
ডেঙ্গু ও হাম উপসর্গে একদিনে ১৩ মৃত্যু
ফারুক ভূইয়া রবিন
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯:১৪

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফাইল ছবি
আধুনিক প্রযুক্তি ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমে পরমাণু থেকে নিরাপদে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এর বড় উদাহরণ রাশিয়ার কালিনিন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট, যা চার দশক ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়েও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তি থাকলেই হবে না, গড়ে তুলতে হবে আদর্শ নিরাপত্তা সংস্কৃতিও।
রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় সাড়ে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে উদোমলিয়া শহর। ২৫ হাজারের বেশি মানুষের বসবাসের এই শহরের জনজীবন আর দশটি এলাকার মতোই স্বাভাবিক। সবুজে ঘেরা পার্কে কেউ অবসর কাটাচ্ছেন, কেউ ব্যস্ত খেলাধুলায়। স্বচ্ছ পানির লেকে সাঁতার কাটা ও মাছ ধরায় সময় পার করছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। সেই লেকের পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ৪ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার কালিনিন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট।
প্রশ্ন হলো, লোকালয় ও পরিবেশের স্বাভাবিকতা বজায় রেখে স্পর্শকাতর পারমাণবিক জ্বালানি থেকে কীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে? কেন্দ্রটির কর্তৃপক্ষ বলছে, এখানে সবার আগে গুরুত্ব দেয়া হয় নিরাপত্তাকে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ব্যবহার করা হয়েছে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১০০০ প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টর।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের পাশাপাশি প্রতিটি ধাপে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা মেনে চলা জরুরি। নিরাপত্তার এসব দিক নিশ্চিত করেই রাশিয়ার কালিনিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিরাপদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নজির গড়ে তুলেছে।
কর্তৃপক্ষ জানায়, বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি পরিবেশের ওপর প্রভাব ও বিকিরণের মাত্রা পর্যবেক্ষণে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। এ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয় ১৭টি স্টেশন থেকে। এসব তথ্য সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
এ ছাড়া উদোমলিয়ার বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য, স্থানীয় আবহাওয়া, বায়ুর মান ও পানির গুণগত মানও নিয়মিত পরীক্ষা করে কর্তৃপক্ষ। রাশিয়ার কালিনিন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিকিরণ নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান ভিক্টর ও. দোলেচিখ বলেন, ‘আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার নিরাপত্তা ও বিকিরণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকার বিকিরণের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করছি। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কোনো নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি।’
এদিকে, কালিনিন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের তুলনায় আরও উন্নত থ্রি প্লাস জেনারেশন প্রযুক্তির ভিভিইআর-১২০০ মডেলের রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী জানিয়েছেন, রূপপুরের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ের কোনো জায়গা নেই।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ‘এটি প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত উন্নত একটি প্রকল্প। আল্লাহ চাইলে আমাদের এর চেয়ে বেশি কিছু নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন হবে না।’
কালিনিন বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো রূপপুরেও আদর্শ নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রিঅ্যাক্টরের নিরাপত্তাব্যবস্থা যত উন্নত হোক না কেন, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দক্ষ ব্যবস্থাপনা। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও বাড়তি নিরাপত্তার কারণে রিঅ্যাক্টরে দুর্ঘটনা ঘটলেও তেজস্ক্রিয়তা বাইরে ছড়িয়ে পড়বে না; এটি আমরা মেনে নিলাম। কিন্তু ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে শেষ পর্যন্ত এই রিঅ্যাক্টর আর চালানো সম্ভব হবে না। রিঅ্যাক্টর চালাতে না পারলে দেশের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে, যা সামাল দেয়া কঠিন। তাই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
একই সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নিরাপদে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সচেতনতাও জরুরি।