
নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে আন্দোলন কেন আধুনিক ভারতে নজিরবিহীন
ওমর ইনান
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:০৭
তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইপ এরদোয়ান। ছবি: রয়টার্স
পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তুরস্ক। কিন্তু একই সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতা, আর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন সামরিক জোট— সবকিছুই করছে আঙ্কারা। তাহলে তুরস্ক কি ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? নাকি ন্যাটোতে থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম—দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক রেখে নিজের প্রভাব বাড়াচ্ছে? সম্প্রতি এরদোয়ানই বলেছেন, তুরস্ককে পূর্ব অথবা পশ্চিম—কোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা উচিত নয়। তাহলে ঠিক কোন কৌশলে এগোচ্ছেন তিনি? কেন রাশিয়া-চীন-সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে তুরস্ক? আর এই নীতিতে লাভটাই বা কোথায়?
তুরস্ক ১৯৫২ সাল থেকেই ন্যাটোর সদস্য। সামরিক সক্ষমতার দিক থেকেও জোটটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ এটি। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মাঝখানে তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থানও ন্যাটোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গত কয়েক বছরে আঙ্কারার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট—শুধু পশ্চিমের ওপর নির্ভর করে থাকতে চায় না তুরস্ক। এরদোয়ানের ভাষায়, বিশ্ব রাজনীতিকে শুধু পূর্ব বনাম পশ্চিম—এই দুই ভাগে দেখার সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। ২৫ সেপ্টেম্বরও তিনি বলেন, তুরস্ককে পূর্ব কিংবা পশ্চিমের মধ্যে একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা ঠিক নয়। একই সঙ্গে তিনি ন্যাটোর প্রতি তুরস্কের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন। অর্থাৎ, আঙ্কারার কৌশলটা অনেকটা—জোটে থাকবে, কিন্তু নিজের জন্য বিকল্পও তৈরি করবে।
তুরস্ক ও রাশিয়ার সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়। ন্যাটোর সদস্য হয়েও রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করেনি তুরস্ক। বরং ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও মস্কো ও কিয়েভ—দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রেখে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে আঙ্কারা। রাশিয়া তুরস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি কারণে—জ্বালানি। তুরস্কের জ্বালানি নিরাপত্তায় রাশিয়া বড় সরবরাহকারী। ফলে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে ফেলা আঙ্কারার জন্য অর্থনৈতিকভাবেও কঠিন।
আবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনা। এই সিদ্ধান্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কে বড় টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ ন্যাটোর সদস্য হয়েও রাশিয়ার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কেনার সিদ্ধান্তই দেখিয়ে দেয়—আঙ্কারা নিজের কৌশলগত স্বাধীনতার জায়গাটা কতটা গুরুত্ব দেয়।
শুধু রাশিয়া নয়, তুরস্কের নজর এখন চীনের দিকেও। চীন বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক শক্তি। আর তুরস্ক ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান করায় চীনের বাণিজ্য ও পরিবহন পরিকল্পনায় দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব আছে। তুরস্ক চায় এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে এবং পরিবহন করিডোরের মাধ্যমে ইউরোপের বাজারের সঙ্গে নিজেকে আরও শক্তভাবে যুক্ত করতে।
অর্থাৎ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক নয় এর পেছনে আছে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো এবং ইউরেশিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থায় তুরস্কের অবস্থান শক্ত করার হিসাব। আর এ কারণেই পশ্চিমা জোটের সদস্য হয়েও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে আপত্তি দেখাচ্ছে না আঙ্কারা।
সৌদি-পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন জোট কেন?
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ এসেছে মধ্যপ্রাচ্যে। ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান স্বাক্ষর করেছে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কাঠামোটিকে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। শুধু কাগজে-কলমে চুক্তি নয়। তিন দেশ যৌথ সামরিক মহড়া, প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা, প্রযুক্তি বিনিময় এবং যৌথ উন্নয়ন ও উৎপাদনের পরিকল্পনাও করছে।
বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক সক্ষমতায়। এখানেই তুরস্কের কৌশলটি আরও পরিষ্কার হয়। ন্যাটোতে তুরস্কের একটি নিরাপত্তা কাঠামো আছে। কিন্তু একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের নেতৃত্বে আরেকটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোও গড়ে তুলছে আঙ্কারা।
ন্যাটো ছেড়ে দেবে তুরস্ক?
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এখন পর্যন্ত তুরস্ক ন্যাটো ছাড়ার কোনো ঘোষণা দেয়নি। বরং এরদোয়ান প্রকাশ্যেই ন্যাটোর প্রতি তুরস্কের অঙ্গীকারের কথা বলেছেন। তাই তুরস্কের বর্তমান নীতিকে সরাসরি ‘পশ্চিমবিরোধী’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। বরং আঙ্কারা যে পথটি নিচ্ছে, সেটিকে বলা যায় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্থাৎ কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাড়ানো।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পও এই নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ড্রোন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামরিক প্রযুক্তিতে দেশটি নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প অনেক এগোলেও পূর্ণ কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের জন্য এখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও সক্ষমতায় বিদেশের ওপর নির্ভরতা রয়েছে।
এরদোয়ানের আসল লক্ষ্য কী?
তুরস্কের এই নীতির পেছনে কয়েকটি হিসাব কাজ করছে। প্রথমত, ন্যাটোর নিরাপত্তা কাঠামো ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক ব্যবহার করা। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো। আর চতুর্থত, ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে তুরস্কের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে শুধু একটি ন্যাটো সদস্য নয়, বরং স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
সম্প্রতি এরদোয়ান জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার বহুল আলোচিত বক্তব্য—‘বিশ্ব পাঁচের চেয়ে বড়’—মূলত বর্তমান আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কাঠামো সংস্কারের দাবিকেই তুলে ধরে। অর্থাৎ তুরস্ক শুধু কোনো একটি জোটে নিজের অবস্থান খুঁজছে না; বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাতেই নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
পূর্ব না পশ্চিম—তাহলে তুরস্ক কোথায়?
তুরস্ককে হয়তো এই মুহূর্তে পূর্ব কিংবা পশ্চিম—একটি বাক্সে আটকে রাখা কঠিন। একদিকে ন্যাটো, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক। অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগ। আর মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো। সবগুলো সম্পর্কের উদ্দেশ্য এক নয়, গুরুত্বও এক নয়। কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রে একটি বিষয় স্পষ্ট—তুরস্ক নিজের কৌশলগত বিকল্প যতটা সম্ভব বাড়াতে চাইছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে যখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা বাড়ছে, রাশিয়া-পশ্চিম সংঘাত দীর্ঘ হচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোও বদলে যাচ্ছে, তখন তুরস্ক কোনো এক পক্ষের সঙ্গে পুরোপুরি নিজেকে আটকে না রেখে একাধিক পক্ষের সঙ্গে দর-কষাকষির জায়গা ধরে রাখতে চাইছে।
তাই প্রশ্নটা শুধু—এরদোয়ানের তুরস্ক পূর্বের, নাকি পশ্চিমের? বরং বড় প্রশ্ন—পূর্ব ও পশ্চিম—দুই দিকের শক্তিকেই ব্যবহার করে তুরস্ক কতটা নিজের প্রভাব বাড়াতে পারবে?