
অর্থনীতিতে নোবেল পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড
ফয়সাল হাসান
প্রকাশ: সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:১২

সানায় সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে হুতি সমর্থকদের আয়োজিত এক সমাবেশে একটি ব্যানারে লেখা- ‘সৌদি আরবের সমস্ত তেল স্থাপনা আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু’। ছবি: সংগৃহীত
ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের একের পর এক ঢেউয়ের মাধ্যমে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানছে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী। সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে হুতিরা রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে একাধিকবার লক্ষ্যবস্তু করেছে, যা কোনোভাবেই ঠেকাতে পারছে না সৌদি কর্তৃপক্ষ।
গেল শনিবার (১০ অক্টোবর) সৌদির বিমানবন্দরে চালানো এক হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হয়েছেন; গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে দেশটিতে এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। এর ফলে সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কার্যক্রম স্থগিত ও সব ফ্লাইট অন্য গন্তব্যে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের নাগরিকদের জন্য নতুন ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে।
হুতিরা এই সপ্তাহের শুরুর দিকে বিমান চলাচলের ওই কেন্দ্রটিতে আরও দুটি হামলার দাবি করেছে এবং রোববার (১১ অক্টোবর) সৌদি বিমানবন্দরগুলো এড়িয়ে চলার জন্য মানুষকে সতর্ক করেছে।
হুতির অস্ত্রভাণ্ডার
সৌদি আরবের রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী, যার মধ্যে আছে অত্যাধুনিক ও বহু-স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
গত এক সপ্তাহে সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো ইয়েমেনজুড়ে হুতি অবস্থানগুলোর ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। রিয়াদের সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটির সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা রুখে দেওয়ার লক্ষ্যেই এসব হামলা চালানো হয়।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে সরকারের কাছ থেকে সানা’র নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নেওয়ার পর থেকে হুতিদের নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডার অনেক দূর এগিয়েছে।
তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইল পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং তাদের লক্ষ্যভেদের নিখুঁত সক্ষমতা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, এগুলো সৌদি বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনার মতো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
হুতিদের অস্ত্রশস্ত্র, তাদের কৌশল পরিবর্তনের ধরন এবং কেন সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হিমশিম খাচ্ছে, সেসব বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো–
হুতিদের অস্ত্রভাণ্ডার কতটা উন্নত?
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার জন্য ঠিক কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে তা জানা যায়নি; তবে ২০১৫ সালে সৌদি আরব সামরিক হস্তক্ষেপ শুরুর পর থেকে হুতিরা দেশটিকে লক্ষ্য করে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এছাড়া, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় গণহত্যা শুরুর পর থেকে ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি ইসরাইল এবং ইসরাইলের সাথে সংশ্লিষ্ট বলে কথিত বিভিন্ন জাহাজকেও লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।
এই গোষ্ঠীটি আকাশ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন গতির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত ব্যবহারও করেছে। এই একই কৌশল ইয়েমেনের স্থলযুদ্ধেও প্রভাব ফেলেছে; গত মাসে দ্রুতগতির এক অভিযানের মাধ্যমে লোহিত সাগরের উপকূল দখলের আগে হুতিরা কয়েক সপ্তাহ ধরে সরকারি অবস্থানগুলোর ওপর ব্যাপক হামলা চালায়।
হুতিদের হাতে থাকা অত্যন্ত উন্নত মানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ফিলিস্তিন-২’ (Palestine-2)– এটি দ্বিতীয়-পর্যায়ের একটি কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র, যার পাল্লা ২,০০০ কিলোমিটার এবং এতে হাইপারসনিক সক্ষমতা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
আরেকটি হলো ‘তুফান’ (Toufan); এটি মূলত ইরানের ‘কদর’ ক্ষেপণাস্ত্রেরই ভিন্ন নামে পরিচিত সংস্করণ বলে মনে করা হয় এবং এর পাল্লা ১,৩৫০ থেকে ১,৯৫০ কিলোমিটারের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়।
এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর— যার কয়েকটিতে ক্লাস্টার ওয়ারহেড রয়েছে— পাল্লা ইয়েমেন থেকে প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করার সুযোগ করে দিয়েছে হুতিদের।
হুতিদের কাছে ‘বুরকান’ ও ‘বদর’ সিরিজের মতো বেশ কিছু স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। ধারণা করা হয়, এগুলোর উৎস ইরান এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তরে আন্তঃসীমান্ত হামলায় এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।
কিংস কলেজের ওয়ার স্টাডিজ বিভাগের সিনিয়র ফেলো নাওয়াফ ওবাইদের মতে, হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার মূলত ইরানি অস্ত্রশস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং এতে চীনা প্রযুক্তিরও কিছু প্রভাব রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘হুতিরা উল্লেখযোগ্য কোনো নিজস্ব প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের খুব কম প্রমাণই দেখিয়েছে। তাদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা মূলত কিছু সাধারণ মানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।’
এছাড়া গত মাসে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী অভিযোগ করে যে, ‘লোইটারিং ক্রুজ মিসাইল’-এর মতো নতুন সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে হুতিরা ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর সহায়তা পাচ্ছে।
সৌদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেন তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে?
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে তাদের বাহিনী বেশ কয়েকটি প্রজেক্টাইল ভূপাতিত করেছে; এর মধ্যে বৃহস্পতিবার রাজধানী লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ছিল। তবে শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আঘাত হানা প্রজেক্টাইলটিকে তারা আটকাতে ব্যর্থ হয়েছে।
নাওয়াফ ওবায়েদ আল জাজিরাকে বলেছেন, সৌদি আরবের বিশাল আয়তন এবং ইয়েমেনের সাথে এর দীর্ঘ সীমান্তের কারণে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মাঝেমধ্যে ভেদ হওয়ার ঘটনা ঘটাটাই স্বাভাবিক।
প্রতিটি সফল হামলার বিপরীতে হুতিদের চালানো বহু সংখ্যক হামলা ব্যর্থ করে দেওয়া হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বহু-স্তরের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, কোনো না কোনোটি ঠিকই তা ভেদ করে বেরিয়ে আসবে।’
নিরাপত্তা নীতি ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুসতাই আল-জাজিরাকে বলেছেন, সৌদি আরবের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো ইরানের দিক থেকে আসা হুমকি মোকাবিলা করা।
তবে হুতিদের হামলার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তিনি মনে করেন, সৌদিরা সম্ভবত তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু অংশ ইয়েমেনের দিকে সরিয়ে নিচ্ছে।
এর পাশাপাশি ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিহতকারী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদের বিষয়টিও রয়েছে। সৌদি আরব এবং সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মিত্রদের অনেকেই‘প্যাট্রিয়ট’ (Patriot) ও ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুদ নিয়ে হিমশিম খেয়েছে। ইরানের সাথে সংঘাতের শুরুর দিকের মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দ্রুতগতিতে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ব্যবহার করে ফেলেছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে রিয়াদ বেশ কয়েকটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের সাথে যোগাযোগ করেছিল, যাতে হুতিদের হামলার বিরুদ্ধে সুরক্ষায় সহায়তা হিসেবে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা অন্যান্য সহায়তা মোতায়েন করা যায়।
সীমাবদ্ধতা
হুতিরাও নানাবিধ কঠিন সীমাবদ্ধতার মধ্যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। গোষ্ঠীটি জাতিসংঘের আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সৌদি আরবের দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের মুখে রয়েছে এবং একই সঙ্গে ইয়েমেনজুড়ে একাধিক রণাঙ্গনে লড়াই করছে।
ওবায়েদ বলেন, ‘সামরিক দিক থেকে সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোট সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও, সৌদি আরবের ওপর মাঝেমধ্যে হামলা চালিয়ে হুথিরা এখনও খবরের শিরোনামে উঠে আসতে সক্ষম। বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক এবং জি-২০ ভুক্ত একটি অর্থনীতি হিসেবে সৌদি আরব এমন কিছু বৈশ্বিক দায়িত্ব বহন করে, যার ফলে এ ধরনের হামলাগুলো অত্যধিক গুরুত্ব ও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।’
হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের সঠিক আকার অজানা থাকায়, সৌদি আরবের ওপর ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি একই সময়ে তীব্র স্থলযুদ্ধে লিপ্ত থাকার—যেখানে ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে আসছে—তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ওবায়েদের ভাষ্য, ইয়েমেনে সৌদি আরবের বিমান অভিযান মূলত ওই গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা এবং ড্রোন তৈরির কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার ওপর জোর দিয়ে চালানো হয়েছে। এই অভিযান হুতিদের সামরিক সক্ষমতার ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে বলেও দাবি তার।
পুজতাই আল-জাজিরাকে বলেছেন, হুতিদের হাতে সম্ভবত এখন কেবল সীমিত সংখ্যক স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রই অবশিষ্ট রয়েছে। এর অর্থ হলো, তারা ‘স্যাচুরেশন অ্যাটাক’ বা ব্যাপক মাত্রার আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা হারাবে, যেমনটি সৌদি আরবের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল, যেখানে লক্ষ্যবস্তুর ওপর একসঙ্গে বহুসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়।
এর পরিবর্তে, তারা অপেক্ষাকৃত কম সুরক্ষিত বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর একক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দিকে মনোযোগ দিতে পারে, যার উদ্দেশ্য হলো– ‘এই ধরনের হামলার কৌশলগত প্রভাব সর্বোচ্চ করা; এক্ষেত্রে বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যাহত করা’।
সূত্র: আল জাজির