
হামের উপসর্গে একদিনে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু
নাঈম হাসান
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪০

একই ধরনের বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ। ছবি: সময় সংবাদ
একই ধরনের ওষুধ, কিন্তু দামে বিস্তর ফারাক। কোনো কোম্পানি বিক্রি করছে ৩২ টাকা, কেউ আবার ৮ টাকায়। চিকিৎসকরা বলছেন, প্রস্তুতকারক ভিন্ন হলেও একই জেনেরিকের কার্যকারিতায় খুব বেশি পার্থক্য নেই। মান নিয়ে শঙ্কা নেই জানিয়ে ওষুধশিল্প সমিতি বলছে, দাম বাড়ে ব্র্যান্ডিংয়ের কারণে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতিমালা না থাকায় প্রতিনিয়ত ঠকছেন রোগীরা। সময়ের অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে ওষুধের বাজারের নৈরাজ্যের ভয়ংকর সেই চিত্র।
নিয়মিত হার্টের ওষুধ খান বেলাল। চিকিৎসক তাকে যে ওষুধটি প্রেসক্রিপশনে লিখেছেন, তার প্রতিটি ট্যাবলেটের মূল্য ৩২ টাকা। তবে একই জেনেরিকের ওষুধ ৮ টাকাতেও বিক্রি করে অন্যান্য কোম্পানি। আবার প্রেসক্রিপশনে লেখা ওষুধের বদলে কম দামের ওষুধ খেয়েও চালাচ্ছেন চিকিৎসা। এমন রোগীও কম নয়। তাহলে একই শ্রেণির দুই কোম্পানির ওষুধের দামে এত পার্থক্য কেন?
ডেলটা ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের ৯৫ থেকে ১০০ ভাগ কোম্পানি প্রায় একই ধরনের সোর্স থেকে আনে। আপনি যে ওষুধটি নিয়ে কথা বলছেন, সেটি আমার রপ্তানির পণ্য। বাংলাদেশে শুধু নয়, আমি বিদেশেও ওষুধ রপ্তানি করি।’
ওষুধশিল্প সমিতি বলছে, কোয়ালিটি নিয়ে নেই কোনো প্রশ্ন। দাম বাড়ছে ব্র্যান্ডিংয়ের কারণে।
ওষুধশিল্প সমিতির সহসভাপতি ও রেনাটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়সার কবির বলেন, ‘দাম বেশি রাখার মূল কারণ হচ্ছে ব্র্যান্ডিং। মুক্তবাজারে যা হয়, সেটাই। যে দেশে ব্র্যান্ডিং হবে যেকোনো পণ্যের, সেখানে দামের তারতম্য হবেই। কোন দেশ থেকে কাঁচামাল এসেছে, তার ওপর ভিত্তি করে দামের তারতম্য হয় না। “আমার কাঁচামাল ইউরোপ থেকে এসেছে”, এগুলো তাদের প্রমোশনাল টেকনিক। মূলত ওষুধশিল্পের অনেক কিছুর নির্দিষ্ট মান ঠিক করা আছে।’
বাজারের চিত্র হচ্ছে, নিয়মিত সেবন করতে হয় এমন অধিকাংশ ওষুধ একই জেনেরিকের। কিন্তু কোম্পানিভেদে দামের পার্থক্য দুই থেকে তিন গুণ। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনে যা লিখছেন, রোগী ফার্মেসি থেকে সেটাই কিনে নিচ্ছেন।
মেরোপেনাম একটি সংক্রমণনাশক ইনজেকশন। গায়ের মূল্য ১,৩০০-১,৪০০ টাকা। শাহবাগের এই ফার্মেসিতে ইনজেকশনটি বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকায়! প্রায় অর্ধেক দামে কীভাবে বিক্রি হচ্ছে ওষুধটি?
ওষুধ প্রশাসন বলছে, ওষুধের দামের পার্থক্য থাকলেও মান নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই। মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারি নীতিমালার অভাবকে দুষছেন পরিচালক।
ওষুধ প্রশাসনের পরিচালক আকতার হোসেন বলেন, ‘একই জেনেরিকের বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ ক্ষেত্রবিশেষে এর দামের পার্থক্য এত বেশি যে, সেখানে ক্রেতারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। কম দামি ওষুধ হলেই যে গুণগত মান খারাপ তা নয়। যত কম দামেই ওষুধ বিক্রি করুক না কেন, মান নিশ্চিতে আমাদের কঠোর মনিটরিং রয়েছে। ওষুধের দাম নির্ধারণে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার, যেটার ওপর সবার আস্থা থাকবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধ কোম্পানি থেকে চিকিৎসকদের উপঢৌকন দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করা উচিত। প্রশাসনের উদাসীনতাকেও দায়ী করছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেন, ‘প্রশ্ন হলো ওষুধ কোম্পানিগুলো কেন চিকিৎসকদের উপঢৌকন দেবে? কোনো রকম উপঢৌকন চিকিৎসকরা নিতে পারবেন না।’
বাংলাদেশ মেডিকেলের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সব কোম্পানি ভালো কাজ করে, উনিশ-বিশ কিছু হয়ই। তবে ওষুধের মূল্য সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। ওষুধের দামকে নীতিমালার মধ্যে নিয়ে আসা সরকারের দায়িত্ব।’
খুচরা বাজারে ওষুধের মূল্য নিয়ে কারসাজি প্রতিহত করতে সরকারকে কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
আমরা বাজারের সেরা ৩০টি ওষুধের কোম্পানির দামের পার্থক্যই দেখানোর চেষ্টা করেছি। সবারই দাবি, কোয়ালিটি নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তাহলে দামের এই পার্থক্য কেন? রোগীরাও ঠকছেন কেন? সেই প্রশ্ন রেখেই শেষ করতে চাই।