
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ’ ফজিলত ও ব্যাখ্যা
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:০

আকাশে চক্কর কাটছে একঝাঁক শকুন। দূর থেকে দৃশ্যটি চোখে পড়তেই কারও মনে জাগে অজানা আশঙ্কা, কেউ আবার একে অমঙ্গলের পূর্বাভাস বলে মনে করেন। লোকবিশ্বাসের এমন নানা ধারণায় শকুন যেন বহুদিন ধরেই মানুষের ভয়ের প্রতীক। অথচ প্রকৃতির দিকে একটু গভীরভাবে তাকালেই দেখা যায়, যে পাখিকে আমরা অশুভ বলে দূরে সরিয়ে রাখি, পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে সেই পাখিরই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কুসংস্কারের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে তার উপকারিতা, আর মানুষের ভুল ধারণার ভারে বিপন্ন হয়েছে প্রকৃতির এই নীরব কর্মী।
শকুন প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী। মৃত প্রাণীর দেহ খেয়ে সে পরিবেশ থেকে দ্রুত পচনশীল জৈব পদার্থ সরিয়ে ফেলতে সাহায্য করে। শকুনের পরিপাকতন্ত্র অনেক ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে বিশেষভাবে কার্যকর। ফলে মৃত প্রাণীর দেহ থেকে রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতেও তার ভূমিকা রয়েছে। প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে শকুনের এই অবদান নীরব, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার অনুপস্থিতিতে মৃত প্রাণীর দেহ পড়ে থাকার সময় বাড়তে পারে, আর কিছু অঞ্চলে শকুনের সংখ্যা কমে যাওয়ার সঙ্গে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি ও জলাতঙ্কের ঝুঁকির সম্পর্কও গবেষণায় উঠে এসেছে।
কিন্তু মানুষের কুসংস্কার আর অবহেলা শকুনের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় দক্ষিণ এশিয়ায় শকুনের সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল গবাদিপশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডাইক্লোফেনাক নামের একটি ওষুধ। ওষুধটির অবশিষ্টাংশ থাকা মৃত পশুর দেহ খেয়ে বিপুলসংখ্যক শকুন মারা যায়। পাশাপাশি খাদ্যের সংকট, আবাসস্থল হারানো এবং পরিবেশদূষণও তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। অর্থাৎ যে পাখিকে আমরা অমঙ্গলের প্রতীক ভেবে ভয় পাই, তার অস্তিত্বই আজ মানুষের সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর নির্ভর করছে।
শকুনকে ঘিরে প্রচলিত কুসংস্কার সম্পর্কে ইসলামের শিক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম অযৌক্তিকভাবে কোনো প্রাণী, ঘটনা বা সময়কে অমঙ্গলের কারণ মনে করতে নিরুৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “কুলক্ষণ গ্রহণ করা শিরক।” হাদিসটি সুনানে আবু দাউদসহ হাদিসের গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এর মর্ম হলো, কোনো পাখির উপস্থিতি বা ডাককে নিজের ভাগ্য, বিপদ কিংবা ভবিষ্যৎ ঘটনার নিয়ন্ত্রক মনে করা ইসলামের বিশ্বাসের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
কল্যাণ-অকল্যাণের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব আল্লাহরই
তবে মানুষের প্রচলিত প্রতিটি ভুল ধারণাকে না বুঝে একইভাবে ধর্মীয় পরিভাষায় বিচার করাও সমীচীন নয়। বরং প্রয়োজন মানুষকে সঠিক বিশ্বাসের শিক্ষা দেওয়া, কুসংস্কারের অসারতা বোঝানো এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করা। কোনো প্রাণীকে ঘিরে অমূলক ভয় ছড়িয়ে দেওয়া যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি নিষ্ঠুর আচরণও কাম্য হতে পারে না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “পৃথিবীতে বিচরণশীল এমন কোনো প্রাণী নেই এবং ডানা দিয়ে উড়ে এমন কোনো পাখি নেই, যারা তোমাদের মতো একেকটি জাতি নয়।” (সুরা আল-আনআম, আয়াত ৩৮)। আয়াতটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, পৃথিবীর প্রাণিজগৎও আল্লাহর সৃষ্টির এক বিস্তৃত ব্যবস্থার অংশ। মানুষের চোখে কোনো প্রাণী যতই তুচ্ছ বা অপ্রিয় মনে হোক, প্রকৃতিতে তার ভূমিকা থাকতে পারে অনন্য।
শকুন রক্ষায় তাই শুধু আবেগ নয়, প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগ। পশুচিকিৎসায় শকুনের জন্য ক্ষতিকর ওষুধের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ বিকল্প নিশ্চিত করা, প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ধর্মীয় আলোচনা ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে শকুনের প্রকৃত পরিচয়। কুসংস্কারের জায়গায় বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান এবং অবহেলার জায়গায় দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই এই পাখির অস্তিত্ব রক্ষার পথ আরও সুগম হবে।
শকুন অমঙ্গলের বার্তাবাহক নয়; সে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় নিয়োজিত এক নীরব সহচর। তাকে ভয় নয়, বুঝতে হবে; তাড়িয়ে দেওয়া নয়, রক্ষা করতে হবে। যে সমাজ কুসংস্কারের অন্ধকার ভেদ করে সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে সচেতন ও মানবিক হয়ে ওঠে। শকুনের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তাই শুধু একটি পাখিকে বাঁচানোর প্রশ্ন নয়, বরং জ্ঞান, বিশ্বাস ও প্রকৃতির প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা।
লেখক: কলামিস্ট | আলেম | কৃষি উদ্যোক্তা