
মাদকবিরোধী অবস্থান নেয়ায় পুলিশ সদস্যের হাত-পা ভাঙল দুর্বৃত্তরা
প্রতিবেদক, কক্সবাজার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ২০:৫৮

কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় আন্তঃদেশীয় মানবপাচার চক্র এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েই চলছে। ছবি: সময় সংবাদ
শীত মৌসুম আসতেই কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মানবপাচারকারী চক্র। সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজন সংগ্রহ করছে তারা। এরপর দুর্গম পাহাড়ের আস্তানায় আটকে রেখে অস্ত্রের মুখে জিম্মি, শারীরিক নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ঘটছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, এসব আস্তানায় ভারী অস্ত্র নিয়ে সক্রিয় রয়েছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরাও।
গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় মানবপাচারকারীদের আস্তানায় যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় গোলাগুলিতে এক সেনাসদস্য নিহত হন। অভিযানে ৬ রোহিঙ্গাসহ ৫৬ জনকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, কীভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের অপহরণ করে পাহাড়ের বন্দিশালায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাদের ওপর চালানো হতো নির্যাতন, দাবি করা হতো লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের কয়েকজনের দাবি, এসব আস্তানায় ৪০টিরও বেশি ভারী অস্ত্র রয়েছে। চক্রের সদস্যদের বড় একটি অংশ মিয়ানমারের নাগরিক।
উদ্ধার হওয়া ফরিদপুরের শান্তা উপজেলার কলাগাছিয়া গ্রামের এসএম আসাদুজ্জামান জানান, কক্সবাজারে কাজ করার সুবাদে তিনজন রোহিঙ্গার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। পরে তারা তাকে টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে তাকে ১০ হাজার টাকায় অন্যদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। এরপর পরিবারের কাছে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
উদ্ধার হওয়া আরেক যুবক রিদুয়ান জানান, সন্ধ্যায় তারা একটি পাহাড়ি আস্তানায় পৌঁছান। সেখানে এক রাত থাকার পর সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, ঘরের দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। বের হওয়ার চেষ্টা করলে দুজন ব্যক্তি এসে তাদের জানান, এক লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের বিক্রি করে দেয়া হয়েছে।
কুড়িগ্রামের জেলার চিলমারী উপজলোর ফকিরারভিটা গ্রামের বাসিন্দা সোহেল আহমেদ বলেন, পাহাড়ের আস্তানায় দীর্ঘ সময় ধরে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। মারধরে তার হাত ফেটে যায়। নির্যাতনের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
উদ্ধার হওয়া কয়েকজনের অভিযোগ, অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নিয়মিত নির্যাতন করা হতো। এমনকি নামাজ আদায় করতে গেলেও নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যেত। তাদের দাবি, আস্তানায় প্রায় ৪০ জন সশস্ত্র সদস্য ছিল। কেফাইয়্যা নামের এক দালালসহ আরও পাঁচ-ছয়জন এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। অপরিচিত পাহাড়ি এলাকায় চোখ বেঁধে অস্ত্রের মুখে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও মানবপাচারের ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরেই অস্থির উখিয়া-টেকনাফ। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি রোহিঙ্গারাও এসব অপরাধী চক্রের ঝুঁকিতে রয়েছেন। একদিকে নিজ দেশে প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত, অন্যদিকে শিবিরের জীবন নিয়ে হতাশা-এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাচ্ছে পাচারকারীরা।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের হতাশা ও অনিশ্চয়তা মানবপাচারের অন্যতম প্রধান কারণ। প্রায় নয় বছর পার হলেও তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেননি। ফলে শিবিরে তাদের জীবন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে উন্নত জীবনের আশায় অনেকে সমুদ্রপথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
মিজানুর রহমান বলেন, মানবপাচারকারীরা রোহিঙ্গাদের এই অসহায়ত্ব ও হতাশাকে পুঁজি করছে। নানা প্রলোভন ও প্রতারণার মাধ্যমে তাদের বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় উদ্বুদ্ধ করছে। এ ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের পানি তুলনামূলক শান্ত থাকে। এ কারণে এ সময়ে অবৈধ সমুদ্রযাত্রার প্রবণতা বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় আন্তঃদেশীয় মানবপাচার চক্র এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, শীত মৌসুমে সমুদ্র তুলনামূলক শান্ত থাকায় নৌযানে চলাচল কিছুটা সহজ হয়। গত কয়েক বছর ধরেই এই সময়ে মানবপাচার ও অবৈধভাবে মানব চলাচলে জড়িত চক্রগুলো বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, মানবপাচার একটি সংঘবদ্ধ আন্তঃদেশীয় অপরাধ। এর সঙ্গে শুধু বাংলাদেশের পাচারকারীরা নয়, অন্য দেশের অপরাধী চক্রেরও যোগাযোগ ও সমন্বয় রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় এসব চক্রের সঙ্গে সশস্ত্র ব্যক্তিরাও যুক্ত থাকে। নিজেদের নিরাপত্তা ও পাচারের পথ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা অস্ত্র ব্যবহার করে।
আসিফ মুনীরের মতে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সতর্কতার সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। কক্সবাজার অঞ্চলে নিয়োজিত বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় উদ্যোগ নিতে হবে।
তবে শুধু অভিযান পরিচালনা করে মানবপাচার বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তার ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে মানব পাচারসংক্রান্ত মামলায় অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে। পাচারকারীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি মামলা, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া কার্যকর করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
টেকনাফের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইনজীবী মো. তৌহিদুল এহেছান। তিনি বলেন, টেকনাফের সমস্যা দীর্ঘদিনের। একে বিচ্ছিন্ন কিংবা শুধু স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে মানব পাচার, মাদক চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হয়ে আসছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতিও এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
তৌহিদুল এহেছান বলেন, টেকনাফে তিন বাহিনীর সমন্বয়ে পরিচালিত যৌথ অভিযান ইতিবাচক। এ ধরনের অভিযান আরও আগে প্রয়োজন ছিল। গত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে এলাকার সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও মানবপাচারের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিশেষ পুলিশ ক্যাম্প, বাড়ছে নজরদারি
মানবপাচার ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে টেকনাফে বিশেষ পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করেছে প্রশাসন। এ ক্যাম্পের মাধ্যমে মাদক ও মানব পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে পুলিশের কার্যক্রম আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান বলেন, শীত মৌসুমে মানব পাচারকারীদের তৎপরতা তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মাদক ও মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে টেকনাফে বিশেষ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মাদক কিংবা মানব পাচারকারীরা অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা করলে এই ক্যাম্পের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। পুলিশের কার্যক্রম আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করার পাশাপাশি টেকনাফের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতেই ক্যাম্পটি স্থাপন করা হয়েছে।
সমুদ্রযাত্রায় বাড়ছে প্রাণহানি
মানব পাচারের পাশাপাশি অনিয়মিত সমুদ্রযাত্রায় প্রাণহানির ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সমুদ্রপথে রোহিঙ্গাদের জন্য বছরটি ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী। ওই বছর ৬ হাজার ৫০১ জন রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের মধ্যে ৮৯২ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে।
এ ছাড়া চলতি বছরের ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে প্রায় ২৮০ যাত্রী নিয়ে একটি ট্রলারডুবির ঘটনায় অন্তত ৩৩ জনকে হত্যার অভিযোগ ওঠে। জুনের শেষ দিকে এবং ৮ জুলাই মিয়ানমার উপকূলে আরও দুটি নৌকাডুবির ঘটনায় পাঁচ শতাধিক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন অনিশ্চয়তা, জীবিকার সংকট, শীত মৌসুমে সমুদ্রযাত্রার অনুকূল পরিবেশ এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধী চক্রের তৎপরতা-সব মিলিয়ে মানব পাচারের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই সীমান্তে নজরদারি ও অভিযান জোরদারের পাশাপাশি পাচারকারী চক্রের অর্থায়ন, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক যোগসূত্র শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত না হলে এই অপরাধের চক্র ভাঙা কঠিন হবে।