
হজের প্রস্তুতি যেভাবে নেবেন
মুফতি জাকারিয়া হারুন
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:১০

মসজিদে আকসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঈমানের ইতিহাস, নবীদের স্মৃতি আর একটি উম্মাহর আত্মপরিচয়। মসজিদে আকসার প্রতি ভালোবাসা, মর্যাদা উপলব্ধি করা এবং এর সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলাও আমাদের দায়িত্ব।
আসুন, পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে জেনে নিই মসজিদে আকসার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত ও তাৎপর্য...
১. পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রাচীনতম মসজিদ
মসজিদে আকসার ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। মসজিদে হারামের পরই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই মসজিদ। হজরত আবু জর (রা.) রসুলুল্লাহ সা.-কে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত মসজিদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি মসজিদে হারামের কথা বলেন। এরপর কোনটি-- জিজ্ঞাসা করলে বলেন, মসজিদে আকসা।
عَنْ أَبِي ذَرٍّ، قَالَ: قُلْتُ يَا رَسُولَ اللهِ، أَيُّ مَسْجِدٍ وُضِعَ فِي الْأَرْضِ أَوَّلُ؟ قَالَ: «الْمَسْجِدُ الْحَرَامُ». قُلْتُ: ثُمَّ أَيٌّ؟ قَالَ: «الْمَسْجِدُ الْأَقْصَى قُلْتُ: كَمْ بَيْنَهُمَا؟ قَالَ: أَرْبَعُونَ سَنَةً
অর্থ: হজরত আবু জর (রা.) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রসুল! পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? তিনি বললেন, মসজিদে হারাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এরপর কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদে আকসা। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ দুটির মধ্যে কত বছরের ব্যবধান? তিনি বললেন, চল্লিশ বছর। (বুখারি, হাদিস ৩৩৬৬; মুসলিম, হাদিস ৫২০)
২. বরকতময় মসজিদ ও পবিত্র ভূমি
মসজিদে আকসার বিশেষ মর্যাদা হলো-- মহান আল্লাহ এই মসজিদ ও এর আশপাশের অঞ্চলকে বরকতময় ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইসরা বা রাতের সফরের বিবরণ দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ এ ভূমির বরকতের কথা উল্লেখ করেছেন।
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
অর্থ: পবিত্র সেই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের একটি অংশে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসায় নিয়ে গেছেন, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাঁকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ১)
৩. ইসলামের তৃতীয় মর্যাদাপূর্ণ মসজিদ
মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববীর পরই মসজিদে আকসার অবস্থান। ইসলামে এই তিন মসজিদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। রসুলুল্লাহ সা. এই তিন মসজিদের উদ্দেশে সফরের বিশেষ গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
لَا تُشَدُّ الرِّحَالُ إِلَّا إِلَى ثَلَاثَةِ مَسَاجِدَ: الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ، وَمَسْجِدِ الرَّسُولِ ﷺ، وَالْمَسْجِدِ الْأَقْصَى
অর্থ: তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো মসজিদের উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে সফর করা উচিত নয়-- মসজিদে হারাম, আমার এই মসজিদ (মসজিদে নববী) এবং মসজিদে আকসা। (বুখারি, হাদিস ১১৮৯; মুসলিম, হাদিস ১৩৯৭)
৪. মুসলিম উম্মাহর প্রথম কেবলা
ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলিমদের কেবলা ছিল বাইতুল মাকদিস। মদিনায় হিজরতের পরও প্রায় ১৬ থেকে ১৭ মাস মুসলিমরা সেদিকে ফিরে নামাজ আদায় করেছেন। পরে আল্লাহর নির্দেশে কেবলা পরিবর্তন করে কাবাঘরের দিকে করা হয়।
كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُصَلِّي نَحْوَ بَيْتِ الْمَقْدِسِ ... وَبَعْدَ مَا هَاجَرَ إِلَى الْمَدِينَةِ سِتَّةَ عَشَرَ شَهْرًا، ثُمَّ صُرِفَ إِلَى الْكَعْبَةِ
অর্থ: রসুলুল্লাহ সা. বাইতুল মাকদিসের দিকে ফিরে নামাজ আদায় করতেন। মদিনায় হিজরতের পরও ষোলো মাস এভাবে নামাজ আদায় করেছেন। এরপর কাবার দিকে কেবলা পরিবর্তন করা হয়। (সূত্র: মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৯৯১; বুখারি, হাদিস ৪০; মুসলিম, হাদিস ৫২৫)
৫. ইসরা ও মেরাজের স্মৃতিবিজড়িত মসজিদ
মসজিদে আকসার অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাৎপর্য হলো, মহানবী সা.-এর ইসরা ও মেরাজের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক। মেরাজের ঊর্ধ্বযাত্রার আগে তিনি মসজিদে আকসায় উপস্থিত হন এবং সেখানে নবীদের ইমামতি করেন। এটি নবীদের অভিন্ন দাওয়াত ও মর্যাদার এক অনন্য স্মারক।
ثُمَّ دَخَلْتُ بَيْتَ الْمَقْدِسِ فَجُمِعَ لِيَ الْأَنْبِيَاءُ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ فَقَدَّمَنِي جِبْرِيلُ حَتَّى أَمَمْتُهُمْ
অর্থ: অতঃপর আমি বাইতুল মাকদিসে প্রবেশ করলাম। সেখানে আমার জন্য সব নবীকে একত্র করা হলো। জিবরাইল (আ.) আমাকে সামনে এগিয়ে দিলেন, এরপর আমি তাঁদের ইমামতি করলাম। (নাসায়ি, হাদিস : ৪৪৯)
৬. হাশর ও পুনরুত্থানের ভূমি
বাইতুল মাকদিসের গুরুত্ব আখিরাতের আলোচনাতেও উঠে এসেছে। হজরত মাইমুনা (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে রসুলুল্লাহ সা. বাইতুল মাকদিসকে হাশর ও পুনরুত্থানের ভূমি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই বর্ণনায় সেখানে গিয়ে নামাজ আদায়ের প্রতিও উৎসাহ দেয়া হয়েছে।
هُوَ أَرْضُ الْمَحْشَرِ وَالْمَنْشَرِ، ائْتُوهُ فَصَلُّوا فِيهِ
অর্থ: এটি হাশর ও পুনরুত্থানের ভূমি। তোমরা সেখানে যাও এবং সেখানে নামাজ আদায় করো। (মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস ৭০৮৮)
৭. জিয়ারতকারীর জন্য ক্ষমার বিশেষ সুসংবাদ
হজরত সুলাইমান (আ.) বাইতুল মাকদিস নির্মাণের কাজ শেষ করে আল্লাহর কাছে তিনটি দোয়া করেছিলেন। এর একটি ছিল-- যে ব্যক্তি কেবল নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে এই মসজিদে আসবে, আল্লাহ যেন তাকে গুনাহমুক্ত করে ফিরিয়ে দেন। রসুলুল্লাহ সা. আশা প্রকাশ করেছেন, আল্লাহ তাঁর এই দোয়াটিও কবুল করেছেন।
وَأَلَّا يَأْتِيَ هَذَا الْمَسْجِدَ أَحَدٌ، لَا يُرِيدُ إِلَّا الصَّلَاةَ فِيهِ، إِلَّا خَرَجَ مِنْ ذُنُوبِهِ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ
অর্থ: যে ব্যক্তি কেবল এই মসজিদে নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে আসবে, সে যেন সেদিনের মতো গুনাহমুক্ত হয়ে ফিরে যায়, যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছেন। (নাসায়ি, হাদিস ৬৯২; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৪০৮)
৮. মসজিদে আকসায় নামাজের বিশেষ সওয়াব
মসজিদে আকসায় নামাজ আদায়ের ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে বিশেষ সওয়াবের কথা বর্ণিত হয়েছে। উদ্ধৃত একটি বর্ণনায় মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী ও বাইতুল মাকদিসের নামাজের সওয়াবের তুলনা করা হয়েছে।
الصَّلَاةُ فِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ بِمِائَةِ أَلْفِ صَلَاةٍ، وَالصَّلَاةُ فِي مَسْجِدِي بِأَلْفِ صَلَاةٍ، وَالصَّلَاةُ فِي بَيْتِ الْمَقْدِسِ بِخَمْسِمِائَةِ صَلَاةٍ
অর্থ: মসজিদে হারামে এক নামাজ এক লাখ নামাজের সমতুল্য, আমার মসজিদে (মসজিদে নববীতে) এক নামাজ এক হাজার নামাজের সমতুল্য এবং বাইতুল মাকদিসে এক নামাজ পাঁচ শ নামাজের সমতুল্য। (মুসনাদে বাযযার, হাদিস ৪২২; শুআবুল ঈমান, হাদিস ৩৮৪৫)
৯. বাইতুল মাকদিসের সান্নিধ্যে বসবাসের মর্যাদা
বাইতুল মাকদিসের নিকটবর্তী স্থানে বসবাসের আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কেও হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। হজরত আবু জর (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, এমন সময় আসবে, যখন বাইতুল মাকদিস দেখা যায়-- এমন সামান্য জমিও মানুষের কাছে সমগ্র দুনিয়ার চেয়ে উত্তম মনে হবে।
وَلَيُوشِكَنَّ أَنْ يَكُونَ لِلرَّجُلِ مِثْلُ شَطَنِ فَرَسِهِ مِنَ الْأَرْضِ، حَيْثُ يَرَى مِنْهُ بَيْتَ الْمَقْدِسِ، خَيْرٌ لَهُ مِنَ الدُّنْيَا جَمِيعًا
অর্থ: অচিরেই এমন সময় আসবে, যখন কোনো ব্যক্তি বাইতুল মাকদিস দেখা যায়-- এমন সামান্য জমি পেলেও তা তার কাছে সমগ্র দুনিয়ার চেয়ে উত্তম হবে। (মুসতাদরাকে হাকেম, ৪/৫০, হাদিস ৮৫৫৩; আলমুজামুল আওসাত)
১০. সত্যের ওপর অবিচল মুমিনদের অবস্থানস্থল
বাইতুল মাকদিস ও এর আশপাশের অঞ্চলে এমন একদল মানুষের উপস্থিতির কথা হাদিসে এসেছে, যারা সত্যের ওপর অবিচল থাকবে। বিরোধিতা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা নিজেদের দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।
لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الدِّينِ ظَاهِرِينَ لِعَدُوِّهِمْ قَاهِرِينَ ... قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، وَأَيْنَ هُمْ؟ قَالَ: بِبَيْتِ الْمَقْدِسِ وَأَكْنَافِ بَيْتِ الْمَقْدِسِ
অর্থ: আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং শত্রুদের মোকাবিলায় অবিচল থাকবে। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রসুল! তারা কোথায় থাকবে? তিনি বললেন, বাইতুল মাকদিস ও এর আশপাশে। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২২৩২০; আলমুজামুল কাবীর, হাদিস ৭৬৪৩)