
ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পরিচ্ছন্নতা ও সবুজায়নে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ চান প্রধানমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪১

গত বছরের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় জুলাই সনদের অঙ্গীকারনামায় সই করে বিএনপি-জামায়াতসহ রাজনৈতিক দলগুলো, ছবি: সংগৃহীত
জুলাই জাতীয় সনদ সইয়ের একবছর পূর্ণ হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধ এখনও কাটেনি। ক্ষমতাসীন বিএনপি বলছে, সনদ অবশ্যই বাস্তবায়ন হবে, তবে নোট অব ডিসেন্টসহ। তবে সরকারের এ অবস্থানকে ভিন্নভাবে দেখছে বিরোধী দল। নেতারা বলছেন, নোট অব ডিসেন্ট নয়, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে জুলাই সনদ। নয়তো আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। আর বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরোধপূর্ণ এ অবস্থায় ছাড় দিতে হবে সব পক্ষকেই।
জুলাই সনদ কী
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার। শুধু সরকার বদল নয় বরং কেমন রাষ্ট্রব্যবস্থা এই পরিবর্তনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে—এ প্রশ্নও তখন সামনে আসে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার দুই মাসের মাথায় রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন বা সংস্কার আনতে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন হয়। কমিশনগুলোর মধ্যে রয়েছে- সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন। এ ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এসব কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির জন্য গঠন করা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। দীর্ঘ আট মাস ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনার পর তৈরি হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’।
জুলাই সনদের ৮৪টি ধারার মধ্যে অন্তত ৪৮টিই সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত। বাকিগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ সংস্কার ও দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত। সনদের শেষ অংশে রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ৭ দফা অঙ্গীকারনামা।
গত বছরের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪টি দল এই সনদের অঙ্গীকারনামায় সই করে। পরে গণফোরাম এবং চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি এনসিপি সনদে সই করে। তবে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নিলেও বামধারার চারটি দল ওই সনদে সই করেনি।
সনদে নোট অব ডিসেন্ট
সনদের অনেকগুলো প্রস্তাবেই এক বা একাধিক দলের ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। কোন প্রস্তাবে কোন কোন দলের ভিন্নমত রয়েছে, সনদে তার উল্লেখ রয়েছে। সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, উচ্চকক্ষের ক্ষমতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপদ্ধতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধানসহ এ ধরনের কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আসবে। তবে কিছু প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত আছে।
জুলাই সনদের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আইনসভা হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। নিম্নকক্ষ বা সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে একটি দল যত ভোট পাবে, তার অনুপাতে তারা উচ্চকক্ষে আসন পাবে। এ প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত আছে। তাদের অবস্থান হলো, একটি দলের নিম্নকক্ষে পাওয়া আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন হবে।
গণভোটে ছিল না ভিন্নমত
সনদে উল্লেখ থাকলেও জুলাই সনদ নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটের ব্যালটে বিএনপি বা অন্য কোনো দলের ভিন্নমতের বিষয়গুলোর কোনো উল্লেখ ছিল না। অর্থাৎ জুলাই সনদের মূল প্রস্তাবগুলোর ওপরই গণভোট হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে ওই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করার কথা ছিল। অবশ্য বিএনপি বলছে, ওই আদেশ অবৈধ।
এক বছর আগে জুলাই সনদকে ঐক্যের প্রতিফলন আর সভ্যতার পথে নতুন সূচনা হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন তখনকার অন্তর্বর্তী সরকারে প্রধান ড. মোহাম্মদ ইউনূস। অথচ সেই সনদের বাস্তবায়ন ঘিরেই এখন রাজনীতিতে চলছে নানা আলোচনা-বিতর্ক। দলগুলোর বিরোধের কেন্দ্রে, কিছু মৌলিক ইস্যুতে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত।
ক্ষমতাসীন বিএনপি অবশ্য নিজেদের ভিন্নমতের আলোকেই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে। যদিও ভিন্নমত ছাড়াই সনদের হুবহু বাস্তবায়ন চায় জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
এদিকে, সংবিধান সংশোধনে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞসহ অংশীজনদের মতামত নেয়া শুরু করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি। যদিও মৌলিক কিছু ইস্যুতে আপত্তি জানিয়ে কমিটিতে নাম দেয়নি বিরোধী দল।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম বলেন, ‘বিএনপি দলীয় আঙ্গিকে জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করলে জনগণ খুশি হবে না। আলোচনায় দলটি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল। কিন্তু অনুষ্ঠিত গণভোটের রায়ে তাদের নোট অব ডিসেন্ট উপেক্ষিত হয়েছে। তখন প্রতিবাদ করেনি, এখন করবে কেন, ক্ষমতা পাওয়ার কারণে?’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সংবিধান সংশোধন কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘জনগণ যেহেতু আমাদের নির্বাচিত করেছে, আমাদের দায়িত্ব রয়েছে জুলাই সনদকে পুঙ্খানূপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ করে সাংবিধানিক আলোকে দেশ পরিচালনা করা। দায়িত্ববোধ থেকে যেসব জিনিস বাস্তবায়ন করা দরকার, সেসব আমরা বলেছি করবো। আমরা ওয়াদাবদ্ধ। কোন বিষয়টি সংশোধন আমরা করতে যাচ্ছি সেটার ওপরে আলোচনা হবে। আলোচনা হয়েই তো সংবিধান সংশোধন হবে।’
এদিকে নিজেদের দাবি নিয়ে রাজপথে থাকা বিরোধীরা আগামীতে আরও জোরালো কর্মসূচির ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে, আলোচনার মাধ্যমেই সব কিছুর সুরাহা চায় ক্ষমতাসীন দল।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আরও বলেন, ‘গণভোটের গণরায় বাস্তাবায়নের জন্য আমরা জনগণকে নিয়েই দাবি আদায়ে কর্মসূচি পালন করবো। কর্মসূচি এখন নিয়মতান্ত্রিক চলছে। দাবি আদায় না হলে কর্মসূচি সামনে আরও বেগবান হবে। জনগণকে নিয়ে আমরা দাবি আদায় করবো।’
এদিকে, বিরোধী দলে আন্দোলন নিয়ে জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘তারা তাদের সমস্যার কথা বলতে পারে। এ সুযোগটা তাদের রয়েছে। বিরোধী দল ঠিকমতো যদি তাদের দায়িত্ব প্রতিপালন করে, তাহলে তাদের রাজপথে যেতে হয় না। তারা সংসদেই বলতে পারেন।’
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটাতে সবপক্ষকে ছাড় দেয়ার আহ্বান জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে যেন জুলাই সনদ বাস্তাবয়ন হয়। কিন্তু কোনো দলেরই উচিত হবে না উচ্চাভিলাষী হওয়া। কেউই যেন নিজের পছন্দটা অন্যের ওপর চাপিয়ে না দেয়। বিএনপি সরকারের উচিত হবে সবাইকে আমলে নিয়ে কাজটা করা।’