
মসজিদুল হারামে জুমা পড়তে লাখো মুসল্লির ভিড়
মুফতি আবদুল্লাহ তামিম
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৪৮

ইসলামে বিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি। এটি শুধু হাসি-ঠাট্টা, বিনোদন কিংবা বন্ধুবান্ধবের সামনে মজা করার বিষয় নয়; বরং এর মাধ্যমে নারী-পুরুষের মধ্যে বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় এবং উভয়ের ওপর নানা অধিকার ও দায়িত্ব বর্তায়।
কিন্তু কখনো দেখা যায়, কয়েকজন বন্ধু একসঙ্গে বসে মজা করতে গিয়ে একজন ছেলে ও একজন মেয়েকে বলে, ‘তোমরা একে অপরকে বিয়ে করো।’ এরপর তারা বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণের বাক্য বলে, কয়েকজন বন্ধু সাক্ষী থাকে, এমনকি কেউ কেউ দেনমোহরের কথাও উল্লেখ করে। পরে সবাই হাসাহাসি করে বিষয়টিকে নিছক মজা বলে উড়িয়ে দেয়।
এখন প্রশ্ন হলো, এভাবে মজা করে বিয়ে করলে কি সত্যিই বিয়ে হয়ে যায়? নাকি মজা করার কারণে বিয়েটি কার্যকর হয় না? ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. মজা করে বিয়ে করলেও কি বিয়ে হয়ে যায়?
হ্যাঁ, ইসলামি শরিয়তের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ করা হলে, শুধু মজা করার কারণে সেই বিয়ে বাতিল হয়ে যায় না। হানাফি মাজহাবসহ চার মাজহাবের স্বীকৃত ফিকহি আলোচনায় এ মূলনীতি পাওয়া যায়।
এর পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস রয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
ثَلَاثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ النِّكَاحُ وَالطَّلَاقُ وَالرَّجْعَةُ অর্থ: ‘তিনটি বিষয় এমন, যেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে করলে গুরুত্বের সঙ্গে কার্যকর হয় এবং ঠাট্টা করে করলেও কার্যকর হয়। সেগুলো হলো বিয়ে, তালাক ও তালাকের পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া।’
সূত্র: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২১৯৪; জামে তিরমিজি, হাদিস ১১৮৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২০৩৯।
এই হাদিসের শিক্ষা হলো, কিছু বিষয়ে কথার পরিণতি এতটাই গুরুতর যে পরে ‘আমি তো মজা করেছি’ বললেই তা অকার্যকর হয়ে যায় না।
ধরা যাক, একজন ছেলে একজন মেয়েকে বলল, ‘আমি তোমাকে বিয়ে করলাম।’ মেয়েটি বলল, ‘আমি তোমার বিয়ে গ্রহণ করলাম।’ সেখানে শরিয়তসম্মত সাক্ষী উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁরা উভয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ স্পষ্টভাবে শুনেছেন। উভয়েই বিয়ের উপযুক্ত এবং অন্য কোনো শরয়ি বাধা নেই।
এ অবস্থায় তারা পরে যদি বলে, ‘আমরা তো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মজা করছিলাম’, শুধু এ কথা বলার কারণে বিয়ে বাতিল হবে না।
তবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি হাসি-ঠাট্টা, কথোপকথন কিংবা ‘তোমাকে বিয়ে করব’ বলাই বিয়ে নয়। কথার ধরন, প্রস্তাব ও গ্রহণের প্রকৃতি, সাক্ষীর উপস্থিতি এবং অন্যান্য শর্ত যাচাই করতে হবে।
২. বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার জন্য কী কী বিষয় প্রয়োজন?
হানাফি মাজহাবের আলোকে বিষয়টি বুঝতে কয়েকটি শর্ত জানা প্রয়োজন। প্রথমত, বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ হতে হবে।বিয়ের চুক্তি বোঝায় এমন স্পষ্ট বাক্যে একজন প্রস্তাব দেবেন এবং অন্যজন তা গ্রহণ করবেন। যেমন, বিয়ের প্রস্তাবের পর অপর পক্ষের সম্মতি প্রকাশ করা। কেবল ‘তোমাকে আমার ভালো লাগে’, ‘তোমাকে বিয়ে করব’ কিংবা ভবিষ্যতে বিয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করলেই সাধারণভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায় না।
দ্বিতীয়ত, শরিয়তসম্মত সাক্ষী থাকতে হবে। হানাফি ফিকহে সাধারণভাবে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষীর উপস্থিতি প্রয়োজন। তাঁদের বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ শুনতে হবে এবং চুক্তিটি বুঝতে হবে।
সুতরাং, কয়েকজন বন্ধু সাক্ষী হিসেবে বসে থাকলে এবং তাঁরা প্রস্তাব ও গ্রহণ শুনলে, শুধু ঘটনাটি মজার ছলে ঘটেছে—এ কারণে সাক্ষ্য অকার্যকর হয়ে যায় না।
তৃতীয়ত, বর-কনে বিয়ের উপযুক্ত হতে হবে। তাঁদের মধ্যে এমন কোনো শরয়ি বাধা থাকা চলবে না, যার কারণে তাঁদের পরস্পরকে বিয়ে করা বৈধ নয়। যেমন, নিকটাত্মীয়তার কারণে নিষিদ্ধ সম্পর্ক বা অন্য কোনো প্রাসঙ্গিক শরয়ি প্রতিবন্ধকতা।
চতুর্থত, বিয়ের চুক্তি করার আইনগত ও শরয়ি সক্ষমতা থাকতে হবে। ব্যক্তির পরিচয়, সম্মতি, বয়স, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করতে হবে। জবরদস্তি, অস্পষ্ট বক্তব্য, অভিনয় কিংবা কেবল ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলার ঘটনাকে প্রকৃত বিয়ের চুক্তির সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।
বিয়েতে অভিভাবকের ভূমিকা নিয়েও মাজহাবভেদে বিস্তারিত বিধান রয়েছে। হানাফি মাজহাবে প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন নারীর বিয়ের বিষয়ে নির্দিষ্ট শর্তে ভিন্ন বিধান থাকলেও অন্য মাজহাবগুলোতে অভিভাবকসংক্রান্ত শর্ত আরও কঠোর। তাই নির্দিষ্ট ঘটনা যাচাই না করে সাধারণ সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়।
৩. দেনমোহর নির্ধারণ না করলেও কি বিয়ে হয়ে যেতে পারে?
হ্যাঁ, দেনমোহরের পরিমাণ উল্লেখ না করলেই সব ক্ষেত্রে বিয়ে বাতিল হয়ে যায় না। হানাফি ফিকহে বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার পর দেনমোহর নির্ধারিত না থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী উপযুক্ত দেনমোহর বা মাহরে মিসল প্রাপ্য হতে পারে।
অর্থাৎ, বন্ধুরা মজা করে বিয়ের সময় দেনমোহর উল্লেখ করেনি এ যুক্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিয়েটি বাতিল বলা যাবে না।তবে বিয়ের চুক্তিই আদৌ সম্পন্ন হয়েছিল কি না, সেটি আগে যাচাই করতে হবে।
৪. বিয়ের পর তারা যদি বলে, ‘আমরা একে অপরকে স্বামী-স্ত্রী মনে করি না’?
এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুতর দিক। যদি শরিয়তসম্মতভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে সেটিকে অস্বীকার করা বা বন্ধুদের সামনে হাসাহাসি করা সেই বিয়েকে বাতিল করবে না। এ ক্ষেত্রে তারা শরিয়তের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য হতে পারেন। ফলে তাঁদের পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব, দাম্পত্য সম্পর্কের বৈধতা এবং বিচ্ছেদের বিধান প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে, যদি প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না হওয়ার কারণে বিয়ে আদৌ সম্পন্ন না হয়ে থাকে, তাহলে শুধু কিছু কথা বলার কারণে তাঁদের স্বামী-স্ত্রী বলা যাবে না। তাই কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপজ্জনক।
৫. এমন বিয়ে হয়ে গেলে এখন কী করণীয়?
যদি কোনো ছেলে ও মেয়ে সত্যিই বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ করে থাকে এবং শরিয়তসম্মত সাক্ষী উপস্থিত থাকেন, তাহলে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
প্রথমে তাঁদের উচিত, ঘটনাটি গোপন না রেখে নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে সম্পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরা। কী শব্দ বলা হয়েছিল, কে প্রস্তাব দিয়েছিল, কে গ্রহণ করেছিল, কারা সাক্ষী ছিলেন, সাক্ষীরা কী শুনেছিলেন এবং অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল কি না সবকিছু জানাতে হবে।
যদি বিয়ে সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী সিদ্ধান্তও সে অনুযায়ী নিতে হবে। তাঁরা একসঙ্গে সংসার করতে না চাইলে শরিয়তসম্মত বিচ্ছেদের বিধান অনুসরণ করতে হবে। আর যদি বিয়ে না হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে বিয়ে ধরে নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই।
নিজেদের সিদ্ধান্তে নতুন করে বিয়ে করা, তালাক দেওয়া কিংবা সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার আগে নির্দিষ্ট ঘটনাটি যাচাই করানোই নিরাপদ।
৬. বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিষয়টি কীভাবে দেখা হবে? শরিয়তের দৃষ্টিতে বিয়ে সংঘটিত হওয়া এবং বাংলাদেশের আইনে বিয়ের নিবন্ধন ও অন্যান্য আইনগত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়া দুটি সম্পর্কিত হলেও একেবারে একই প্রশ্ন নয়।
বাংলাদেশে মুসলিম বিয়ে নিবন্ধনের বিধান রয়েছে। ফলে এমন ঘটনা ঘটলে শুধু শরয়ি অবস্থাই নয়, নিবন্ধন, প্রমাণ এবং সম্ভাব্য আইনগত দায়দায়িত্বের বিষয়ও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে, কেউ যদি মজা করে বিয়ের কথা বলার পর তা অস্বীকার করে, তাহলে ভবিষ্যতে প্রমাণ, পারিবারিক অধিকার কিংবা অন্য কোনো আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে। সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনজীবী ও নির্ভরযোগ্য মুফতির পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৭. তাহলে কি বিয়ে নিয়ে কখনো মজা করা যাবে না? বিয়ে নিয়ে সাধারণ হাসি-ঠাট্টা, বিয়ের আয়োজন নিয়ে আলোচনা কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা আর বাস্তব বিয়ের চুক্তি সম্পন্ন করা এক বিষয় নয়।
কিন্তু এমন শব্দ উচ্চারণ করা, যা দিয়ে বাস্তব বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ সম্পন্ন হয়ে যেতে পারে, তা থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ, মানুষ অনেক সময় মনে করে সাক্ষী রেখে কয়েকটি বাক্য বললেও যেহেতু তাদের বিয়ের ইচ্ছা নেই, তাই কিছুই ঘটবে না। ইসলামী ফিকহের আলোচনায় এই ধারণা সঠিক নয়। বিয়ে কোনো খেলনা নয়। এর সঙ্গে মানুষের সম্মান, পরিবার, অধিকার এবং ভবিষ্যৎ জড়িত।
কয়েকজন সাক্ষী রেখে ছেলে ও মেয়ে যদি মজা করেও শরিয়তসম্মতভাবে বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ সম্পন্ন করে, তাহলে বিয়ে কার্যকর হয়ে যেতে পারে। পরে ‘আমরা মজা করেছি’ বললে তা নিজে থেকেই বাতিল হয় না। তবে শুধু বিয়ের কথা বলা, ভবিষ্যতে বিয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করা কিংবা অস্পষ্টভাবে ‘কবুল’ বলা এসব ঘটনাকে একই বিধানের আওতায় ফেলা যাবে না। বাস্তব ঘটনা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো, মজা করে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর, তালাক না হওয়া পর্যন্ত এ নারীকে অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে দিলে বিয়ে সঠিক হবে না। এ বিষয়ে অবশ্যই মুফতি সাহেবের কাছে যেতে হবে।