
নেশার টাকা না পেয়ে বৃদ্ধ মাকে গলা কেটে হত্যা, যুবক আটক
সুজাউদ্দিন রুবেল
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৫৭

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত টুপটুপ রিসোর্ট। ছবি: সময় সংবাদ
পাহাড়, সমুদ্র ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছর কক্সবাজারে ছুটে আসেন বিপুলসংখ্যক পর্যটক। তাদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করতে এখানে গড়ে উঠেছে বিপুল সংখ্যক হোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। তবে সম্প্রতি ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের প্রাণহানির পর এসব প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তা ও নোটিশ থাকার পরও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা না নেয়ায় মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন নিহতদের স্বজনেরা।
আর সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর দাবি, সমন্বয়হীনতা, জনবলসংকট এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আইন না মানার প্রবণতার কারণে অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ অবস্থায় কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ৫০০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ফায়ার লাইসেন্স নিয়েছে প্রায় ১০০টি। আর ই-লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় আবেদন করেছে মাত্র ৫২টি প্রতিষ্ঠান।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার বলেন, প্রায় ৪০০টি প্রতিষ্ঠান এখনো ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছে। অগ্নিনিরাপত্তার দিক থেকে এটি উদ্বেগজনক।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অনেক রিসোর্টের মালিক প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা অনুসারে ব্যবস্থা নিতে চান না। বারবার সতর্ক করা, নোটিশ দেয়া এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করার পরও একই ধরনের অনিয়ম চলছে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অথোরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বি বলেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয় এড়াতে অনেক রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ আইন ও বিধিমালা মানতে চায় না। তাদের বারবার সতর্ক করা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হলেও বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয় না।
গত শনিবার ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতদের স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, অনিয়মের বিষয়ে আগে থেকে সতর্ক করা হলেও কার্যকর ব্যফবস্থা নেওয়া হয়নি।
অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের স্বজন নঈমুদ্দিনের অভিযোগ, ফায়ার সার্ভিসের নোটিশ উপেক্ষা করেও জরিমানা দিয়ে রিসোর্টের কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলে হয়তো এতগুলো প্রাণ ঝরে যেত না।
নিহতদের আরেক স্বজন ফয়সাল জাহান বলেন, টুপটুপ রিসোর্টের নিচতলায় রেস্তোরাঁ পরিচালিত হলেও ওপরের স্থাপনা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সতর্কতা ছিল। কিন্তু সেই সতর্কতা উপেক্ষা করা হয়েছে। সতর্ক করার পরও ব্যবস্থা না নেয়ায় এমন ঘটনার দায় কার? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতার দায় সাধারণ মানুষ কেন নেবে?
ভবিষ্যতে যেন আর কাউকে এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণ ঠেকাতে বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে রাতারাতি স্থাপনা নির্মাণ হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া জনবলসংকটও রয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনিম জাহান বলেন, কোনো স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেয়ার আগে সেটি আইনসম্মত কি না এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সমন্বয়ে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই রাতারাতি স্থাপনা তৈরি হয়ে যায়। বিষয়টি জানার আগেই নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় জনবলসংকটের কারণে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয় না। তবে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আশা করছেন তারা।
কক্সবাজারকে পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তোলা এবং পর্যটন উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালার আলোকে নিয়মিত পরিদর্শন করা হয় এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের নোটিশ দেয়া হয়। চূড়ান্ত নোটিশের পরও কেউ অবৈধ স্থাপনা অপসারণ না করলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়।
মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে ইতোমধ্যে চূড়ান্ত নোটিশ দেয়া হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সেখানে দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
এদিকে ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় রিসোর্টের মালিক ও ব্যবস্থাপকসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। তবে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।