
যুক্তরাষ্ট্র ফের হামলা চালালে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আহ্বান ইরানি আইনপ্রণেতার
মামুন শেখ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:২২

ইউরোপের দেশ আলবেনিয়া ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী ইদি রামার পদত্যাগ দাবি করছেন।
ইউরোপের দেশ আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিয়েছে। রাজধানী তিরানায় টানা কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর বাইরেও। প্রশ্ন উঠেছে, এই আন্দোলন কি শেষ পর্যন্ত রামা সরকারের পতন ঘটাতে পারবে? আর এর পেছনে বিদেশি শক্তির হাত থাকার যে অভিযোগ উঠেছে, তার ভিত্তি কী?
আলবেনিয়া দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান উপদ্বীপের একটি ছোট দেশ। দেশটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী, দীর্ঘ কমিউনিস্ট শাসনের ইতিহাস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রচেষ্টার কারণে বিশেষভাবে পরিচিত। বর্তমানে দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদপ্রার্থী এবং ন্যাটোর সদস্য।
পঞ্চদশ শতকে আলবেনিয়ার বড় অংশ অটোমান সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে আসে। কয়েক শতকের শাসনামলে দেশটিতে ইসলাম ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। তবে মুসলিম, ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স খ্রিষ্টান—বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ সেখানে বসবাস করে আসছেন।
১৯১২ সালের ২৮ নভেম্বর অটোমান সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে আলবেনিয়া। এরপর দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। ১৯২৮ সালে আহমেত জোগু নিজেকে রাজা ঘোষণা করেন। তার রাজত্বের অবসান ঘটে ১৯৩৯ সালে, যখন ইতালি আলবেনিয়া দখল করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালির পর জার্মানি আলবেনিয়া দখল করে। ১৯৪৪ সালে কমিউনিস্ট গোষ্ঠী ক্ষমতা গ্রহণ করে। পরে এনভার হোজার নেতৃত্বে দেশটি কঠোর একনায়কতান্ত্রিক শাসন ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে পড়ে। বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করা হয়, আর ১৯৬৭ সালে আলবেনিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নাস্তিক রাষ্ট্র’ ঘোষণা করা হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মচর্চার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।
১৯৯০ সালে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বহুদলীয় রাজনীতির পথ খুলে যায় এবং ১৯৯১ সালে প্রথম বহুদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কমিউনিজমের পতনের পর আলবেনিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে। ২০০৯ সালে দেশটি ন্যাটোর সদস্য হয়। একই বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার আবেদন করে এবং ২০১৪ সালে সদস্যপদপ্রার্থী দেশের মর্যাদা পায়। বর্তমানে ইইউতে যোগদানের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আলোচনা চলছে।
আলবেনিয়ায় চলমান বিক্ষোভের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর এই বিক্ষোভ নিয়ে একটি প্রতিবেদন করে রয়টার্স। এতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আন্দোলনকে তীব্র করেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পড়াশোনা শেষ করেও অনেকে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। রাজনৈতিক যোগাযোগ ছাড়া ভালো চাকরি পাওয়া কঠিন।
বর্তমান আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিলাসবহুল পর্যটন উন্নয়ন প্রকল্প।
আলবেনিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভিয়োসা-নার্তা জলাভূমি পরিযায়ী ফ্ল্যামিঙ্গোসহ বহু প্রজাতির পাখির আবাসস্থল। ওই সংবেদনশীল উপকূলীয় এলাকায় বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্রটি নির্মাণের পরিকল্পনার প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হয় গত অক্টোবরে। প্রতিবাদকারীরা গোলাপি ফ্ল্যামিঙ্গোর ছবি, প্রতিকৃতি ও বেলুন ব্যবহার করতে থাকেন। সেখান থেকেই আন্দোলনটির নাম হয় ‘ফ্ল্যামিঙ্গো বিপ্লব’।
পরিবেশ রক্ষার দাবি থেকে শুরু হলেও আন্দোলনটি পরে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও নাগরিক আন্দোলনে পরিণত হয়। শিক্ষার্থী, পরিবেশবাদী, তরুণ ও সরকারবিরোধী নাগরিকেরা এতে অংশ নেন।
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ। এর পাশাপাশি তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষার ব্যয় কমানো, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং বিতর্কিত উন্নয়ন প্রকল্পে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের দাবি এখন আরও বিস্তৃত হয়েছে। তারা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা বা শিক্ষা ব্যয় নিয়ে কথা বলছেন না; সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, চাকরির সুযোগ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহিও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী রামা ‘ফ্ল্যামিঙ্গো বিপ্লব’কে বিদেশি হস্তক্ষেপের উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। অক্টোবরের বিক্ষোভের সময় রামা বলেছিলেন, আলবেনিয়ার ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে কিছু শক্তি আন্দোলনকে কাজে লাগাতে পারে।
এবারও টানা এক সপ্তাহের সহিংস বিক্ষোভের পর বিদেশি শক্তির দিকে নতুন করে আঙুল তোলেন প্রধানমন্ত্রী এদি রামা। এই বিক্ষোভের পেছনে ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ কাজ করছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
তার মতে, মানুষের বাস্তব সমস্যাকে কাজে লাগিয়েই এই অস্থিরতা উসকে দেওয়া হচ্ছে। জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, আবাসন কেনা বা ভাড়া নেওয়ার অসুবিধা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি করেছে, সেটি নিছক কল্পনা নয়। বরং মানুষের এই বাস্তব অসন্তোষের সুযোগ নিয়েই ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বলতে সাধারণত প্রচলিত সামরিক যুদ্ধের বাইরে তথ্যপ্রচার, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, সাইবার কার্যক্রম ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মতো নানা কৌশলের সমন্বয়কে বোঝানো হয়।
আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা ইসরাইলের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থনের জন্য পরিচিত। ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি জেরুজালেমে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে দেওয়া বক্তব্যে তিনি হামাসকে নির্মূল করার পক্ষে অবস্থান নেন। একই সঙ্গে ইসরাইলের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির প্রতি সমর্থন জানান।
ইসরাইলের সঙ্গে আলবেনিয়ার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও রয়েছে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা'আর আলবেনিয়া সফরে রামার সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় ইসরাইলের নিরাপত্তার প্রতি রামার সমর্থনের প্রশংসা করেন তিনি। রামা গাজা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনাকেও সমর্থন জানিয়েছেন।
আলবেনিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং ন্যাটোর সদস্য। দেশটির সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও দীর্ঘদিনের বৈরিতা রয়েছে। ২০২২ সালে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাইবার হামলার অভিযোগ তুলে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে তিরানা। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ঘিরেও রামা রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে অনলাইনে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো এবং অস্থিরতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, ‘এদি রামা, আপনার দেশের নাগরিকেরাই প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমেছেন। অন্যদের দোষারোপ না করে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর সমাধান করুন।’
আন্তর্জাতিক জটিল সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে আলবেনিয়ার বর্তমান সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে দেশটির ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের আকাঙ্ক্ষা এবং পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কও জড়িয়ে রয়েছে।
২০১৩ সাল থেকে আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এদি রামা। ২০২৫ সালের নির্বাচনে তার সোশ্যালিস্ট পার্টি টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসে। ফলে রাজপথের আন্দোলন তীব্র হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের পতন ঘটবে—এমন সম্ভাবনা এখনো দেখা যাচ্ছে না।
রামা পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বক্তব্য, নির্বাচনে পাওয়া ম্যান্ডেট অনুযায়ী সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নে আলবেনিয়ার সদস্যপদ অর্জনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চায়। তিনি শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক উদ্বেগ নিয়ে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করলেও সহিংসতা ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের বিরোধিতা করেছেন।
তবে আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্বও উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রামার দলের এক তরুণ সংসদ সদস্য মারজানা কোচেকু তার প্রশাসনের বিরোধিতা করে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের ভেতর থেকেও সমালোচনার এমন প্রকাশ রাজনৈতিক চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
তারপরও সরকার পতন নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর— আন্দোলন কত দিন স্থায়ী হয়, আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠী এতে যুক্ত হয় কি না, ক্ষমতাসীন দলের সংসদীয় ঐক্য অটুট থাকে কি না এবং সরকার সংলাপ বা সংস্কারের মাধ্যমে অসন্তোষ কমাতে পারে কি না।
অর্থাৎ, রামার সরকার নিশ্চিতভাবেই চাপে রয়েছে। কিন্তু বিক্ষোভের জেরে তিনি ক্ষমতা হারাবেন, এমন পূর্বাভাস এখনই দেয়া যাচ্ছে না।