
ইউক্রেনকে যুদ্ধ থামানোর চাপ ট্রাম্পের, পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন মার্কিন দূত
ফয়সাল হাসান
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৪

কিম জং উনের মৃত্যুর গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তার ছবি প্রকাশ করে। ছবি: সংগৃহীত
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয়েছে বলে ফের গুঞ্জন ছড়ালেও উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে বেশ সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা গেছে কিম জং উনকে। রডং সিনমুন নামের সংবাদপত্রটিতে প্রকাশ হওয়া সেই ছবিতে ৪২ বছর বয়সি এই শাসককে তার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে পোশাক ও জুতার একটি প্রদর্শনী ঘুরে দেখতে দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এক চীনা ভিন্নমতাবলম্বী কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেন, কিমকে অচেতন অবস্থায় বেইজিংয়ের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে তার মৃত্যু হয়েছে। ওই দাবি ছড়িয়ে পড়ার কয়েক ঘণ্টা পরই মেয়ের সঙ্গে কিমের ছবি সামনে আসে।
উত্তর কোরিয়া নিয়ে যারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন, তাদের কাছে এ ধরনের গুঞ্জন এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে গোপনীয় রাষ্ট্রগুলোর একটি উত্তর কোরিয়ায় প্রকৃত ঘটনা যাচাই করা প্রায়ই কঠিন। ফলে সেখানে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
সবশেষ এই দাবিটি করেছেন ওয়ানজুন শিয়ে। তিনি নিজেকে চীনা ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেন। দলটি চীনা কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞার মুখে আছে। এর আগেও তিনি যাচাই না করা বিভিন্ন দাবি ছড়িয়েছেন। এর মধ্যে চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের মৃত্যু নিয়ে জল্পনাও ছিল।
শিয়ের দাবি, কিমের মস্তিষ্কে গুরুতর রক্তক্ষরণ হয়েছিল। উত্তর কোরিয়ায় তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসুবিধা না থাকায় তাকে বেইজিংয়ে নেওয়া হয়। পরে কিমের মৃত্যু হয় এবং তার মরদেহ গোপনে উত্তর কোরিয়ায় ফিরিয়ে আনা হয়। তবে তার মৃত্যুর বিষয়টি গোপন রেখেছে দেশটির সরকার।
কিন্তু প্রকাশিত ছবিগুলো ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। ছবিতে কিমকে প্রদর্শনীর বিভিন্ন পণ্য ঘুরে দেখতে দেখা যায়। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন মেয়ে কিম জু আয়ে এবং তার নিয়মিত সফরসঙ্গী কর্মকর্তারা।
যদিও ছবিগুলো ঠিক কখন তোলা হয়েছে তা নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও, এই দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করার আরও কিছু কারণ রয়েছে।
কিমের স্বাস্থ্যের হঠাৎ অবনতি হলে উত্তর কোরিয়ার বাইরেও সম্ভবত তার কিছু লক্ষণ দেখা যেত।
সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা কিংবা শরণার্থীদের ঢল সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে চীন উত্তর কোরিয়া সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করতে পারত। উত্তর কোরিয়ার কূটনৈতিক মিশনগুলোর আশপাশেও তৎপরতা বাড়তে পারত। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা উত্তর কোরীয় পলাতকরাও প্রায়ই চীন সীমান্তের অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্য পান। কিন্তু এসবের কোনো কিছুই ঘটেনি।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপকে জানিয়েছেন, এসব প্রতিবেদন সমর্থন করার মতো কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
এই গুঞ্জন আগের কিছু গুজবের কথাও মনে করিয়ে দেয়। ২০২০ সালে উত্তর কোরিয়ার এক আলোচিত পলাতক দাবি করেছিলেন, হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচারের পর কিম মারা গেছেন বলে তিনি ‘৯৯ শতাংশ নিশ্চিত’। কিন্তু এর কিছুদিন পরই কিম জনসমক্ষে হাজির হন এবং ওই দাবি ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন বারবার ছড়ায় এসব গুঞ্জন? এর প্রথম কারণ হলো ক্ষমতার উত্তরাধিকার।
উত্তর কোরিয়া তিন প্রজন্ম ধরে কিম পরিবারের শাসনে রয়েছে। তবে কিম জং উনের পর কে ক্ষমতায় আসবেন, তা তার পূর্বসূরিদের সময়ের তুলনায় এখনো অনেক বেশি অনিশ্চিত।
কিম ইল সুং কয়েক দশক ধরে তার ছেলে কিম জং ইলকে ক্ষমতা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। ১৯৯৪ সালে কিম ইল সুংয়ের মৃত্যুর সময় উত্তরাধিকার পরিকল্পনা সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। ফলে কিম জং ইলের ক্ষমতা গ্রহণের প্রক্রিয়াও তুলনামূলকভাবে মসৃণ ছিল।
কিম জং উনের ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া ছিল দ্রুত এবং তুলনামূলকভাবে অনিশ্চিত। ২০০৮ সালে কিম জং ইল স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর তার ছোট ছেলেকে দ্রুত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে উন্নীত করা হয়। ২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর আগেই তাকে প্রকাশ্যে ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
তা সত্ত্বেও ক্ষমতা সুসংহত করতে কিম জং উনকে কয়েক বছর সময় নিতে হয়। এ সময় তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন এবং সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের নির্মূল করেন।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, কিম তার মেয়েকে উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করতে পারেন। সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান ও সামরিক প্রদর্শনীতে মেয়েকে তার সঙ্গে আরও বেশি দেখা যাচ্ছে।
তবে তার মেয়ের বয়স এখনো আনুমানিক ১৩ বছর। উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বে এর আগে কোনো নারী আসেননি। তা ছাড়া তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরসূরি ঘোষণা করা হয়নি। তার অল্প বয়সের কারণে ক্ষমতার লড়াইয়েও তিনি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
এসব অনিশ্চয়তাই ব্যাখ্যা করে যে, কেন কিমের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন এত বেশি। দ্বিতীয় কারণ হলো, এসব গুঞ্জন পুরোপুরি অসম্ভব বলে উড়িয়েও দেওয়া যায় না।
কিমের ওজন বেশি এবং তিনি প্রচুর ধূমপান করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা একাধিকবার সতর্ক করেছে, তার জীবনযাপনের ধরন হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কিম পরিবারের মধ্যেও হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ইতিহাস রয়েছে।
কিমের কিছু ঘটে গেলে প্রতিবেশী দেশগুলোসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর তার প্রভাব পড়বে। দেশটির নেতৃত্বে আকস্মিক সংকট দেখা দিলে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে কি না, তা নিয়েও কঠিন প্রশ্ন দেখা দেবে।
ক্ষমতার লড়াইয়ে কি কট্টরপন্থিরা আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে পারে? অস্থিরতা কি চীন সীমান্তে শরণার্থীদের ঢল নামাতে পারে? – এসব প্রশ্ন শুধু বেইজিং ও সিউল নয়, ওয়াশিংটনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৮ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে।
কিম জং উনের ওপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ঘনিষ্ঠ নজর রাখে, যাতে তার সম্পর্কে কোনো গুরুত্বপূর্ণ খবর এলে তারা প্রস্তুত থাকতে পারে।
উত্তর কোরিয়া এখনো তথ্যের দিক থেকে প্রায় অন্ধকারে ঢাকা একটি দেশ। এ কারণে দেশটি নিয়ে গুজব ছড়ানোও সহজ। কিমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে এমন মানুষের সংখ্যাও খুব কম। এমনকি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষেও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন। বাইরে আসা অনেক তথ্যের ক্ষেত্রেই ‘যাচাই করা হয়নি’ কিংবা ‘সম্ভবত সত্য’– এ ধরনের সতর্কতামূলক ভাষা ব্যবহার করা হয়। নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় খুব কমই।
ধারণা করা হয়, প্রকৃতপক্ষে কী ঘটছে, তা আড়াল করতে উত্তর কোরিয়ার সরকারও ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। এ উদ্দেশে তারা ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ফাঁস করে থাকতে পারে।
তাই বিশ্বাস করা কঠিন যে ওয়ানজুন শিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ খবর পেয়ে গিয়েছিলেন, অথচ যাদের দায়িত্বই হলো এ ধরনের তথ্যের খোঁজ রাখা, সেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তা জানতে পারেনি।
তিনি হয়তো শুধু মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন। আবার উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এনে চীনকে বিব্রত করাও তার উদ্দেশ্য হতে পারে। যদিও এই দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়টি সবার কাছেই সুপরিচিত।
তার উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগিয়ে গুজব ছড়ানো ওয়ানজুন শিয়েই প্রথম ব্যক্তি নন।
সূত্র: বিবিসি