
চলন্ত ট্রেনের বগি বিচ্ছিন্ন, ইঞ্জিন চলে গেল ২ কিলোমিটার

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
জাপান সফরের অন্যতম বড় অর্জন বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি। আর মাতারবাড়িকে কেন্দ্র করে ‘বিগ-বি ইনিশিয়েটিভ’ বাস্তবায়িত হলে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এতে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন কূটনীতিক ও অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, এ সফরের মধ্য দিয়ে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী হচ্ছে, যা ভূরাজনৈতিক অবস্থানেও বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখবে।
চীন ও মালয়েশিয়া সফরের পর জি-সেভেন জোটের সদস্য জাপান সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চার দিনের এ সফরে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সই হয়েছে ২৩টি নথি। বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক এখন কৌশলগত অংশীদারত্বের পর্যায়ে। দুই দেশের সরকারপ্রধান এ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল হাসান মনে করেন, তারেক রহমানের জাপান সফর গতানুগতিক ছিল না। অটোমোবাইল, প্রযুক্তি কিংবা মাতারবাড়িতে বিজনেস হাব-কোন খাতে কত বিনিয়োগ আনা সম্ভব, তা নিয়ে কূটনীতি ও অর্থনীতির বিভিন্ন দিক বিবেচনায় রেখে সতর্ক আলোচনা হয়েছে। এটি ছিল আগের সফরগুলোর তুলনায় ব্যতিক্রমী।
তিনি বলেন, এ সফরের জন্য বাংলাদেশ পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল। সাধারণত বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতি দেখা যায়। কিন্তু যৌথ ঘোষণার ভাষা দেখে মনে হয়েছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যথেষ্ট তথ্য ও প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। আগের যেকোনো সফরের তুলনায় এটি ছিল বড় ধরনের ব্যতিক্রম।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির বলেন, জাপান হিসাব-নিকাশ করেই বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে এবং তারা তা বাস্তবায়ন করতে চায়। এটি একটি বড় দিক। ৬ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগের এ ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে অতিরিক্ত ২ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার। তবে এ বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার। সম্প্রতি রফতানি বাড়লেও বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং রফতানি আরও বাড়াতে গুরুত্ব দিয়েছে ঢাকা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ড. মাহফুজ কবির বলেন, জাপান এ ক্ষেত্রে সরাসরি বেসরকারি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন এবং বাংলাদেশি জনশক্তি রফতানির বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
সফরের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল জাপানের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ’ বা বিগ-বি। এ উদ্যোগে ভারতের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জাপানের আগ্রহও স্পষ্ট হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিগ-বির সম্ভাব্য পরিধি ভারতের সেভেন সিস্টারস অঞ্চল, মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। এ উদ্যোগের মূল কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে। তবে এ উদ্যোগ থেকে বাংলাদেশ কীভাবে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে পারে, তা নিয়ে আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ড. মাহফুজ কবির বলেন, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলভিত্তিক হাব গড়ে তোলার বিষয়টিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। এর পাশাপাশি অন্য কোনো কৌশলগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে সেটি হবে দ্বিতীয় লক্ষ্য। বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলো বিগ-বি উদ্যোগে একসঙ্গে যুক্ত হলে তা সবার জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল হাসান বলেন, বাংলাদেশের পক্ষে পুরো বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব না হলেও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তবে সে ভূমিকা পালনের জন্য উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। আঞ্চলিক সংহতির বিষয়টি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা রয়েছে।
জাপান সফরে অর্থনৈতিক অর্জনের পাশাপাশি কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল হাসানের মতে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি জাপানের সমর্থন আদায় সফরের অন্যতম বড় অর্জন।
কামরুল হাসান বলেন, কী প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গারা পূর্ণ নাগরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে মিয়ানমারে ফিরে যাবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়েছে জাপান।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ও সহায়তার আশ্বাস পাওয়া গেলেও শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জাপান হিসাব-নিকাশ করেই সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অনেকটাই নির্ভর করবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতি ও পরিবেশের ওপর।