক পরিচালন-সামঞ্জস্য (ইন্টারঅপারেবিলিটি) রয়েছে। দুই দেশের ব্যবহৃত কিছু অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম একই ধরনের। ফলে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই মিশরের সামরিক ক্রুরা সৌদি আরবের হাতে থাকা একই ধরনের ব্যবস্থা পরিচালনা করতে পারবেন। এটি একটি বাড়তি সুবিধা।
তিনি আরও বলেন, জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জলদস্যুতা দমনে নৌ অভিযান পরিচালনা এবং সৌদি উপকূল সুরক্ষিত রাখার কাজে মিশরের নৌবাহিনীকে ব্যবহার করা হতে পারে।