
সৌদি আরবকে বাঁচাতে ‘টাইফুন’ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করছে যুক্তরাজ্য
ফয়সাল হাসান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:২৪

ফ্রান্সের প্যারিসে গেল ১৮ অক্টোবর আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় একটি বিশেষ পোশাক পরিহিত একজন বিক্ষোভকারীকে। ছবি: রয়টার্স
দেশব্যাপী বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ার পর, স্থানীয় সময় রোববার (১৮ অক্টোবর) রাতে এক ধরনের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। যেখানে তিনি একদিকে শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন, অন্যদিকে দাঙ্গাকারীদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও করেন।
ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ‘যারা সম্পত্তি ধ্বংস করেছে, তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যারা লুটপাট করেছে, তাদের ক্ষতিপূরণ (ভুক্তভোগীদের) দিতে হবে। যারা প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।’
তবে প্রেসিডেন্টের ভাষণে যা আশা করেছিলেন, তার বিপরীতই পেয়েছেন প্যারিসের ঠিক দক্ষিণ-পূর্বের শহরতলি ইভ্রি-সুর-সেনের বাসিন্দা ২০ বছর বয়সি ইয়ানিস।
তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট বরাবরের মতোই কেবল ফাঁকা বুলি আওড়ালেন, কাজের মতো কিছুই বললেন না। আমরা আবারও রাস্তায় নেমে আসব। পরিস্থিতি না বদলানো পর্যন্ত একের পর এক বিক্ষোভ চলতে থাকবে কোনো বিরতি ছাড়াই।’
ফ্রান্স যখন ব্যাপক ক্ষোভের মোকাবিলা করছে, গত সপ্তাহান্তে যা সহিংস বিক্ষোভে রূপ নেয় – ঠিক সেই সময়ে ম্যাক্রোঁ যে ধরনের মধ্যপন্থি রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেন, তার প্রতি আগ্রহ দ্রুত কমে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, অন্তত দেশটির তরুণ প্রজন্মের মধ্যে।
ফ্রান্সে এই অস্থিরতা এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে যখন দেশটির ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আর মাত্র কয়েক মাস দূরে। এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করে তুলেছে, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রাস্তায় দৃশ্যমান এই হতাশার সমাধান হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
জনতুষ্টিবাদী-বামপন্থি নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে, উগ্র-ডানপন্থি নেত্রী মারিন ল্য পেন এই বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত বিশৃঙ্খলার ওপর আলোকপাত করেছেন এবং বিষয়টিকে নিরাপত্তা ও কর্তৃত্বের সংকট হিসেবে তুলে ধরেছেন।
আর মধ্যপন্থি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়েন লেকর্নু চরম বামপন্থিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন, তারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এক ধরনের ‘প্রস্তুতি পর্ব’ হিসেবে সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে।
নির্বাচনের আগের জনমত জরিপগুলো এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে চরম বাম ও চরম ডান উভয় পক্ষই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে দেশটিতে পরিবর্তনের দাবি থাকলেও, সেই পরিবর্তন ঠিক কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে ঐকমত্য খুবই কম।
প্রতিবেদন অনুসারে, নির্বাচনের পর সরে দাঁড়াতে হবে দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা ম্যাক্রোঁ-কে। কারণ সংবিধান অনুযায়ী তার পুনরায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বেলিঘ নাবলি’র মতে, ‘প্রার্থীদের সামনে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা এবং তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে কথা বলা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তরুণদের উদ্দেশে বার্তা তুলে ধরার রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা তাদের রয়েছে। সেই বার্তাটি যেন অন্তঃসারশূন্য না হয়; বরং তাতে তরুণদের দাবিগুলোর উত্তর থাকতে হবে।’
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে প্রতিবাদ শুরু করার পর থেকে শিক্ষার্থীরা উন্নত বিদ্যালয়, আরও বেশি শিক্ষক এবং একটি অধিকতর সমতাভিত্তিক ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে এই আন্দোলন দ্রুত বিদ্যালয়ের আঙিনা ছাড়িয়ে রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর মাধ্যমে সামনে উঠে আসে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগগুলো।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিবাদ বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে, যা হয়তো অন্যথায় ঘটত না। কারণ, তরুণদের মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে কম এবং রাজনৈতিক প্রচারণায় সাধারণত বয়স্ক ভোটারদের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেখানে পেনশন বা এই ধরনের বিষয়গুলোই প্রাধান্য পায়।
নাবলি বলেন, ‘এই গণ-উদ্যোগটি না থাকলে সবকিছু আগের মতোই চলত। আমরা হয়তো প্রার্থীদের পক্ষ থেকে তরুণদের প্রতি এক ধরনের আপেক্ষিক উদাসীনতা দেখতে পেতাম, কারণ ৬০ বছরের বেশি বয়সিদের তুলনায় তরুণরা বেশি সক্রিয় (নির্বাচনের সময়) হয় না।’
ফ্রান্স আনবাউড – ফরাসি ভাষায় ‘লা ফ্রান্স আনসুমিস’ বা এলএফআই – মেলঁশোঁর নেতৃত্বাধীন বামপন্থি এই দলটি ছাত্র আন্দোলনকে জোরালো সমর্থন জানিয়েছে, তবে অনেকে দলটির বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভ উসকে দেওয়ার এবং রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এই অস্থিরতাকে কাজে লাগানোর অভিযোগও তুলেছেন।
যদিও তরুণ ভোটারদের মধ্যে দলটির জনপ্রিয়তা এই বিক্ষোভ শুরুর অনেক আগে থেকেই ছিল। দলটির কর্মসূচিতে এই আন্দোলনের মূল অভিযোগগুলোর বেশ কয়েকটি সমাধানের প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে আছে শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ, শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি এবং ‘পারকুরসুপ’ ব্যবস্থা বাতিল করা। এটি উচ্চশিক্ষায় ভর্তির আবেদনের জন্য ব্যবহৃত একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যা নিয়ে অনেকের অভিযোগ যে এতে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘লে জেকো’ (Les Echos)-এর জন্য ‘অপিনিয়নওয়ে’ (OpinionWay)-এর এক জরিপ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সি ভোটারদের মধ্যে মেলঁশোঁ এগিয়ে আছেন। তার পক্ষে সমর্থন রয়েছে ৪৯ শতাংশ ভোটারের, যা ২০২২ সালের তুলনায় ১০ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
কিছু তরুণ বিক্ষোভকারীর ক্ষেত্রে মেলঁশোঁর প্রতি সমর্থন একদিকে যেমন চরম ডানপন্থার বিরোধিতাকে প্রতিফলিত করে, তেমনি অন্যদিকে তা রাজনৈতিক মধ্যপন্থার প্রতি তাদের হতাশারও বহিঃপ্রকাশ।
লিডিয়া নামের ২১ বছর বয়সি এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমি ‘লা ফ্রঁস আনসুমিস’-কে ভোট দেব চরম ডানপন্থি দল ‘ন্যাশনাল র্যালি’ এবং মধ্যপন্থি শিবিরের মোকাবিলা করার জন্য। কারণ মধ্যপন্থিরা ক্ষমতায় এলে কার্যত ম্যাক্রোর নীতিগুলোরই পুনরাবৃত্তি ঘটবে।”
তবে তিনি জানান, এই দলটি যে ফ্রান্সের সমস্যাগুলোর সমাধান করবেই এমন কোনো ভ্রান্ত ধারণা তার নেই। তিনি ‘এলএফআই’-কে খলনায়ক হিসেবে চিত্রিত করার প্রচেষ্টারও সমালোচনা করেন। তার মতে, মধ্যপন্থি বাম অবস্থানগুলোকেও এখন ক্রমশ ‘চরমপন্থি’ বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
লিডিয়া বলেন, ‘সহমর্মিতা দেখানোটা এখন এক বিরল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, এটি যেন এখন চরম বামপন্থি কোনো বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য হচ্ছে।’
রাজনৈতিক ধারার অপর প্রান্তে, ল্য পেন এবং তার দল ‘ন্যাশনাল র্যালি’ এই অস্থিরতাকে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে পরিণত করার চেষ্টা করেছে। তারা সরকারকে দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছে এবং তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মেলঁশোঁর বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৩২ শতাংশ ভোট পেয়ে ল্য পেন শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে টিকে আছেন। অন্যদিকে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সি ভোটারদের মধ্যে ‘ন্যাশনাল র্যালি’ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, যেখানে তাদের পেছনে আছে ‘ফ্রান্স আনবাউড’ দলটি।
রোববার এক ভিডিও বার্তায় ল্য পেন বলেন, ‘গতকাল আপনারা দেখেছেন যে আমাদের শহর, আমাদের রাস্তাঘাট এবং আমাদের দেশ কীভাবে নিগৃহীত, বিধ্বস্ত ও লুণ্ঠিত হয়েছে। আমরা আস্থা ও কর্তৃত্বের এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যা আমাদের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্স বর্তমানে সহিংসতা ও অসহায়ত্বের যাঁতাকলে পিষ্ট, এক অর্থে জিম্মি হয়ে পড়েছে।’
আল জাজিরা বলছে, এই পরস্পরবিরোধী বয়ানগুলোর মাঝে আটকা পড়েছেন ম্যাক্রোঁ ও তার মধ্যপন্থি শিবির, যার দায়িত্ব শুরু হয়েছিল ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এবং এখন তা শেষ হতে চলেছে আরও একটি বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতার আবহে। প্রাথমিকভাবে জ্বালানি কর বৃদ্ধির কারণে শুরু হওয়া সেই আন্দোলনটি পরবর্তীতে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ম্যাক্রোঁ’র মাধ্যমে অভিজাত শ্রেণিকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার অভিযোগের বিরুদ্ধে এক বৃহত্তর গণবিক্ষোভে রূপ নেয়।
বর্তমান ও অতীতের পরিস্থিতির একটি পার্থক্য হলো, পরবর্তী কোনো সরকারেরই নগদ অর্থ দেয়ার মাধ্যমে অস্থিরতা প্রশমিত করার মতো আর্থিক অবকাশ থাকবে না। গত বছর সরকার ফ্রান্সের মোট দেশজ উৎপাদনের ৫.১ শতাংশ ঘাটতি রেকর্ড করেছে, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। এর বিপরীতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় হার হলো ৩.১ শতাংশ। ভবিষ্যতে যিনিই প্রেসিডেন্ট হোন না কেন, তাকে ম্যাক্রোঁর মতো একটি কঠিন সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে, আর তা হলো- জনরোষ আরও না বাড়িয়ে কীভাবে সরকারি ব্যয় কমানো যায়।
ফ্রান্সের বর্তমান গণ-আন্দোলন রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি এক ব্যাপক মোহভঙ্গের চিত্র উন্মোচন করেছে। প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা এখন ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন।
এই অস্থিরতা ম্যাক্রোঁর বিরোধীদের জন্য এমন একটি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, যার মাধ্যমে তারা দাবি করতে পারে যে প্রেসিডেন্ট দেশের অসমতাগুলোকে দূর করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এখানে প্রশ্নটি হলো তরুণ প্রজন্মের সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি, যারা রাষ্ট্রব্যবস্থার কারণে হতাশ এবং রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন বোধ করছে। নির্বাচনের আগে আগামী মাসগুলোতে রাজনৈতিক ধারার সব পক্ষই এই তরুণদের নিজেদের দিকে টানার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সূত্র: আল জাজিরা