
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু
মামুন শেখ
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:১৪

এডিস মশার প্রতীকী ছবি
মৌসুমের ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু। প্রতিদিনই আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ। বাড়ছে মৃত্যুও। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নভেম্বর নাগাদ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে— এত আয়োজনের পরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না কেন? এবার মৃত্যু এত বেশি হওয়ার কারণ কী? আর প্রাণহানি কমাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি?
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পূর্বাভাস মডেল বলছে, চলতি অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ থাকতে পারে। মশার ঘনত্ব, রোগীর সংখ্যা, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মতো বিষয় বিশ্লেষণ করে মডেলটি তৈরি করা হয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার ব্রুটো ইনডেক্স ২০ বা তার বেশি পাওয়া গেছে, যা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার ২৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশে মশার প্রজাতি, প্রজননস্থল, কামড়ানোর সময় ও কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার এবং তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনের (আইআরইএস) মাধ্যমে তিনি ও তার দল নিয়মিত ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে মশা ও লার্ভা সংগ্রহ করে ডেঙ্গুর প্রবণতা বিশ্লেষণ করেন।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, বিভিন্ন সূচক বিবেচনায় নিয়ে তৈরি পূর্বাভাস মডেলে দেখা যাচ্ছে, অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ থাকতে পারে। নভেম্বরে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনাও কম। তিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জায়গায় এডিস মশার ঘনত্বের সূচক—ব্রুটো ইনডেক্স—২০ বা তার বেশি রয়েছে। এই সূচক ২০ বা তার ওপরে থাকলে ওই এলাকায় এডিস মশাবাহিত রোগ, বিশেষ করে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে আমরা ধরে নিই।’
এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও হটস্পট ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, যেসব এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি বা রোগীর ক্লাস্টার রয়েছে, সেসব এলাকাকে কেন্দ্র করে সমন্বিত মশা ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চালাতে হবে। এর আওতায় প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভিসাইডিং ও ফগিং কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা গেলে বর্তমান পরিস্থিতিতেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাতে দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া একটি ভিডিও বার্তায় ডেঙ্গু মোকাবিলায় সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ৪ মিনিট ৫১ সেকেন্ডের ওই বার্তায় তিনি ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রত্যেক ব্যক্তি ও পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা সময় দিয়ে ঘরবাড়ি, আশপাশের এলাকা ও চলাচলের পথ পরিষ্কার করার অনুরোধ করেন।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগেও চলছে তিন মাসব্যাপী দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান। গত ১২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এ কর্মসূচি চলবে আগামী ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। প্রতি শনিবার বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি জমে থাকা পানি অপসারণ, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, কীটনাশক প্রয়োগ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ডেঙ্গু কর্নার সচল রাখা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত অনুমোদিত কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে সেগুলোর যথাযথ ব্যবহারের সুপারিশ করছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল, নজরদারি ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
এত আয়োজন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, কীটনাশক প্রয়োগ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের পরও ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না কেন? কেন বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি?
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, বাংলাদেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক কার্যক্রম চললেও সংক্রমণ কমছে না, বরং ধীরে ধীরে বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোকে লক্ষ্য করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন,
আমরা দেখছি, রাস্তাঘাট, ড্রেন, ডোবা ও নর্দমা পরিষ্কার করা হচ্ছে। সেখানে মশা নিয়ন্ত্রণের কাজও হচ্ছে। কিন্তু এসব জায়গায় মূলত কিউলেক্স মশা থাকে। অন্যদিকে, এডিস মশার প্রজননস্থল আমাদের বাসাবাড়ি ও আঙিনার বিভিন্ন ছোট-বড় পাত্রে জমে থাকা পানি।
অধ্যাপক কবিরুল বাশারের মতে, বাড়ির বেজমেন্ট, গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান, পানির ড্রাম, বালতি, চৌবাচ্চা এবং পাশাপাশি দুটি বাড়ির মধ্যবর্তী স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন হচ্ছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এসব জায়গায় কতটা কার্যকরভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শুধু রাস্তাঘাট, ড্রেন, ডোবা ও নর্দমায় ফগিং বা লার্ভিসাইডিং করলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য পূরণ হবে না।
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যনির্ভর পদ্ধতিতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। যেসব জায়গায় এডিস মশার প্রজনন হচ্ছে, সেগুলোকে কেন্দ্র করেই ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে মশা মরবে, হয়তো কিউলেক্স মশা মরবে; কিন্তু এডিস মশা মরবে না, ডেঙ্গুও কমবে না।’
এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা, নিয়মিত নজরদারি, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে বিচ্ছিন্ন পরিচ্ছন্নতা অভিযান বা নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগের পরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
এছাড়া কীটনাশকের কার্যকারিতা, নিয়মিত নজরদারি, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণের অভাবকেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পর্যন্ত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে ৩৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু অক্টোবর মাসেই প্রাণ গেছে ৮৬ জনের। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন বছরের সর্বোচ্চ ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। ওই মাসে মারা যান ১৪৮ জন।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে দ্রুত রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার মতো জটিলতা দেখা যাচ্ছে। এতে রোগীর অবস্থা দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে এবং বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি।
এবার ডেঙ্গুর লক্ষণেও ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জ্বর ও মাথাব্যথার পাশাপাশি বমি, তীব্র ডায়রিয়া এবং অন্যান্য জটিলতায় ভুগছেন অনেকে। ভাইরাসের সেরোটাইপের ভিন্নতার কারণে রোগীভেদে লক্ষণেও পার্থক্য দেখা দিতে পারে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার।
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিতে দেরি করার বিষয়টি সামনে এসেছে। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, জ্বরের লক্ষণ থাকলেই পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হবে, এমন নয়। কিছু রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পরও পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল পেতে পারেন। তাই পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ঈশিতা বিশ্বাস বলেন,
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনা করে অবহেলা ও অসচেতনতাকে বড় কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগী হাসপাতালে আসতে দেরি করেন। ফলে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁদের রক্তচাপ ও নাড়ির গতি কমে যায়। এমন অবস্থায় অনেকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
অধ্যাপক কবিরুল বাশারের মতে, সময়মতো রোগ শনাক্ত, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এ জন্য তিনি কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, অস্থিরতা বা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। জ্বর কমে যাওয়ার পরও ডেঙ্গুর জটিলতা দেখা দিতে পারে, তাই এ সময় বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকা উদ্ভাবনের গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনো সবার জন্য নির্বিচারে ব্যবহারের উপযোগী টিকা চালু হয়নি। বর্তমানে ডেঙ্গু প্রতিরোধে দুটি টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাক্যোগ্যতা (প্রিকোয়ালিফিকেশন) পেয়েছে। এগুলো হলো—সানোফি পাস্তুরের ডেঙ্গভ্যাক্সিয়া এবং জাপানের তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালসের কিউডেঙ্গা। এর মধ্যে কিউডেঙ্গা টিকাটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যবহারের সুপারিশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।।
ফরাসি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সানোফি পাস্তুরের তৈরি ডেঙ্গভ্যাক্সিয়া ছিল ডেঙ্গুর প্রথম অনুমোদিত টিকা। তবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হওয়া ব্যক্তিরা এই টিকা নিলে পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিকভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর গুরুতর অসুস্থতা ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টিকাটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত দিয়েছে। টিকা দেওয়ার আগে ব্যক্তির ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ, আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হননি—এমন কাউকে ডেঙ্গভ্যাক্সিয়া দেওয়া উচিত নয়। আগের সংক্রমণ নিশ্চিত করা এবং টিকা দেওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচন করার জটিলতার কারণে এর ব্যবহার সীমিত হয়ে পড়ে। বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ২০২৪ সালে সানোফি টিকাটির উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা দেয়।
জাপানের তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি কিউডেঙ্গা (TAK-003) ডেঙ্গুর দ্বিতীয় টিকা, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাক্যোগ্যতা পেয়েছে। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া তৈরির জন্য টিকাটি তৈরি করা হয়েছে। ডেঙ্গভ্যাক্সিয়ার মতো টিকা দেওয়ার আগে আগের ডেঙ্গু সংক্রমণ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করার প্রয়োজন হয় না।
তবে কিউডেঙ্গা সবার জন্য ব্যবহারের সুপারিশ করেনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও রোগের বোঝা বেশি, সেসব এলাকার ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের টিকাটি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকা চালুর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে কবে নাগাদ দেশে টিকা আসবে বা কবে থেকে টিকাদান শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকার বিষয়টিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে টিকার নিরাপত্তা, কার্যকারিতা ও বাংলাদেশের মানুষের জন্য এর উপযোগিতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের ভাইরোলজিস্ট ও পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গুর টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এখনো টিকা চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, দেশে ডেঙ্গুর টিকা চালুর বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ ও গ্যাভি—দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিতও ডেঙ্গু প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য টিকার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। সময় সংবাদকে তিনি বলেন, ‘আমাদের জনগণকে যদি ডেঙ্গু থেকে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দিতে হয়, তাহলে ভ্যাকসিন ব্যবহার করতে হবে। ফলে এখন যে ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিনগুলো আছে, সেগুলো থেকে যদি গবেষণা ও ট্রায়ালের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে তা জনগণের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল বয়ে নিয়ে আসবে।’
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করা প্রয়োজন, নাকি অন্যান্য দেশে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব—তা নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করবে সরকার।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানিয়েছেন, টিকা অনুমোদনের আগে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে এর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের শরীরে টিকাটি কতটা কার্যকর ও নিরাপদ হবে, তা বিবেচনায় নিতে হবে।
এ লক্ষ্যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও ভাইরাসবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ গবেষকদের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ওই আলোচনায় দেশে নতুন করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন কি না, নাকি আগে পরিচালিত নির্ভরযোগ্য গবেষণার ফলাফল সমন্বিত বিশ্লেষণের (মেটা-অ্যানালাইসিস) মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব, তা পর্যালোচনা করা হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গুর একাধিক টিকা নিয়ে গবেষণা চলছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, ভারত সম্প্রতি বেসরকারি পর্যায়ে ব্যবহারের জন্য একটি ডেঙ্গুর টিকা অনুমোদন করেছে। তবে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া ব্যাপকভাবে টিকা প্রয়োগের বিষয়ে সতর্ক করেছেন তিনি। তার মতে, টিকার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও ঝুঁকিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকা চালুর বিষয়ে আলোচনা এগোলেও এখনই গণটিকাদান কর্মসূচি শুরুর নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। টিকার নিরাপত্তা, কার্যকারিতা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য উপযোগিতা যাচাইয়ের পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।