
সিলেটে বেতন আটকে রাখার অভিযোগে শেভরন কার্যালয়ে কর্মীদের অবস্থান
আবু সাঈদ নিশান
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৯

রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা হেলেনা বেগম। প্রতিদিন রান্না থেকে শুরু করে খাবার তৈরি—সব কাজেই যে পানি ব্যবহার করেন, তা কতটা নিরাপদ—জানেন না হেলেনা কিংবা তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
দেশের বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা পানির মধ্যে ৪৭ শতাংশে পাওয়া গেছে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ই-কোলাই। আর ঘরে সংরক্ষণ করা এই পানির মধ্যে দূষণের মাত্রা ছাড়িয়েছে ৮৫ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ যে পানি দিয়ে আমরা রান্না করছি, খাবার তৈরি করছি, কিংবা গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করছি, সেই পানি এখন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ।
পানির নিরাপত্তা নিয়ে এমন উদাসীনতা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং দেশের কোটি কোটি মানুষের। দূষিত পানি কখনো অসুস্থ বানিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে হাসপাতাল পর্যন্ত। কেউ ডায়রিয়া, কেউ কলেরা আবার কেউ আক্রান্ত হচ্ছেন চর্মরোগে।
সম্প্রতি পানির দূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের জরিপে। প্রাথমিক ফল বলছে, গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত পানির ৮৫ শতাংশের বেশি নমুনায় পাওয়া গেছে ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া। আর, সুপেয় পানি সুবিধার বাইরে দেশের ১০ কোটিরও বেশি মানুষ।
ইউনিসেফ বাংলাদেশ এর ওয়াটার স্যানিটেশন অ্যান্ড হাইজিন অফিসার ড. ফারিয়া ফাহিম বাঁধন বলেন, ৮৫ শতাংশ মানুষ ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া যুক্ত পানি খাচ্ছে। এর মধ্যে ৪৭ শতাংশ পানির সোর্স ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া যুক্ত। এছাড়া পানির সোর্সের ৯.১ শতাংশ আর্সেনিক যুক্ত।
তবে, পানি ফুটিয়ে বা ফিল্টারের মাধ্যমে ই-কোলাইয়ের ঝুঁকি থেকে অনেকটাই সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ।
ড. ফারিয়া ফাহিম বাঁধন বলেন, ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া যুক্ত পানি খাওয়ায় শিশুরা ডায়রিয়াসহ নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বার বার ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে শিশুদের ওজন কম হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এটি থেকে রক্ষা পেতে আমরা পানি ফুটিয়ে বা ফিল্টার করে পান করতে পারি।
উচ্চ আদালত বলছে, সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিরাপদ পানি কোনো দয়া বা সরকারি সুবিধা নয়—এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকার নিশ্চিতের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু, রাজধানীর বাস্তবতায় সেই মৌলিক অধিকার কতটা নিশ্চিত?
উৎস থেকে সরবরাহ ও সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার নজরদারির তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সতর্ক করছেন ‘ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার’ ঝুঁকি নিয়েও।
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের হেড পলিসি অ্যাডভোকেসি অ্যাডভোকেট ফাইয়াজউদ্দিন আহমাদ বলেন, পানির সোর্স, সাপ্লাই, স্টোরেজ এবং মেনেজমেন্ট প্রতিটি পর্যায়ে পানিটা নিরাপদ রাখতে পারলেই নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত হবে। পুরো সিস্টেমটাকে সংশোধন করতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘ই-কোলাই’ একটি মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া। এটি কিডনি রোগীদের শরীরে ইউরেনিয়া নামে একটি সমস্যা তৈরি হয় যা মৃত্যু ডেকে আনতে পারে। শিশু-বড় সবার মধ্যেই নিউমোনিয়া, সেফসিস এবং মস্তিস্কের প্রদাহ তৈরি করতে পারে। প্রতিরোধ করতে খাবার পানি ও গৃহস্থালী কাজে ব্যবহৃত পানি ‘ই-কোলাই’ মুক্ত হতে হবে।
ঘরে ঘরে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব যাদের, সেই ঢাকা ওয়াসার জবাব জানতে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যোগাযোগ করেও মেলেনি কোনো উত্তর। লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি কর্তাব্যক্তিদের কারও।
নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা না গেলে, অদূর ভবিষ্যতে দুরারোগ্য ব্যাধির প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই, সরকারকে আরও দায়িত্বশীল হতে বলছেন গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা।